Tuesday, February 9, 2016

যুদ্ধাপরাধীর ছেলে এখন আওয়ামী লীগ নেতা

দুই কর্মী হত্যার প্রধান আসামি
এমপি আবদুল ওদুদের পেছনে আলমগীর কবির আলম (লাল চিহ্নিত)
বাবা হুমায়ুন কবির ওরফে হুমায়ুন দারোগা একাত্তরে চাঁপাইনবাবগঞ্জে ছিলেন কুখ্যাত রাজাকার। মুক্তিযুদ্ধের পুরো ৯ মাস পাক হানাদার বাহিনীর ঘনিষ্ঠ এ সহযোগী গণহত্যা, মুক্তিযোদ্ধার বাড়ি জ্বালিয়ে দেয়া ও লুটপাটে যুক্ত ছিলেন। তার ছেলে আলমগীর কবির ওরফে আলম জামায়াত করে বিএনপি হয়ে এখন আওয়ামী লীগ নেতা। সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক। বাহিনী দিয়ে দলের দুই কর্মীকে হত্যা করেছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। ওই দুই হত্যা মামলার প্রধান আসামিও তিনি।
সেই আলমের নেতা বনে যাওয়ায় ক্ষুব্ধ চাঁপাইনবাবগঞ্জে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। তাকে দল থেকে বের করে দেয়া ও তার অপরাধের শাস্তি নিশ্চিত করতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে আবেদন দিয়েছেন তারা। করেছেন মানববন্ধন।
আলমগীর কবির আলম চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ আসনের এমপি ও জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আবদুল ওদুদের সার্বক্ষণিক সঙ্গী। নেতাকর্মীরা বলছেন, যুদ্ধাপরাধীর এ ছেলেকে দলের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসিয়েছেন তিনিই। তারা একসঙ্গে বিএনপি করতেন, আওয়ামী লীগেও আসেন একইসঙ্গে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে আবদুল ওদুদ রোববার যুগান্তরকে বলেন, জন্মের সময় কেউই পরিচয় নিয়ে জন্মায় না। আলমের বাবা রাজাকার ছিলেন ঠিক, মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি যাই করুক, সে (আলম) এখন আওয়ামী লীগের একজন ভালো নেতা। এ নিয়ে প্রশ্ন তোলা কোনোভাবেই উচিত নয়। তার দলে থাকা নিয়ে কোনো কোনো নেতাকর্মীর আপত্তি থাকলেও ভোটের রাজনীতিতে তাকে আমার দরকার আছে।
সরেজমিন খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০১২ সালে আলম তার ক্যাডার বাহিনীসহ এমপি ওদুদের হাত ধরে আওয়ামী লীগে যোগ দেন। এরপরই আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠেন তিনি। নারায়ণপুরসহ পুরো চরাঞ্চলে নিরংকুশ প্রভাব বিস্তারে তার বাহিনীকে বড় করেন। এ বাহিনী ব্যাপক নির্যাতন শুরু করে আওয়ামী লীগেরই নেতাকর্মীদের। ২০১৩ সালের ২২ সেপ্টেম্বর নারায়ণপুর বাজারে বোমা মেরে ও কুপিয়ে খুন করে আওয়ামী লীগের নিবেদিতপ্রাণ দুই কর্মী নুরুল ইসলাম ও আখতারুল ইসলাম পটলকে। দুই মামলার প্রধান আসামি হলেও আলম এমপির আশীর্বাদে এলাকায় দাপট দেখিয়েই বেড়াচ্ছেন। তাতে দুই বছর ধরে নারায়ণপুরসহ চরাঞ্চলে আওয়ামী লীগের অনেক নেতাকর্মীই গ্রামছাড়া।
আলমের শাস্তির দাবি ও তাকে দল থেকে বহিষ্কারের দাবিতে চাঁপাইনবাবগঞ্জ শহরে সম্প্রতি মানববন্ধন করেন নারায়ণপুর ইউনিয়নের দলীয় নেতাকর্মীরা। তারা বলছেন, এরপর থেকে অব্যাহত হুমকি পাচ্ছেন তারা। এমপি ওদুদের প্রশ্রয়ে আলম নারায়ণপুরে একক সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছেন।
হত্যার শিকার নুরুল ইসলামের ছেলে জসীম উদ্দিন বলেন, ‘আমরা বংশ পরম্পরায় আওয়ামী লীগ করি। বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে দলের নেতাকর্মীরা তখনকার বিএনপি নেতা এই আলমের ক্যাডারদের হাতে ব্যাপক নির্যাতনের শিকার হয়। এছাড়া একাত্তরে হুমায়ুন দারোগার নৃশংসতার কারণেই আলমের সঙ্গে স্বজন হারানো পরিবারগুলোর বিরোধ পুরনো। আলম এখন আওয়ামী লীগে ঢুকে তার বাবার পথ ধরেই মুক্তিযোদ্ধা আর প্রকৃত আওয়ামী লীগের পরিবারগুলোকে নিশ্চিহ্ন করতে কাজ করছে।
নেতাকর্মীরা অভিযোগ করেন, নব্য আর পুরনো আওয়ামী লীগের এই বিরোধে স্থানীয় এমপি নব্যদেরই পৃষ্ঠপোষকতা করে আসছেন শুরু থেকে। তবে অভিযোগ অস্বীকার করে আবদুল ওদুদ যুগান্তরকে বলেন, আমি কোনো পক্ষেই প্রভাব খাটাই না। উভয় পক্ষই আমার দলের নেতাকর্মী। আমার বিরুদ্ধে এসব অপপ্রচার করেন মুষ্টিমেয় কিছু নেতাকর্মী, যারা নিজেরাও অপরাধে জড়িত।
নেতাকর্মীরা অভিযোগ করেন, পুরনো বিরোধেই ২০১৩ সালের ২২ সেপ্টেম্বর আলম বাহিনীর সশস্ত্র ক্যাডাররা কুপিয়ে হত্যা করে নুরুলকে। নুরুলকে বাঁচাতে গিয়ে ওই বাহিনীর বোমার আঘাতে প্রাণ দেন পটল। আলমের সন্ত্রাসীরা নুরুলের লাশ সীমান্তের ওপারে নিয়ে পুঁতে গুম করারও চেষ্টা করেছিল। কিন্তু বিজিবির সহায়তায় পরে তা উদ্ধার করে পুলিশ। নিহত নুরুল ইসলামের ভাই আবদুল মমিন বলেন, ঘটনার দিন ও সময়ে আলম নিজেই ঘটনাস্থলে উপস্থিত থেকে তার ভাইকে খুনের নির্দেশ দেন।
মামলা দুটি প্রথমে তদন্ত করেন সদর মডেল থানার এসআই মাহবুবুর রহমান। ২০১৪ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি ১১২ আসামির বিরুদ্ধে চার্জশিট দেন। কিন্তু প্রধান আসামি আলমগীর কবিরসহ ৫৩ আসামিকে অব্যাহতির সুপারিশ করেন। নিহতের পরিবার নারাজি দিলে আদালত সিআইডিকে মামলা তদন্তের নির্দেশ দেন। গত বছরের ৩ মার্চ সিআইডি আলমসহ ৪৫ এজাহারভুক্ত আসামিকে বাদ দিয়ে চার্জশিট দেয়। বাদী আবারও নারাজি দিলে তদন্তের দায়িত্ব পান এএসপি মতিউর রহমান সিদ্দিকী। ১২ নভেম্বর তিনিও আলমসহ ৪১ জনকে বাদ দিয়ে চার্জশিট দেন। বাদী তৃতীয়বারের মতো আদালতে নারাজি দেন। ১৪ ফেব্রুয়ারি আদালতে এ বিষয়ে শুনানির দিন ধার্য রয়েছে।
মামলা দুটির নথি ঘেঁটে দেখা গেছে, প্রধান আসামি ও তার সহযোগীদের অভিযোগ থেকে অব্যাহতির কারণ হিসেবে সংশ্লিষ্ট তদন্ত কর্মকর্তারা বলেছেন, সাক্ষ্য-প্রমাণ না পাওয়ায় আলমকে বাদ দেয়া হয়েছে। বাদীর আইনজীবী মিজানুর রহমান যুগান্তরকে বলেন, তদন্তে বিস্তর ত্রুটি রয়েছে। আমরা আদালতকে এসব ত্রুটির কথা বলেছি। আশা করি আদালত থেকে আমরা ন্যায়বিচার পাব।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, মামলা দুটির এজাহারে ১২ সাক্ষী রয়েছেন। কিন্তু তদন্ত কর্মকর্তারা আসামি পক্ষের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে তাদের জবানবন্দি রেকর্ড করেননি। কারও ক্ষেত্রে সাক্ষ্য না নিয়েই তদন্ত প্রতিবেদনের সঙ্গে মনগড়া জবানবন্দি যুক্ত করেছেন। সাক্ষীরা এ মর্মে গত বছরের ৫ মে আদালতে হলফনামা দেন। হলফনামায় দেয়া জবানবন্দি তদন্তে অন্তর্ভুক্তির আবেদনও করেন। কিন্তু আমলে নেননি তদন্ত কর্মকর্তারা।
মামলার সর্বশেষ তদন্ত কর্মকর্তা এএসপি মতিউর রহমান সিদ্দিকী বলেন, তদন্তের সময় সাক্ষীরা প্রধান আসামির নাম বলেননি। এজন্য আলমসহ কয়েকজনকে অব্যাহতির সুপারিশ করা হয়েছে।
আলম সম্পর্কে মুক্তিযোদ্ধা আজিজুর রহমান যুগান্তরকে বলেন, আলমের বাবা হুমায়ুন দারোগা বেঁচে থাকলে বর্তমান সরকার প্রতিষ্ঠিত আন্তর্জাতিক যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালে নিশ্চিতভাবে তার বিচার হতো। কুখ্যাত যুদ্ধাপরাধীর ছেলে বঙ্গবন্ধুর আদর্শের সংগঠন আওয়ামী লীগ করছেন- আমরা এসব দেখে লজ্জিত হই।
জানতে চাইলে আলমগীর কবির যুগান্তরকে বলেন, আমার বাবা একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষে কোনো কাজ করেননি। যুদ্ধ শেষে তার বাবাকে কেন কারাগারে রাখা হয়েছিল- এমন প্রশ্ন এড়িয়ে যান তিনি। তার বাবা রাজাকার ছিলেন এমন অকাট্য দলিল প্রমাণাদির প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এসব দলিল প্রমাণ ভুয়া। দুই আওয়ামী লীগ কর্মীকে হত্যার অভিযোগের ব্যাপারে তিনি বলেন, গ্রাম্য রাজনীতি ও দলাদলির কারণে আমাকে জড়ানো হয়েছে। আমি নির্দোষ।

No comments:

Post a Comment