Friday, February 19, 2016

বিএনপির তৃণমূলে পুনর্গঠন স্থগিত

কাউন্সিলের আগ পর্যন্ত এ সিদ্ধান্ত বলবৎ থাকবে * সবাইকে সর্বশক্তি দিয়ে ইউপি নির্বাচনে মাঠে থাকার নির্দেশ
আসন্ন জাতীয় কাউন্সিলের আগে বিএনপিতে সব ধরনের পুনর্গঠন কার্যক্রম স্থগিত থাকবে। দলের নেতাকর্মীরা যাতে ঐক্যবদ্ধ থেকে আসন্ন ইউপি নির্বাচনের সময় ভোটারের ভোট ফলাফল ঘোষণা পর্যন্ত ধরে রাখতে পারেন সেজন্য এই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, চলমান পুনর্গঠনকে কেন্দ্র করে দলের মাঠ পর্যায়ে কিছুটা বিভেদ ও বিরোধ দেখা দিতে পারে। আর বাস্তবে তাই হলে ইউপি নির্বাচনে দলীয় প্রার্থীর পক্ষে প্রচার প্রচারণা ও ভোট পাহারায় ক্ষেত্র বিশেষে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। সেজন্য দলের নীতিনির্ধারক মহল এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এছাড়া এই সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে সম্প্রতি সিলেট জেলা মহানগর ও ঝিনাইদহ জেলা কমিটি গঠনের অভিজ্ঞতাকে আমলে নেয়া হয়।
বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া বুধবার রাতে দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং পুনর্গঠনের প্রধান সমন্বয়ক ও দলের যুগ্ম মহাসচিব মোহাম্মদ শাহজাহানের সঙ্গে বৈঠক করে এসব সিদ্ধান্ত দেন। সংশ্লিষ্ট নির্ভরযোগ্য সূত্রে এমন তথ্য নিশ্চিত হওয়া গেছে। এই সভা থেকে আসন্ন ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে ও দলের ষষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিল প্রস্তুতিতে সব পর্যায়ের নেতাকর্মীদের আরও সক্রিয় হয়ে মাঠে থাকার নির্দেশনা দেয়া হয়। তবে দলের পুনর্গঠন কার্যক্রম স্থগিত করায় মহল বিশেষ খুশি হলেও হতাশ হয়েছেন তৃণমূলের বেশিরভাগ নেতাকর্মী। এদিকে তৃণমূল পুনর্গঠন প্রক্রিয়ার প্রধান সমন্বয়ক মোহাম্মদ শাহজাহানকে আসন্ন ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে দলের চেয়ারম্যানপ্রার্থী চূড়ান্ত করাসহ সার্বিক বিষয় তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। জানতে চাইলে মোহাম্মদ শাহজাহান যুগান্তরকে বলেন, দলের জাতীয় কাউন্সিল ও আসন্ন ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন নিয়ে দল এখন ব্যস্ত থাকবে। সে কারণে কাউন্সিলের আগ পর্যন্ত পুনর্গঠন প্রক্রিয়া এক রকম স্থগিত থাকবে।
পুনর্গঠন প্রক্রিয়ায় সঙ্গে যুক্ত আরও কয়েকজন নেতা জানান, সিলেট জেলা ও মহানগর এবং ঝিনাইদহে কমিটি গঠন নিয়ে দলের মধ্যে নানা প্রশ্ন উঠেছে। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত দলের স্থায়ী কমিটির সভাতেও বিষয়টি নিয়ে নানা আলোচনা হয়। এছাড়া তৃণমূলের বেশিরভাগ উপজেলা, পৌর, ওয়ার্ড ও ইউনিয়ন কমিটি গঠনের সম্ভাব্য রূপরেখা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। পুনর্গঠন প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত নেতাদের সঙ্গে কোনো আলোচনা না করে পুনর্গঠন তদারকিতে যে এগারো টিম গঠন করা হয়, তার নিরপেক্ষতা ও গ্রহণযোগ্যতা নিয়েও দলের মধ্যে ব্যাপক সমালোচনা রয়েছে।
জানা যায়, বিএনপির ৭৫টি সাংগঠনিক জেলার মধ্যে এরই মধ্যে ১০টিতে কাউন্সিলের মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ কমিটি করা হয়েছে। সম্প্রতি সিলেট মহানগর ও জেলা কমিটিসহ ঝিনাইদহে কাউন্সিলের মাধ্যমে নতুন কমিটি গঠন হয়। যদিও নবনির্বাচিত কমিটিকে বিএনপির একটি পক্ষ মেনে নিতে পারছে না। এছাড়া গাইবান্ধা, ঠাকুরগাঁও, নোয়াখালী, মুন্সীগঞ্জ, নরসিংদী, কুষ্টিয়া, খাগড়াছড়িসহ আরও অন্তত ২০টি জেলায় কাউন্সিল করার প্রস্তুতি প্রায় চূড়ান্ত। বেশ কয়েকটি জেলায় দিনক্ষণও নির্ধারিত হয়ে আছে। কিন্তু বিএনপির হাইকমান্ডের নির্দেশনা অনুযায়ী তা এখন স্থগিত রাখা হয়েছে। আরও অন্তত ১৫ থেকে ২০টি জেলা কমিটি ভেঙে দেয়ার চিন্তাভাবনা ছিল বিএনপির হাইকমান্ডের। তবে সেসব জেলা কমিটিতেও আপাতত হাত দেয়া হবে না। বিএনপির জেলা-উপজেলা ছাড়াও নতুন করে কোনো অঙ্গ সহযোগী সংগঠনের কমিটি গঠন না করতেও সংশ্লিষ্টদের বার্তা দেয়া হয়েছে।
বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, পুনর্গঠন প্রক্রিয়া স্থগিত হওয়ায় দলের ক্ষুদ্র একটি অংশ বেশ খুশি। অন্তত কাউন্সিলের আগে তৃণমূলের পদ-পদবি হারাতে হচ্ছে না তাদের। পটুয়াখালী, রাজশাহী জেলা ও মহানগর নেতারা জানান, এ পুনর্গঠন প্রক্রিয়া স্থগিত হওয়ায় যেসব নিষ্ক্রিয় নেতা পদ হারানোর আতংকে ছিলেন তারা কিছুটা হলেও লাভবান হয়েছেন। কেননা বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটি ঘোষণা না হওয়ায় তারা তৃণমূলের গুরুত্বপূর্ণ পদে বহাল থাকছেন। এ প্রসঙ্গে বিএনপির কেন্দ্রীয় এক নেতা যুগান্তরকে বলেন, দলে গতি আনতে গত বছর বিএনপি চেয়ারপারসন তৃণমূল পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেয়। আর এমন সিদ্ধান্তে অনেক সুবিধাবাদী ও ফাঁকিবাজ নেতা বেকায়দায় পড়লেও বেশ উৎসাহ উদ্দীপনায় ছিলেন ত্যাগী নেতাকর্মীরা। এখন হঠাৎ করে এ প্রক্রিয়া বন্ধ করায় সে উৎসাহে কিছুটা হলেও ভাটা পড়বে। তবে কেউ কেউ বলছেন, আসন্ন ইউপি নির্বাচনে মাঠ পর্যায়ে দলের ঐক্য ধরে রেখে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে নির্বাচনে শক্ত লড়াইয়ের জন্য এমন সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রয়োজন ছিল। কেননা, দল পুনর্গঠন হলে কমিটিতে যারা আসতে কিংবা টিকে থাকতে পারতেন না তাদের মধ্যে এক ধরনের ক্ষোভ কাজ করত, যার বিরূপ প্রভাব গিয়ে পড়ত ইউপি নির্বাচনে।
এদিকে বিএনপি প্রধানের নির্দেশনার পর নেতারা এখন ব্যস্ত ইউপি নির্বাচন নিয়ে। জেলা পর্যায় থেকে ইউপি নির্বাচনের চেয়ারম্যান প্রার্থীর তালিকা জমা হচ্ছে কেন্দ্রে। এ নিয়ে বৃহস্পতিবারও দিনভর নয়াপল্টন কার্যালয় ছিল নেতাকর্মীদের ভিড়ে বেশ সরগরম। সন্ধ্যার পর থেকে ভিড় জমে বিএনপি চেয়ারপারসনের গুলশান কার্যালয়েও। আজকালের মধ্যেই বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থীদের প্রত্যয়নপত্র দেবেন।
জানা যায়, ইউপি নির্বাচনকে ঘিরে কেন্দ্রে কিছুটা সমন্বয়হীনতাও কাজ করছে। যার কারণে দুই দফা সময় নির্ধারণ করা হলেও বৃহস্পতিবার পর্যন্ত দলীয়ভাবে ইউপি চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী চূড়ান্ত করতে পারেনি দলটি। প্রার্থী তালিকা চূড়ান্ত করতে আরও দুই-একদিন সময় লাগবে।
সাত পৌরসভায় মনোনয়ন পেলেন যারা : আগামী ২০ মার্চ অনুষ্ঠিতব্য ১০টি পৌরসভা নির্বাচনের প্রার্থী তালিকাও চূড়ান্ত করেছে বিএনপি। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী রংপুরের হারাগাছায় মো. মোনায়েম হোসেন ফারুক, ঝালকাঠি সদরে বাবু অনাদী দাশ, ফরিদপুরের ভাঙ্গায় ওয়াহিদুজ্জামান, ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদরে হাফিজুর রহমান মোল্লা কচি, নোয়াখালীর কবিরহাটে মোস্তাফিজুর রহমান মন্টু, ফেনীর সোনাগাজীতে জামাল উদ্দিন সেন্টু এবং কক্সবাজারের চকরিয়ায় নূরুল ইসলাম হায়দার।

No comments:

Post a Comment