মে
মাসের পহেলা তারিখটি আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবসে পরিণত করেছিল শিকাগো শহরের
শ্রমিকদের আত্মোৎসর্গ। তারা শ্রমিকদের ৮ ঘণ্টা শ্রমের অধিকার আদায়ের
আন্দোলনে নেমেছিল। ফেব্রুয়ারি মাসের ২১ তারিখে বাংলা ভাষার অধিকার
প্রতিষ্ঠার দাবিতে বাঙালি তরুণরা তাদের আত্মবলিদানের মধ্য দিয়ে আমাদের শহীদ
দিবসে পরিণত করে। শিকাগোর সীমানা ছাড়িয়ে মে দিবস শ্রমিকদের আন্তর্জাতিক
সংহতি দিবসে রূপান্তরিত হয়েছিল অনেক আগেই। আমাদের দেশেও সে দিবসটি পালিত হয়
গৌরবের সঙ্গে। ২০০০ সাল থেকে আমাদের ২১ ফেব্রুয়ারি কেবল আর আমাদের শহীদ
দিবস রইল না জাতিসংঘের উদ্যোগে একে ঘোষণা করা হল ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা
দিবস’ হিসেবে- যা ছিল আমাদের একান্তই জাতীয় তা হয়ে গেল আন্তর্জাতিক। এতে
আমাদের জাতীয় শহীদ দিবস আন্তর্জাতিকতায় অভিষিক্ত হল। আমরা এই ঘটনায়
গৌরবান্বিত হয়েছি। একুশে ফেব্রুয়ারি যে একটি শোক দিবস এটা আমরা অনেক আগেই
ভুলে গিয়েছি, কারণ শোককে আমরা যথার্থ অর্থে শক্তিতে পরিণত করতে পেরেছি বলেই
এ দিবসটি হয়ে গেছে আমাদের আত্মশক্তির উৎসবময় প্রকাশের দিন। এই প্রকাশ
আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির আলোকে আরও দীপ্তিময় হয়ে উঠেছে।
সোভিয়েত বিপ্লবের অন্যতম নেতা স্টালিন বলেছিলেন, যে কোনো ভাষাই তার বিভিন্ন শ্রেণীর মানুষের মধ্যে সাধারণ যোগাযোগের মাধ্যম। সে কারণে ভাষা হচ্ছে শ্রেণী নিরপেক্ষ। কোনো বিশেষ শ্রেণীর কোনো বিশেষ ভাষা নেই। ফলে ভাষার কোনো শ্রেণী চরিত্র নেই। একটি জাতির অন্তর্ভুক্ত সব শ্রেণীর মধ্যে ঐক্যসূত্র রচনা করে দেয় তাদের ব্যবহৃত ভাষাটি।
স্টালিনের দেয়া এই ব্যাখ্যার আলোকে পাকিস্তান রাষ্ট্রে বাঙালি জাতির আত্মজাগরণের বিষয়টি উপলব্ধি করতে পারি। ভাষা এবং সংস্কৃতি এক নয়। সংস্কৃতির শ্রেণী চরিত্র থাকে। বিভিন্ন শ্রেণীর বিভিন্ন সংস্কৃতি কিন্তু বিভিন্ন শ্রেণীর যেহেতু বিভিন্ন ভাষা নেই- তাই ভাষার কোনো শ্রেণী চরিত্র নেই। তবে যে কোনো মানবগোষ্ঠীর সংস্কৃতির বিনির্মাণে ভাষার ভূমিকাই মুখ্য। ধর্ম সম্পর্কে বিভিন্নতা সত্ত্বেও বাংলাভাষী জনগোষ্ঠী একটি অভিন্ন ভাষাকে অবলম্বন করেই রূপলাভ করেছে। জিন্নাহ তথা মুসলিম লীগের দ্বিজাতি তত্ত্ব বাঙালির অসাম্প্রদায়িক জাতীয় চেতনাকে সাময়িকভাবে রাহুগ্রস্ত করে ফেলতে পারলেও, পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর ১৯৪৮ সালেই পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালি সেই রাহুগ্রাস থেকে বেরিয়ে আসে। ১৯৪৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে পাকিস্তান গণপরিষদের অধিবেশনে ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত উর্দুর সঙ্গে বাংলাকে সমমর্যাদায় রাষ্ট্রভাষা করার দাবি তুললে শাসক দলের নেতাদের দ্বারা তিনি হিন্দু ও পাকিস্তানের ধ্বংসকারী বলে নিন্দিত হন। অথচ পূর্ব পাকিস্তানে ফেরার সঙ্গে সঙ্গে তিনি বাঙালিদের দ্বারা হন বহুনন্দিত। ঢাকায় বাঙালিরা মাতৃভাষার অধিকার ও মর্যাদাকে উপলক্ষ করে শুধু দ্বিজাতি তত্ত্ব থেকে মোহমুক্তই হয়নি পাকিস্তানি জাতীয়তাবাদের ফাঁস গলায় পরতেও অস্বীকার করে। প্রস্তুত হয় নির্ভেজাল বাঙালিত্বের প্রতিষ্ঠায়। তারপর বিজাতীয় শব্দ ঢুকিয়ে বাংলা ভাষার চরিত্র নষ্ট করার প্রয়াস, আরবি হরফে বাংলা লেখার প্রয়াস, বাংলা বর্ণমালা সংস্কারের নামে সংহারের প্রয়াস, রবীন্দ্র বর্জনের প্রয়াস, নজরুল ইসলামের মুসলমানিকরণের প্রয়াস- পাকিস্তানি জাতীয়তাবাদীদের এরকম সব অপপ্রয়াস ব্যর্থ করে দিতে দিতে জাতি হিসেবে বাঙালি ক্রমেই পরিশুদ্ধ হয়ে উঠতে থাকে। সঙ্গে সঙ্গে এ সত্য উপলব্ধি হতে থাকে যে, পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চলের অধিবাসী হয়ে বাঙালিরা নতুন করে এক ঔপনিবেশিক শাসনের অধীন হয়েছে। এই উপলব্ধি থেকে ধাপে ধাপে অগ্রসর হতে থাকে বাঙালি জাতীয় আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকারের দাবি।
কোনো জনগোষ্ঠী যে সব উপাদানের সমন্বয়ে জাতি হয়ে ওঠে তার সবগুলোই বাঙালিদের ছিল, তাই এক সময় বাঙালি জাতি ‘জয়বাংলা’ ধ্বনি উচ্চারণ করে উদ্দীপ্ত হয়ে উঠেছিল। ‘বীর বাঙালি অস্ত্র ধর/বাংলাদেশ স্বাধীন কর বলে’ পাকিস্তানিদের সঙ্গে মরণপণ সংগ্রামে লিপ্ত হয়ে একটি স্বাধীন জাতি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাকে সম্ভব করে তুলেছিল।
ভাষা আন্দোলনের সূচনা থেকে যে চেতনার জন্ম ঘটেছিল সে চেতনা ঘরে ঘরে পৌঁছে দেয়া যায়নি আজও- এ সত্য অস্বীকার করা যাবে না। আমরা এখন নতুন করে ইংরেজির মোহে মুগ্ধ হয়ে পড়েছি। আমাদের কর্তৃত্বশীল শক্তি ইংরেজি মাধ্যম বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করে সাধারণ মানুষের থেকে নিজেদেরকে বিচ্ছিন্ন করে নিয়েছে এবং ওই বিজাতীয় ভাষা জনগণের ওপর চাপিয়ে দিয়ে অতীতের গণবিরোধিতার পুনরাবৃত্তি ঘটাচ্ছে। তাদের সেই গণবিরোধী ভূমিকার হাত থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার শপথই গ্রহণ করতে হবে আজ এই ২০১৬-র ফেব্রুয়ারি মাসে।
অনুলিখন : শুচি সৈয়দ
সোভিয়েত বিপ্লবের অন্যতম নেতা স্টালিন বলেছিলেন, যে কোনো ভাষাই তার বিভিন্ন শ্রেণীর মানুষের মধ্যে সাধারণ যোগাযোগের মাধ্যম। সে কারণে ভাষা হচ্ছে শ্রেণী নিরপেক্ষ। কোনো বিশেষ শ্রেণীর কোনো বিশেষ ভাষা নেই। ফলে ভাষার কোনো শ্রেণী চরিত্র নেই। একটি জাতির অন্তর্ভুক্ত সব শ্রেণীর মধ্যে ঐক্যসূত্র রচনা করে দেয় তাদের ব্যবহৃত ভাষাটি।
স্টালিনের দেয়া এই ব্যাখ্যার আলোকে পাকিস্তান রাষ্ট্রে বাঙালি জাতির আত্মজাগরণের বিষয়টি উপলব্ধি করতে পারি। ভাষা এবং সংস্কৃতি এক নয়। সংস্কৃতির শ্রেণী চরিত্র থাকে। বিভিন্ন শ্রেণীর বিভিন্ন সংস্কৃতি কিন্তু বিভিন্ন শ্রেণীর যেহেতু বিভিন্ন ভাষা নেই- তাই ভাষার কোনো শ্রেণী চরিত্র নেই। তবে যে কোনো মানবগোষ্ঠীর সংস্কৃতির বিনির্মাণে ভাষার ভূমিকাই মুখ্য। ধর্ম সম্পর্কে বিভিন্নতা সত্ত্বেও বাংলাভাষী জনগোষ্ঠী একটি অভিন্ন ভাষাকে অবলম্বন করেই রূপলাভ করেছে। জিন্নাহ তথা মুসলিম লীগের দ্বিজাতি তত্ত্ব বাঙালির অসাম্প্রদায়িক জাতীয় চেতনাকে সাময়িকভাবে রাহুগ্রস্ত করে ফেলতে পারলেও, পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর ১৯৪৮ সালেই পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালি সেই রাহুগ্রাস থেকে বেরিয়ে আসে। ১৯৪৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে পাকিস্তান গণপরিষদের অধিবেশনে ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত উর্দুর সঙ্গে বাংলাকে সমমর্যাদায় রাষ্ট্রভাষা করার দাবি তুললে শাসক দলের নেতাদের দ্বারা তিনি হিন্দু ও পাকিস্তানের ধ্বংসকারী বলে নিন্দিত হন। অথচ পূর্ব পাকিস্তানে ফেরার সঙ্গে সঙ্গে তিনি বাঙালিদের দ্বারা হন বহুনন্দিত। ঢাকায় বাঙালিরা মাতৃভাষার অধিকার ও মর্যাদাকে উপলক্ষ করে শুধু দ্বিজাতি তত্ত্ব থেকে মোহমুক্তই হয়নি পাকিস্তানি জাতীয়তাবাদের ফাঁস গলায় পরতেও অস্বীকার করে। প্রস্তুত হয় নির্ভেজাল বাঙালিত্বের প্রতিষ্ঠায়। তারপর বিজাতীয় শব্দ ঢুকিয়ে বাংলা ভাষার চরিত্র নষ্ট করার প্রয়াস, আরবি হরফে বাংলা লেখার প্রয়াস, বাংলা বর্ণমালা সংস্কারের নামে সংহারের প্রয়াস, রবীন্দ্র বর্জনের প্রয়াস, নজরুল ইসলামের মুসলমানিকরণের প্রয়াস- পাকিস্তানি জাতীয়তাবাদীদের এরকম সব অপপ্রয়াস ব্যর্থ করে দিতে দিতে জাতি হিসেবে বাঙালি ক্রমেই পরিশুদ্ধ হয়ে উঠতে থাকে। সঙ্গে সঙ্গে এ সত্য উপলব্ধি হতে থাকে যে, পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চলের অধিবাসী হয়ে বাঙালিরা নতুন করে এক ঔপনিবেশিক শাসনের অধীন হয়েছে। এই উপলব্ধি থেকে ধাপে ধাপে অগ্রসর হতে থাকে বাঙালি জাতীয় আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকারের দাবি।
কোনো জনগোষ্ঠী যে সব উপাদানের সমন্বয়ে জাতি হয়ে ওঠে তার সবগুলোই বাঙালিদের ছিল, তাই এক সময় বাঙালি জাতি ‘জয়বাংলা’ ধ্বনি উচ্চারণ করে উদ্দীপ্ত হয়ে উঠেছিল। ‘বীর বাঙালি অস্ত্র ধর/বাংলাদেশ স্বাধীন কর বলে’ পাকিস্তানিদের সঙ্গে মরণপণ সংগ্রামে লিপ্ত হয়ে একটি স্বাধীন জাতি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাকে সম্ভব করে তুলেছিল।
ভাষা আন্দোলনের সূচনা থেকে যে চেতনার জন্ম ঘটেছিল সে চেতনা ঘরে ঘরে পৌঁছে দেয়া যায়নি আজও- এ সত্য অস্বীকার করা যাবে না। আমরা এখন নতুন করে ইংরেজির মোহে মুগ্ধ হয়ে পড়েছি। আমাদের কর্তৃত্বশীল শক্তি ইংরেজি মাধ্যম বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করে সাধারণ মানুষের থেকে নিজেদেরকে বিচ্ছিন্ন করে নিয়েছে এবং ওই বিজাতীয় ভাষা জনগণের ওপর চাপিয়ে দিয়ে অতীতের গণবিরোধিতার পুনরাবৃত্তি ঘটাচ্ছে। তাদের সেই গণবিরোধী ভূমিকার হাত থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার শপথই গ্রহণ করতে হবে আজ এই ২০১৬-র ফেব্রুয়ারি মাসে।
অনুলিখন : শুচি সৈয়দ

No comments:
Post a Comment