প্রসিকিউশন ও তদন্ত সংস্থাকেও কাঠগড়ায় নেয়া উচিত : আদালত
যুদ্ধাপরাধের দায়ে ট্রাইব্যুনালের রায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি মীর কাসেম আলীর আপিলের শুনানি শেষ হয়েছে। চূড়ান্ত রায়ের জন্য আগামী ৮ মার্চ দিন ধার্য করা হয়েছে। প্রধান বিচারপতি এসকে সিনহার নেতৃত্বাধীন পাঁচ বিচারপতির বেঞ্চ বুধবার রায়ের এ দিন ধার্য করেন। বেঞ্চের অপর সদস্যরা হচ্ছেন বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন, বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী, বিচারপতি মির্জা হোসেইন হায়দার ও বিচারপতি মোহাম্মদ বজলুর রহমান।
যুক্তি উপস্থাপনের শেষ দিনে আদালত আবারও এ মামলার তদন্তকারী সংস্থা ও মামলা পরিচালনাকারী প্রসিকিউশনের কঠোর সমালোচনা করেন। আদালত বলেন, অন্যান্য মামলার চেয়ে এ মামলার তথ্য-প্রমাণের অনেক ঘাটতি আছে, এজন্য তদন্ত সংস্থা ও প্রসিকিউশনকে কাঠগড়ায় নেয়া উচিত। এ মামলা দায়সারাভাবে করা হয়েছে বলেও মন্তব্য করেন আদালত। আদালতের এই মন্তব্যের ব্যাপারে জানতে চাইলে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলেন, ‘এটা আদালতের পর্যবেক্ষণ। আদালতের পর্যবেক্ষণের বিরুদ্ধে তো আমার কোনো বক্তব্য থাকতে পারে না।’ এর আগে মঙ্গলবারও এ মামলার তদন্তে ও পরিচালনায় ত্রুটির কারণে লাখ লাখ টাকা খরচ করে প্রসিকিউশন ও তদন্ত সংস্থা রাখা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন আদালত। মুক্তিযুদ্ধকালীন চট্টগ্রামের কিশোর মুক্তিযোদ্ধা জসিম উদ্দিন আহমেদসহ আটজনকে হত্যার দুটি ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় তৎকালীন আলবদর কমান্ডার মীর কাসেম আলীকে ২০১৪ সালের ২ নভেম্বর মৃত্যুদণ্ডের রায় দেন ট্রাইব্যুনাল। ওই রায়ে বলা হয়, ‘আলবদর সদস্য ও পাকিস্তানি সেনারা মুক্তিযোদ্ধাদের ধরে ডালিম হোটেলে নিয়ে আসত আমৃত্যু নির্যাতন করার উদ্দেশ্যেই। এটাও প্রমাণিত যে, ডালিম হোটেলে আলবদর সদস্যদের পরিচালনা ও নির্দেশনা দিতেন মীর কাসেম আলী নিজে। ডালিম হোটেল সত্যিকার অর্থেই ছিল একটি ‘মৃত্যুর কারখানা’। ডালিম হোটেল ছাড়াও নগরীর চাক্তাই চামড়ার গুদামের দোস্ত মোহাম্মদ বিল্ডিং, দেওয়ানহাটের দেওয়ান হোটেল ও পাঁচলাইশ এলাকার সালমা মঞ্জিলে বদর বাহিনীর আলাদা ক্যাম্প ও নির্যাতন কেন্দ্র ছিল। এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেন মীর কাসেম আলী, যার ওপর ৯ ফেব্রুয়ারি থেকে শুনানি শুরু হয়।
শেষদিনের শুনানির একপর্যায়ে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলেন, মীর কাসেম আলী একজন মানিম্যান (টাকাওয়ালা)। মামলা থেকে বাঁচার জন্য অনেক জায়গায় টাকার ব্যবহার করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের কাসেডিয়ান অ্যাসোসিয়েটস লবিস্ট ফার্মের সঙ্গে তিনি ২৫ মিলিয়ন ডলারের বিনিময়ে চুক্তি করেছেন মর্মে লিখিত একটি নথি রয়েছে। এ সময় লিখিত নথিটি তিনি আদালতে উপস্থাপন করেন। পরে প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘আপনারা তাহলে এ বিষয়ে মানি লন্ডারিং আইনে মীর কাসেম আলীর বিরুদ্ধে মামলা করেননি কেন?’ জবাবে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, দুদকের কাছে এ সংক্রান্ত একটি আবেদন করা হয়েছে। এ সময় মীর কাসেম আলীর আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেন দাঁড়িয়ে বলেন, ‘মাই লর্ড, দুদকের কাছে এ বিষয়ে আবেদন জমা পড়লে দুদক তদন্ত করে দেখে এটি ভুয়া ও মিথ্যা তথ্য। এ কারণে দুদক আবেদনটি বাতিল করেছে।’ প্রধান বিচারপতি অ্যাটর্নি জেনারেলকে বলেন, অপর একটি মামলায় (দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর) বরিশাল গিয়ে তথ্য সংগ্রহ করেছেন। কিন্তু এ মামলায় কোনো ভালো তথ্য দিতে পারলেন না। জবাবে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, ‘আমি নিজে গিয়ে পিরোজপুরে তথ্য সংগ্রহ করেছি। কিন্তু প্রসিকিউশন ও তদন্ত কর্মকর্তা কেন পারল না, তা বুঝলাম না। তবে মীর কাসেম আলী আলবদর নেতা হিসেবে ঘটনায় জড়িত ছিলেন। এটা সত্য কথা। তাদের পরিকল্পনা অনুযায়ী হত্যা করা হয়।’
প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘১৯৭১ সালের ২৪ নভেম্বর ডালিম হোটেলে যে হত্যাকাণ্ড হয় সে সময় তো আপনাদের দেয়া পত্রিকার কাটিংয়ে মীর কাসেম আলী ঢাকায় ছিলেন বলে উল্লেখ রয়েছে। তাহলে সে চট্টগ্রামে গেল কীভাবে?’ জবাবে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, ‘তখন তো ট্রেন চলাচল ব্যবস্থা চালু ছিল। হয়তো ট্রেনে গেছেন।’ প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘দেশে তখন রাস্তাঘাটের অবস্থা ভালো ছিল না। নৌপথে মানুষ চলাচল করত। ১৯৭১ সালের ২৩ তারিখ ঢাকার সমাবেশে বক্তব্য দিয়েছেন মর্মে পত্রিকায় সংবাদ রয়েছে। তাহলে মীর কাসেম আলী কি চট্টগ্রামে হেলিকপ্টারে গেছে?’ অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, ‘পাকিস্তানি বাহিনীর সহায়তায় যেতেও পারে।’ প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘মামলার তদন্ত কর্মকর্তা বা সাক্ষীও বলেননি মীর কাসেম আলী ১৯৭১ সালের ২৪ নভেম্বর চট্টগ্রামে ছিলেন। এসব তো আপনারা তাদের দিয়েও বলাতে পারতেন।’ অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, ‘আলবদর বাহিনীর নেতা হিসেবে মীর কাসেম আলী যা কমান্ড করত তাই হতো।’
প্রধান বিচারপতি বলেন, তখন কমান্ডের প্রয়োজন হতো না। ওই সময় জেনারেল নির্দেশ দিয়েছেলেন যে পোড়া মাটি চাই। মানুষ চাই। এ কারণে ওই সময় যার হাতে একটি বন্দুক ছিল, সে ক্ষমতাবান হয়ে যেত। যে রাজাকার যত বেশি কিলিং মিশন করত, সে তত বেশি জনপ্রিয় হয়ে উঠত। তখন আইন বলে কিছু ছিল না। শৃংখলা বলে কিছু ছিল না। তবে আপনারা প্রসিকিউশন টিম এ মামলা একেবারে দায়সারাভাবে উপস্থাপন করেছেন, যা দুঃখজনক। ট্রাইব্যুনালের অন্য কোনো মামলায় এত দুর্বল তথ্য ছিল না। এজন্য তদন্ত সংস্থা ও প্রসিকিউশনকে কাঠগড়ায় নেয়া উচিত। অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলেন, মীর কাসেম আলী যে একজন আলবদর বাহিনীর নেতা হিসেবে অপরাধ করেছেন এতে কোনো সন্দেহ নেই। আমি আশা করি তার সর্বোচ্চ সাজা বহাল থাকবে।
অ্যাটর্নি জেনারেলের বক্তব্য শেষ করার পর আসামিপক্ষের আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেন ও এসএম শাহজাহান প্রায় ২০ মিনিট কথা বলেন। খন্দকার মাহবুব হোসেন আদালতে বলেন, ‘মাই লর্ড, ১৯৭১ সালের ৭ নভেম্বরের আগ পর্যন্ত আমি ও মীর কাসেম আলী চট্টগ্রামে ছিলাম। মুক্তিযুদ্ধের এত বিশাল সময়ে আমার বিরুদ্ধে একটি অভিযোগও আনা হয়নি। ওই সময়ে আমি চট্টগ্রাম বিভাগের ছাত্রসংঘের সভাপতি ছিলাম। পরে ১৯৭১ সালের ৬ নভেম্বর থেকে ঢাকায় থাকি। কেননা তখন আমি ছাত্রসংঘের কেন্দ্রীয় সেক্রেটারি জেনারেল নির্বাচিত হয়েছিলাম। ৭ নভেম্বরের পর থেকে চট্টগ্রামে ছাত্রসংঘের দায়িত্বে ছিল আবু তাহের নামে অপর ব্যক্তি। আমি ডালিম হোটেলে যাব কীভাবে?’
প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘বিচারকরা অন্ধ। আমরা নথি দেখে রায় দেব।’ এরপর খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, ‘সাক্ষী ও তদন্ত কর্মকর্তারা সঠিক কোনো তথ্য দিতে পারেননি। সুতরাং মীর কাসেম আলীকে বেকসুর খালাস দেয়া হোক।’ প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘একেবারে বলবেন না দণ্ড দেয়া যাবে না। বরং এটা বলেন, মৃত্যুদণ্ড যেন দেয়া না হয়। কেননা ১৯৭১ সালে কমান্ড রেসপনসিবিলিটি বলতে কোনো আইন ছিল না। বরং যার হাতে বন্দুক ছিল সে ক্ষমতাবান। এরপর শুনানি শেষে প্রথমে ২ মার্চ রায়ের দিন ধার্য করা হয়। পরে ওইদিন প্রধান বিচারপতির ঢাকার বাইরে পূর্বনির্ধারিত একটি কর্মসূচি থাকায় রায়ের দিন পরিবর্তন করে ৮ মার্চ ধার্য করা হয়। শুনানি শেষে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম নিজের কার্যালয়ে সাংবাদিকদের বলেন, ‘ডালিম হোটেলে নিয়ে যে অত্যাচারের ঘটনা ঘটেছে, আসামিরা কিন্তু তা অস্বীকার করেনি। আসামিপক্ষের মূল বক্তব্য ছিল, সে সময় তিনি চট্টগ্রামে ছিলেন না। মীর কাসেম আলীর পক্ষে তার বোন যে সাক্ষ্য দিয়েছেন তাতে উনি উল্টো কথা বলেছেন। উনি বলেছেন, মীর কাসেম আলী কুমিল্লায় থাকতেন, তার বাবার সঙ্গে। কাজেই তাদের যে প্লি অব অ্যালিবাই, তা প্রমাণ হয়নি।’ জসীম, টিন্টো সেন, রঞ্জিত দাসকে হত্যার দায় থেকে মীর কাসেম আলী কোনোভাবেই ‘অব্যাহতি পেতে পারেন না’ বলে মন্তব্য করেন মাহবুবে আলম।
অন্যদিকে মীর কাসেম আলীর আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, এ মামলায় মীর কাসেম আলীকে ট্রাইব্যুনাল দুটি অভিযোগে মৃত্যুদণ্ডাদেশ দিয়েছিলেন। একটিতে বলা হয়, ১৯৭১ সালের ২৪ নভেম্বর চট্টগ্রামের ডালিম হোটেলে জসিম নামের একজনকে নির্যাতন করে হত্যা করেন মীর কাসেম আলী। কিন্তু ওই দিন তিনি ঢাকায় ছিলেন বলে প্রসিকিউশনের দেয়া পত্রিকায় উল্লেখ রয়েছে। তাহলে মীর কাসেম আলী কীভাবে হত্যা করবেন।
সপ্তম রায় : আপিল বিভাগে যুদ্ধাপরাধ মামলায় এর আগের ছয়টি রায়ের মধ্যে চারটিতে জামায়াতের দুই সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল কাদের মোল্লা ও মুহাম্মদ কামারুজ্জামান, দলটির সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ এবং বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর ফাঁসি কার্যকর হয়েছে। আপিল বিভাগের আরেক রায়ে জামায়াতের নায়েবে আমীর দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর সাজা কমিয়ে আমৃত্যু কারাদণ্ড দিয়েছেন। সেই রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি প্রকাশিত হওয়ার পর দুই পক্ষের করা রিভিউ আবেদন এখন নিষ্পত্তির অপেক্ষায়। আর সর্বশেষ রায়ে জামায়াতে ইসলামীর আমীর মতিউর রহমান নিজামীর সর্বোচ্চ সাজা বহাল রেখেছে আপিল বিভাগ। ওই রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি প্রকাশ হলে রিভিউ আবেদনের শুনানির পর সাজা বহাল থাকলে দণ্ড কার্যকরের প্রক্রিয়া শুরু করবে কারা কর্তৃপক্ষ।
যুক্তি উপস্থাপনের শেষ দিনে আদালত আবারও এ মামলার তদন্তকারী সংস্থা ও মামলা পরিচালনাকারী প্রসিকিউশনের কঠোর সমালোচনা করেন। আদালত বলেন, অন্যান্য মামলার চেয়ে এ মামলার তথ্য-প্রমাণের অনেক ঘাটতি আছে, এজন্য তদন্ত সংস্থা ও প্রসিকিউশনকে কাঠগড়ায় নেয়া উচিত। এ মামলা দায়সারাভাবে করা হয়েছে বলেও মন্তব্য করেন আদালত। আদালতের এই মন্তব্যের ব্যাপারে জানতে চাইলে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলেন, ‘এটা আদালতের পর্যবেক্ষণ। আদালতের পর্যবেক্ষণের বিরুদ্ধে তো আমার কোনো বক্তব্য থাকতে পারে না।’ এর আগে মঙ্গলবারও এ মামলার তদন্তে ও পরিচালনায় ত্রুটির কারণে লাখ লাখ টাকা খরচ করে প্রসিকিউশন ও তদন্ত সংস্থা রাখা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন আদালত। মুক্তিযুদ্ধকালীন চট্টগ্রামের কিশোর মুক্তিযোদ্ধা জসিম উদ্দিন আহমেদসহ আটজনকে হত্যার দুটি ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় তৎকালীন আলবদর কমান্ডার মীর কাসেম আলীকে ২০১৪ সালের ২ নভেম্বর মৃত্যুদণ্ডের রায় দেন ট্রাইব্যুনাল। ওই রায়ে বলা হয়, ‘আলবদর সদস্য ও পাকিস্তানি সেনারা মুক্তিযোদ্ধাদের ধরে ডালিম হোটেলে নিয়ে আসত আমৃত্যু নির্যাতন করার উদ্দেশ্যেই। এটাও প্রমাণিত যে, ডালিম হোটেলে আলবদর সদস্যদের পরিচালনা ও নির্দেশনা দিতেন মীর কাসেম আলী নিজে। ডালিম হোটেল সত্যিকার অর্থেই ছিল একটি ‘মৃত্যুর কারখানা’। ডালিম হোটেল ছাড়াও নগরীর চাক্তাই চামড়ার গুদামের দোস্ত মোহাম্মদ বিল্ডিং, দেওয়ানহাটের দেওয়ান হোটেল ও পাঁচলাইশ এলাকার সালমা মঞ্জিলে বদর বাহিনীর আলাদা ক্যাম্প ও নির্যাতন কেন্দ্র ছিল। এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেন মীর কাসেম আলী, যার ওপর ৯ ফেব্রুয়ারি থেকে শুনানি শুরু হয়।
শেষদিনের শুনানির একপর্যায়ে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলেন, মীর কাসেম আলী একজন মানিম্যান (টাকাওয়ালা)। মামলা থেকে বাঁচার জন্য অনেক জায়গায় টাকার ব্যবহার করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের কাসেডিয়ান অ্যাসোসিয়েটস লবিস্ট ফার্মের সঙ্গে তিনি ২৫ মিলিয়ন ডলারের বিনিময়ে চুক্তি করেছেন মর্মে লিখিত একটি নথি রয়েছে। এ সময় লিখিত নথিটি তিনি আদালতে উপস্থাপন করেন। পরে প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘আপনারা তাহলে এ বিষয়ে মানি লন্ডারিং আইনে মীর কাসেম আলীর বিরুদ্ধে মামলা করেননি কেন?’ জবাবে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, দুদকের কাছে এ সংক্রান্ত একটি আবেদন করা হয়েছে। এ সময় মীর কাসেম আলীর আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেন দাঁড়িয়ে বলেন, ‘মাই লর্ড, দুদকের কাছে এ বিষয়ে আবেদন জমা পড়লে দুদক তদন্ত করে দেখে এটি ভুয়া ও মিথ্যা তথ্য। এ কারণে দুদক আবেদনটি বাতিল করেছে।’ প্রধান বিচারপতি অ্যাটর্নি জেনারেলকে বলেন, অপর একটি মামলায় (দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর) বরিশাল গিয়ে তথ্য সংগ্রহ করেছেন। কিন্তু এ মামলায় কোনো ভালো তথ্য দিতে পারলেন না। জবাবে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, ‘আমি নিজে গিয়ে পিরোজপুরে তথ্য সংগ্রহ করেছি। কিন্তু প্রসিকিউশন ও তদন্ত কর্মকর্তা কেন পারল না, তা বুঝলাম না। তবে মীর কাসেম আলী আলবদর নেতা হিসেবে ঘটনায় জড়িত ছিলেন। এটা সত্য কথা। তাদের পরিকল্পনা অনুযায়ী হত্যা করা হয়।’
প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘১৯৭১ সালের ২৪ নভেম্বর ডালিম হোটেলে যে হত্যাকাণ্ড হয় সে সময় তো আপনাদের দেয়া পত্রিকার কাটিংয়ে মীর কাসেম আলী ঢাকায় ছিলেন বলে উল্লেখ রয়েছে। তাহলে সে চট্টগ্রামে গেল কীভাবে?’ জবাবে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, ‘তখন তো ট্রেন চলাচল ব্যবস্থা চালু ছিল। হয়তো ট্রেনে গেছেন।’ প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘দেশে তখন রাস্তাঘাটের অবস্থা ভালো ছিল না। নৌপথে মানুষ চলাচল করত। ১৯৭১ সালের ২৩ তারিখ ঢাকার সমাবেশে বক্তব্য দিয়েছেন মর্মে পত্রিকায় সংবাদ রয়েছে। তাহলে মীর কাসেম আলী কি চট্টগ্রামে হেলিকপ্টারে গেছে?’ অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, ‘পাকিস্তানি বাহিনীর সহায়তায় যেতেও পারে।’ প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘মামলার তদন্ত কর্মকর্তা বা সাক্ষীও বলেননি মীর কাসেম আলী ১৯৭১ সালের ২৪ নভেম্বর চট্টগ্রামে ছিলেন। এসব তো আপনারা তাদের দিয়েও বলাতে পারতেন।’ অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, ‘আলবদর বাহিনীর নেতা হিসেবে মীর কাসেম আলী যা কমান্ড করত তাই হতো।’
প্রধান বিচারপতি বলেন, তখন কমান্ডের প্রয়োজন হতো না। ওই সময় জেনারেল নির্দেশ দিয়েছেলেন যে পোড়া মাটি চাই। মানুষ চাই। এ কারণে ওই সময় যার হাতে একটি বন্দুক ছিল, সে ক্ষমতাবান হয়ে যেত। যে রাজাকার যত বেশি কিলিং মিশন করত, সে তত বেশি জনপ্রিয় হয়ে উঠত। তখন আইন বলে কিছু ছিল না। শৃংখলা বলে কিছু ছিল না। তবে আপনারা প্রসিকিউশন টিম এ মামলা একেবারে দায়সারাভাবে উপস্থাপন করেছেন, যা দুঃখজনক। ট্রাইব্যুনালের অন্য কোনো মামলায় এত দুর্বল তথ্য ছিল না। এজন্য তদন্ত সংস্থা ও প্রসিকিউশনকে কাঠগড়ায় নেয়া উচিত। অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলেন, মীর কাসেম আলী যে একজন আলবদর বাহিনীর নেতা হিসেবে অপরাধ করেছেন এতে কোনো সন্দেহ নেই। আমি আশা করি তার সর্বোচ্চ সাজা বহাল থাকবে।
অ্যাটর্নি জেনারেলের বক্তব্য শেষ করার পর আসামিপক্ষের আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেন ও এসএম শাহজাহান প্রায় ২০ মিনিট কথা বলেন। খন্দকার মাহবুব হোসেন আদালতে বলেন, ‘মাই লর্ড, ১৯৭১ সালের ৭ নভেম্বরের আগ পর্যন্ত আমি ও মীর কাসেম আলী চট্টগ্রামে ছিলাম। মুক্তিযুদ্ধের এত বিশাল সময়ে আমার বিরুদ্ধে একটি অভিযোগও আনা হয়নি। ওই সময়ে আমি চট্টগ্রাম বিভাগের ছাত্রসংঘের সভাপতি ছিলাম। পরে ১৯৭১ সালের ৬ নভেম্বর থেকে ঢাকায় থাকি। কেননা তখন আমি ছাত্রসংঘের কেন্দ্রীয় সেক্রেটারি জেনারেল নির্বাচিত হয়েছিলাম। ৭ নভেম্বরের পর থেকে চট্টগ্রামে ছাত্রসংঘের দায়িত্বে ছিল আবু তাহের নামে অপর ব্যক্তি। আমি ডালিম হোটেলে যাব কীভাবে?’
প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘বিচারকরা অন্ধ। আমরা নথি দেখে রায় দেব।’ এরপর খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, ‘সাক্ষী ও তদন্ত কর্মকর্তারা সঠিক কোনো তথ্য দিতে পারেননি। সুতরাং মীর কাসেম আলীকে বেকসুর খালাস দেয়া হোক।’ প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘একেবারে বলবেন না দণ্ড দেয়া যাবে না। বরং এটা বলেন, মৃত্যুদণ্ড যেন দেয়া না হয়। কেননা ১৯৭১ সালে কমান্ড রেসপনসিবিলিটি বলতে কোনো আইন ছিল না। বরং যার হাতে বন্দুক ছিল সে ক্ষমতাবান। এরপর শুনানি শেষে প্রথমে ২ মার্চ রায়ের দিন ধার্য করা হয়। পরে ওইদিন প্রধান বিচারপতির ঢাকার বাইরে পূর্বনির্ধারিত একটি কর্মসূচি থাকায় রায়ের দিন পরিবর্তন করে ৮ মার্চ ধার্য করা হয়। শুনানি শেষে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম নিজের কার্যালয়ে সাংবাদিকদের বলেন, ‘ডালিম হোটেলে নিয়ে যে অত্যাচারের ঘটনা ঘটেছে, আসামিরা কিন্তু তা অস্বীকার করেনি। আসামিপক্ষের মূল বক্তব্য ছিল, সে সময় তিনি চট্টগ্রামে ছিলেন না। মীর কাসেম আলীর পক্ষে তার বোন যে সাক্ষ্য দিয়েছেন তাতে উনি উল্টো কথা বলেছেন। উনি বলেছেন, মীর কাসেম আলী কুমিল্লায় থাকতেন, তার বাবার সঙ্গে। কাজেই তাদের যে প্লি অব অ্যালিবাই, তা প্রমাণ হয়নি।’ জসীম, টিন্টো সেন, রঞ্জিত দাসকে হত্যার দায় থেকে মীর কাসেম আলী কোনোভাবেই ‘অব্যাহতি পেতে পারেন না’ বলে মন্তব্য করেন মাহবুবে আলম।
অন্যদিকে মীর কাসেম আলীর আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, এ মামলায় মীর কাসেম আলীকে ট্রাইব্যুনাল দুটি অভিযোগে মৃত্যুদণ্ডাদেশ দিয়েছিলেন। একটিতে বলা হয়, ১৯৭১ সালের ২৪ নভেম্বর চট্টগ্রামের ডালিম হোটেলে জসিম নামের একজনকে নির্যাতন করে হত্যা করেন মীর কাসেম আলী। কিন্তু ওই দিন তিনি ঢাকায় ছিলেন বলে প্রসিকিউশনের দেয়া পত্রিকায় উল্লেখ রয়েছে। তাহলে মীর কাসেম আলী কীভাবে হত্যা করবেন।
সপ্তম রায় : আপিল বিভাগে যুদ্ধাপরাধ মামলায় এর আগের ছয়টি রায়ের মধ্যে চারটিতে জামায়াতের দুই সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল কাদের মোল্লা ও মুহাম্মদ কামারুজ্জামান, দলটির সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ এবং বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর ফাঁসি কার্যকর হয়েছে। আপিল বিভাগের আরেক রায়ে জামায়াতের নায়েবে আমীর দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর সাজা কমিয়ে আমৃত্যু কারাদণ্ড দিয়েছেন। সেই রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি প্রকাশিত হওয়ার পর দুই পক্ষের করা রিভিউ আবেদন এখন নিষ্পত্তির অপেক্ষায়। আর সর্বশেষ রায়ে জামায়াতে ইসলামীর আমীর মতিউর রহমান নিজামীর সর্বোচ্চ সাজা বহাল রেখেছে আপিল বিভাগ। ওই রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি প্রকাশ হলে রিভিউ আবেদনের শুনানির পর সাজা বহাল থাকলে দণ্ড কার্যকরের প্রক্রিয়া শুরু করবে কারা কর্তৃপক্ষ।

No comments:
Post a Comment