বাংলাদেশী মেয়ে বিয়ে করে সংসারও পেতেছিলেন মূল হোতা পোল্যান্ডের নাগরিক পিটার * টাকা লুটের বড় প্রস্তুতি ছিল আন্তর্জাতিক চক্রের
অবশেষে
এটিএম কার্ড জালিয়াতির প্রধান হোতা চিহ্নিত হয়েছে। আছেন গোয়েন্দা পুলিশের
কব্জায়। আটক হওয়ার পর সবিস্তারে সব খোলাসাও করেছেন তিনি। যিনি একজন বিদেশী
নাগরিক। নাম তার থমাস। নকল নাম যুক্ত হয়ে এখন তার পুরো নাম থমাস পিটার। তার
জবানিতেই বেরিয়ে এসেছে বিস্ময়কর সব জালিয়াতির ঘটনা। তিনি শুধু এখানে নয়,
এর আগে নিজের দেশ পোল্যান্ডেও একই কাণ্ড ঘটিয়েছেন। একে একে রাশিয়া,
ইউক্রেন, রোমানিয়াসহ আরও কয়েকটি দেশে এই বিষবৃক্ষ রোপণ করেন। এমনকি যেখানে
এই অপকর্মের আখড়া গেড়েছেন সেখানেই স্থায়ীভাবে বসবাসের জন্য স্থানীয়
নাগরিককে বিয়েও করেন। একইভাবে ঢাকায় থেকে যাওয়ার জন্য বাংলাদেশী এক হোটেল
কর্মচারীকে বিয়ে করে বহাল-তবিয়তে সংসার পেতে বসেন। গেল সপ্তাহে তিনি পুত্র
সন্তানের বাবাও হয়েছেন। এভাবে বেরিয়ে এসেছে ক্রেডিট কার্ড জালিয়াতির সঙ্গে
যুক্ত গডফাদার পিটারসহ আন্তর্জাতিক এক বিরাট চক্রের আদ্যোপ্রান্ত।
এদিকে এই সাফল্যের পুরোভাগে রয়েছে যুগান্তর অনুসন্ধানী টিম। ঘটনার পর গোয়েন্দা সংস্থাগুলো যখন প্রকৃত অপরাধীদের শনাক্ত করতে রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছিল, ঠিক তখনই লন্ডন থেকে যুগান্তর অনুসন্ধানী সেলের এই প্রতিবেদকের কাছে আসল হোতাসহ পুরো নেটওয়ার্কের তথ্য-উপাত্ত চলে আসে। কিন্তু অপরাধীরা যাতে পালিয়ে যেতে না পারে সেজন্য চাঞ্চল্যকর রিপোর্টটি প্রকাশ করার পরিবর্তে যুগান্তরের সম্পাদকীয় নীতি অনুযায়ী দেশের স্বার্থের কথা বিবেচনা করে দ্রুত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহায়তা গ্রহণ করা হয়। এগিয়ে আসেন ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের নবগঠিত কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিটের প্রধান ডিআইজি মনিরুল ইসলাম।
অতঃপর অপারেশন সাকসেসফুল। মনিরুল ইসলামের নেতৃত্বে ডিবির চৌকস টিমের দ্রুততম সময়ের এই অপারেশনে গুলশান থেকে আটক হন পোল্যান্ডের নাগরিক থমাস পিটার। তবে এই অপারেশনের খবর পাওয়া মাত্রই তার নেটওয়ার্কে যুক্ত থাকা অন্যতম আরও তিনজন বিদেশী নাগরিকসহ বেশ কয়েকজন পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। আটককৃত পিটার সবিস্তারে মুখ খুলতে কিছুটা সময় নেয়ায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরবর্তী অপারেশনও বিলম্ব হয়ে যায়। তবে পিটারের কাছ থেকে যেসব তথ্য পাওয়া গেছে তাতে দেশী ও বিদেশী অনেকেই এখন গোয়েন্দা জালে আটকা পড়েছেন। চাঞ্চল্যকর এই মামলার সার্বিক তদন্তের প্রয়োজনে অনেককে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করা হতে পারে। সূত্র জানায়, আজ পিটারকে আদালতে হাজির করে রিমান্ড চাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এছাড়া ডিএমপির পক্ষ থেকে পুরো বিষয়টি গণমাধ্যমের সামনে উপস্থাপনও করা হতে পারে।
প্রসঙ্গত, এ মাসের প্রথম সপ্তাহে ৬ ও ৭ ফেব্র“য়ারি রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে স্থাপিত বেসরকারি তিনটি ব্যাংকের এটিএম বুথ থেকে অন্তত ২০ লাখ টাকা তুলে নেয় চক্রটি। টাকা হাতিয়ে নিতে তারা স্কিমিং ডিভাইস বসিয়ে গ্রাহকদের গোপন তথ্য চুরি করে। এরপর ঘটনার শিকার ২১ জন সাধারণ গ্রাহক ছাড়াও সংশ্লিষ্ট ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক লিমিটেড (ইউসিবিএল), সিটি ব্যাংক ও ইস্টার্ন ব্যাংক কর্তৃপক্ষের এ বিষয়ে টনক নড়ে। এ সেক্টরের কড়া নিরাপত্তা সুরক্ষায় বাংলাদেশ ব্যাংকও দ্রুত এগিয়ে আসে। মাঠে নামে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
চাঞ্চল্যকর তথ্যটি যেভাবে আসে : ১৬ ফেব্র“য়ারি। দিনটি ছিল মঙ্গলবার। এদিন বাংলাদেশ সময় দুপুর ১২টার দিকে প্রতিবেদকের কাছে লন্ডনের একটি সূত্র থেকে এটিএম কার্ড জালিয়াতির বিষয়ে প্রাথমিক তথ্য আসে। সূত্রটি নির্ভরযোগ্য হওয়ায় বিস্তারিত আরও তথ্য চাওয়া হয়। এরপর এক ঘণ্টার মধ্যে প্রধান হোতা থমাস পিটারের ছবিসহ তার গুলশানের ভাড়া ফ্ল্যাটের ঠিকানাও চলে আসে। এতে পিটারের অতীত কর্মকাণ্ডের নানা প্রফাইলও ছিল। প্রাপ্ত তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করতে গুলশানের ঠিকানায় গিয়ে তা যাচাই করা হয়। এরপর পিটারের অবস্থান নিশ্চিত হয়ে দ্রুত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহায়তা নেয়া হয়। রাতে অপারেশন সাকসেস করতে সন্ধ্যা থেকে পুরো এলাকার কড়া নজরদারির মধ্যে আনে ডিবির একটি টিম। রাতে ডিআইজি মনিরুল ইসলামের নেতৃত্বে ওই ফ্ল্যাট থেকে থমাস পিটারকে আটক করা হয়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে এটিএম কার্ড জালিয়াতির সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার বিষয়টি অনেকটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। আর এভাবে ওই রাতের অপারেশনটি পরবর্তীকালে বড় সফলতা এনে দেয়।
যা বলেছেন পিটার : চাঞ্চল্যকর এ ঘটনার তদন্তের স্বার্থে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জিজ্ঞাসাবাদের বিষয়ে এখনই বিস্তারিত কিছু বলতে চান না। তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সূত্রটি যা জানিয়েছে তা কম বিস্ময়কর নয়। পিটার জানিয়েছেন, ‘বাংলাদেশের গ্রাহকদের টাকা তুলে নেয়ার ঘটনা ছিল আমার একটি ভুল সিদ্ধান্ত। চার বছর ধরে ক্রেডিট কার্ড জালিয়াতি করে বাংলাদেশে বসেই শত শত বিদেশী গ্রাহকের টাকা তুলে নিয়েছি আমি। কিন্তু এতদিন ধরা পড়িনি। আমাকে কেউ শনাক্ত করতে পারেনি এবং আমি নিজেও জানতাম আমাকে সহজে কারও শনাক্ত করা সম্ভব হবে না। ধরা না পড়ার বিষয়ে আমার যথেষ্ট প্রযুক্তিগত সাপোর্ট ছিল। কিন্তু বেশি লোভ করতে গিয়ে আমি তোমাদের এখানকার টাকায় হাত দিয়েছি। এটা আমার উচিত হয়নি। আমি সত্যিই গভীরভাবে অনুতপ্ত। আমি সব সত্য বলে দেব। কিন্তু ওরা বড় শক্তিশালী, আমাকে মেরে ফেলবে। তাই তোমরা আমাকে পূর্ণ নিরাপত্তা দাও।’
সহযোগীদের বিষয়ে তথ্য দিয়ে তিনি বলেন, লন্ডনের হ্যাম্পশায়ারের একটি রেস্টুরেন্টে তাদের নিয়মিত আড্ডা রয়েছে। আর যে তিনজন বাংলাদেশ থেকে পালিয়ে গেছেন তারা মূলত স্পেনের বার্সেলোনা ও রোমানিয়ার বাসিন্দা। এছাড়া লন্ডন প্রবাসী একজন বাংলাদেশী নাগরিকের সংশ্লিষ্টতাও স্বীকার করেন পিটার। যার বাড়ি সিলেটের সদর থানায়।
তবে এ বিষয়ে নাম প্রকাশ করতে রাজি হননি তদন্ত সংশ্লিষ্টরা। কর্মকর্তারা যুগান্তরকে জানান, পালিয়ে যাওয়া পিটারের সহযোগীদের গ্রেফতারে ইন্টারপোলের সাহায্য নেয়া হবে।
গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের পিটার আরও জানান, ঢাকায় স্বাভাবিক চলাফেরার সময় তিনি মাথায় ক্যাপ পরতেন না। তবে এটিএম বুথে ঢুকে বিশেষ যন্ত্রের সাহায্যে যখন গ্রাহকের টাকা তুলতেন তখন নিজের চেহারা আড়াল করতে মাথায় ক্যাপ পরতেন। গোয়েন্দাদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বাংলাদেশে এসেছেন চার বছর আগে। এক বছর আগে তিনি এখানে বাংলাদেশী মেয়ে মেরিনাকে বিয়েও করেন।
এদিকে তথ্যানুসন্ধানে জানা গেছে, আদম ব্যবসার সূত্র ধরে বাংলাদেশে আসেন থমাস। শীর্ষ এক আদম ব্যবসায়ীর সঙ্গে যোগাযোগ করে কিছু লোককে বিদেশেও পাঠিয়েছেন। একটি দেশের ভিসা অফিসারের সঙ্গে গোপন আঁতাত করে আদম ব্যবসা নিয়ন্ত্রণে নেয়ার চেষ্টাও ছিল তার। কিন্তু তার প্রধান টার্গেট ছিল ক্রেডিট কার্ড জালিয়াতি। এটি ছিল তার খুবই সিক্রেট ক্রাইম। কিছুদিনের মধ্যে তিনি এ জালিয়াতি করে কোটি কোটি টাকা লুফে নেন। যখন বুঝতে পারেন তার এ কাজের জন্য বাংলাদেশ খুবই নিরাপদ, তখন তিনি বাংলাদেশে স্থায়ীভাবে থেকে যাওয়ার চেষ্টায় লিপ্ত হন। এর অংশ হিসেবে তিনি হোটেল হলিডে প্লানেট’র এক রিসিভসোনিস্টকে বেছে নেন। নাম মেরিনা। বিয়ে করার জন্য বাংলাদেশী মেরিনার সঙ্গে ভাব জমিয়ে তোলার চেষ্টা করেন। এক পর্যায়ে বিপুল অর্থবৃত্ত দেখে পিটারের ফাঁদে পা দেন মেরিনা। আগের স্বামীর ঘরে বেশিদিন সংসার হয়নি তার। আছে সে ঘরের একটি সন্তানও। পিটারের সঙ্গে কিছুদিন লিভ টুগেদারের পর বিয়ে বন্ধনে আবদ্ধ হন বছরখানেক আগে। এরপর গুলশান-২ এলাকার ১১২নং রোডের ১২নং বাড়ির একটি ফ্ল্যাট ভাড়া নেন। সেখানেই তারা বসবাস করতেন। সম্প্রতি মেরিনার গর্ভে তার এক পুত্রসন্তানের জন্ম হয়। এ নবজাতকের বয়স ৭ দিন। পিটার গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের জানিয়েছেন, ঘটনার পর একবার তিনি ঢাকা ত্যাগ করার সিদ্ধান্তও নিয়েছিলেন। কিন্তু সন্তানের মুখের দিকে তাকিয়ে তার মত পাল্টান।
এদিকে পিটারকে আটক করলেও তার স্ত্রী মেরিনাকে পুলিশ আয়ত্তের মধ্যে রেখেছে। তদন্তের প্রয়োজনে যে কোনো সময় তাকেও জিজ্ঞাসাবাদ করা হতে পারে। এ বিষয়ে একজন গোয়েন্দা কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, ‘মানবিক কারণে মেরিনাকে এ মুহূর্তে আটক করা হয়নি। আমরা একটু সময় নিচ্ছি। এছাড়া প্রথমদিকে পিটার তথ্য দিয়ে সহায়তা না করলেও এখন মোটামুটি অনেক কিছুই জানিয়েছেন।’
সূত্র আরও জানায়, বাংলাদেশে এসে কয়েকজনের সঙ্গে ব্যবসায়ী পরিচয়ে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলেন এ আন্তর্জাতিক প্রতারক। যারা তাকে শুধু একজন ব্যবসায়ী হিসেবে জানেন। ব্যবসা-বাণিজ্যের নানা সূত্রে তাদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগও ছিল তার। গুলশানের একটি বিলাসবহুল হোটেলে পিটার নিয়মিত পার্টির আয়োজন করতেন। সেখানে সরকার ও সমাজের অনেক প্রভাবশালী লোকজনও উপস্থিত হতেন। যাদের সঙ্গে ছবি তুলে তিনি তা বাংলাদেশী অনেক ব্যবসায়ীকে দেখিয়ে নিজের শক্ত অবস্থানের কথা জানান দিতেন।
জানা গেছে, থমাস পিটার আন্তর্জাতিক অপরাধী চক্রের সঙ্গে জড়িত। রাশিয়া, ইউক্রেন ও পোল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশে রয়েছে তার বহু সহযোগী। বাংলাদেশে বসেই আন্তর্জাতিক প্রতারক চক্রকে নিয়ন্ত্রণ করতেন তিনি। কয়েকটি দেশের পুলিশের তালিকায় পিটার আন্তর্জাতিক অপরাধী হিসেবে তালিকাভুক্ত। প্রথম এক বছর বাংলাদেশে ব্যবসায়ী হিসেবে ভিসা নিয়ে বসবাস করেন। এরপর গত তিন বছর ধরেই আছেন অবৈধভাবে। দেশীয় একটি চক্রের সহায়তায় বিভিন্ন ব্যাংকের এটিএম বুথ থেকে বিপুল অংকের টাকা লুট করার বড় ধরনের প্রস্তুতি ছিল তার। প্রথম ধাপেই স্কিমিং ডিভাইসের সাহায্যে টাকা লুট করার কৌশল রপ্ত করতে রোমানিয়া ও স্পেন থেকে তার তিন বন্ধুকে বাংলাদেশে নিয়ে আসেন। গত মাসের শেষ সপ্তাহে তারা শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়ে ঢাকায় প্রবেশ করেন। এরপর যথরীতি এটিএম বুথ থেকে টাকা তুলে নেয়ার পরই তারা পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। এর আগে গুলশানের হলিডে প্লানেট আবাসিক হোটেলে তারা থেকেছেন। হোটেল কর্তৃপক্ষ গোয়েন্দা পুলিশকে এসব তথ্য সম্পর্কে নিশ্চিত করেছে। প্রথমদিকে পিটার কয়েক মাস হলিডে প্লানেট আবাসিক হোটেলে নিজের আসল নাম ‘থমাস’ গোপন করে পিটার নামে ওই হোটেলে ডায়রিভুক্ত হন। এরপর নিয়মিত হোটেলটিতে যাতায়াত করার কারণে হোটেল কর্তৃপক্ষের কাছে পিটার নামে পরিচিত হয়ে উঠেন তিনি।
সূত্র জানায়, মাতাল অবস্থায় একবার হোটেলের এক দারোয়ানের মাথা ফাটিয়ে দেন পিটার। একপর্যায়ে বিদেশী অতিথি হওয়ায় বিষয়টি আইনশৃংখলা বাহিনীর সদস্যদের নজরে আনা হয়নি। সে সময় ওই দারোয়ানকে ৫ হাজার টাকা দিয়ে সমঝোতা করলেও হোটেলটির কর্মচারীরা তাকে ভাল চোখে দেখতেন না। এখানকার কর্মচারীরা গোয়েন্দা পুলিশকে জানিয়েছেন, গত কয়েক বছরে রোমানিয়া, ইউক্রেন, স্পেন ও রাশিয়ার বেশকিছু লোক পিটারের অতিথি হিসেবেই এই হোটেলেই থেকেছেন। তাদের গতিবিধি ছিল সব সময় সন্দেহজনক। কিন্তু তারা চাকরি হারানোর ভয়ে মুখ খুলতেন না।
এদিকে এই সাফল্যের পুরোভাগে রয়েছে যুগান্তর অনুসন্ধানী টিম। ঘটনার পর গোয়েন্দা সংস্থাগুলো যখন প্রকৃত অপরাধীদের শনাক্ত করতে রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছিল, ঠিক তখনই লন্ডন থেকে যুগান্তর অনুসন্ধানী সেলের এই প্রতিবেদকের কাছে আসল হোতাসহ পুরো নেটওয়ার্কের তথ্য-উপাত্ত চলে আসে। কিন্তু অপরাধীরা যাতে পালিয়ে যেতে না পারে সেজন্য চাঞ্চল্যকর রিপোর্টটি প্রকাশ করার পরিবর্তে যুগান্তরের সম্পাদকীয় নীতি অনুযায়ী দেশের স্বার্থের কথা বিবেচনা করে দ্রুত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহায়তা গ্রহণ করা হয়। এগিয়ে আসেন ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের নবগঠিত কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিটের প্রধান ডিআইজি মনিরুল ইসলাম।
অতঃপর অপারেশন সাকসেসফুল। মনিরুল ইসলামের নেতৃত্বে ডিবির চৌকস টিমের দ্রুততম সময়ের এই অপারেশনে গুলশান থেকে আটক হন পোল্যান্ডের নাগরিক থমাস পিটার। তবে এই অপারেশনের খবর পাওয়া মাত্রই তার নেটওয়ার্কে যুক্ত থাকা অন্যতম আরও তিনজন বিদেশী নাগরিকসহ বেশ কয়েকজন পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। আটককৃত পিটার সবিস্তারে মুখ খুলতে কিছুটা সময় নেয়ায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরবর্তী অপারেশনও বিলম্ব হয়ে যায়। তবে পিটারের কাছ থেকে যেসব তথ্য পাওয়া গেছে তাতে দেশী ও বিদেশী অনেকেই এখন গোয়েন্দা জালে আটকা পড়েছেন। চাঞ্চল্যকর এই মামলার সার্বিক তদন্তের প্রয়োজনে অনেককে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করা হতে পারে। সূত্র জানায়, আজ পিটারকে আদালতে হাজির করে রিমান্ড চাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এছাড়া ডিএমপির পক্ষ থেকে পুরো বিষয়টি গণমাধ্যমের সামনে উপস্থাপনও করা হতে পারে।
প্রসঙ্গত, এ মাসের প্রথম সপ্তাহে ৬ ও ৭ ফেব্র“য়ারি রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে স্থাপিত বেসরকারি তিনটি ব্যাংকের এটিএম বুথ থেকে অন্তত ২০ লাখ টাকা তুলে নেয় চক্রটি। টাকা হাতিয়ে নিতে তারা স্কিমিং ডিভাইস বসিয়ে গ্রাহকদের গোপন তথ্য চুরি করে। এরপর ঘটনার শিকার ২১ জন সাধারণ গ্রাহক ছাড়াও সংশ্লিষ্ট ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক লিমিটেড (ইউসিবিএল), সিটি ব্যাংক ও ইস্টার্ন ব্যাংক কর্তৃপক্ষের এ বিষয়ে টনক নড়ে। এ সেক্টরের কড়া নিরাপত্তা সুরক্ষায় বাংলাদেশ ব্যাংকও দ্রুত এগিয়ে আসে। মাঠে নামে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
চাঞ্চল্যকর তথ্যটি যেভাবে আসে : ১৬ ফেব্র“য়ারি। দিনটি ছিল মঙ্গলবার। এদিন বাংলাদেশ সময় দুপুর ১২টার দিকে প্রতিবেদকের কাছে লন্ডনের একটি সূত্র থেকে এটিএম কার্ড জালিয়াতির বিষয়ে প্রাথমিক তথ্য আসে। সূত্রটি নির্ভরযোগ্য হওয়ায় বিস্তারিত আরও তথ্য চাওয়া হয়। এরপর এক ঘণ্টার মধ্যে প্রধান হোতা থমাস পিটারের ছবিসহ তার গুলশানের ভাড়া ফ্ল্যাটের ঠিকানাও চলে আসে। এতে পিটারের অতীত কর্মকাণ্ডের নানা প্রফাইলও ছিল। প্রাপ্ত তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করতে গুলশানের ঠিকানায় গিয়ে তা যাচাই করা হয়। এরপর পিটারের অবস্থান নিশ্চিত হয়ে দ্রুত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহায়তা নেয়া হয়। রাতে অপারেশন সাকসেস করতে সন্ধ্যা থেকে পুরো এলাকার কড়া নজরদারির মধ্যে আনে ডিবির একটি টিম। রাতে ডিআইজি মনিরুল ইসলামের নেতৃত্বে ওই ফ্ল্যাট থেকে থমাস পিটারকে আটক করা হয়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে এটিএম কার্ড জালিয়াতির সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার বিষয়টি অনেকটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। আর এভাবে ওই রাতের অপারেশনটি পরবর্তীকালে বড় সফলতা এনে দেয়।
যা বলেছেন পিটার : চাঞ্চল্যকর এ ঘটনার তদন্তের স্বার্থে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জিজ্ঞাসাবাদের বিষয়ে এখনই বিস্তারিত কিছু বলতে চান না। তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সূত্রটি যা জানিয়েছে তা কম বিস্ময়কর নয়। পিটার জানিয়েছেন, ‘বাংলাদেশের গ্রাহকদের টাকা তুলে নেয়ার ঘটনা ছিল আমার একটি ভুল সিদ্ধান্ত। চার বছর ধরে ক্রেডিট কার্ড জালিয়াতি করে বাংলাদেশে বসেই শত শত বিদেশী গ্রাহকের টাকা তুলে নিয়েছি আমি। কিন্তু এতদিন ধরা পড়িনি। আমাকে কেউ শনাক্ত করতে পারেনি এবং আমি নিজেও জানতাম আমাকে সহজে কারও শনাক্ত করা সম্ভব হবে না। ধরা না পড়ার বিষয়ে আমার যথেষ্ট প্রযুক্তিগত সাপোর্ট ছিল। কিন্তু বেশি লোভ করতে গিয়ে আমি তোমাদের এখানকার টাকায় হাত দিয়েছি। এটা আমার উচিত হয়নি। আমি সত্যিই গভীরভাবে অনুতপ্ত। আমি সব সত্য বলে দেব। কিন্তু ওরা বড় শক্তিশালী, আমাকে মেরে ফেলবে। তাই তোমরা আমাকে পূর্ণ নিরাপত্তা দাও।’
সহযোগীদের বিষয়ে তথ্য দিয়ে তিনি বলেন, লন্ডনের হ্যাম্পশায়ারের একটি রেস্টুরেন্টে তাদের নিয়মিত আড্ডা রয়েছে। আর যে তিনজন বাংলাদেশ থেকে পালিয়ে গেছেন তারা মূলত স্পেনের বার্সেলোনা ও রোমানিয়ার বাসিন্দা। এছাড়া লন্ডন প্রবাসী একজন বাংলাদেশী নাগরিকের সংশ্লিষ্টতাও স্বীকার করেন পিটার। যার বাড়ি সিলেটের সদর থানায়।
তবে এ বিষয়ে নাম প্রকাশ করতে রাজি হননি তদন্ত সংশ্লিষ্টরা। কর্মকর্তারা যুগান্তরকে জানান, পালিয়ে যাওয়া পিটারের সহযোগীদের গ্রেফতারে ইন্টারপোলের সাহায্য নেয়া হবে।
গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের পিটার আরও জানান, ঢাকায় স্বাভাবিক চলাফেরার সময় তিনি মাথায় ক্যাপ পরতেন না। তবে এটিএম বুথে ঢুকে বিশেষ যন্ত্রের সাহায্যে যখন গ্রাহকের টাকা তুলতেন তখন নিজের চেহারা আড়াল করতে মাথায় ক্যাপ পরতেন। গোয়েন্দাদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বাংলাদেশে এসেছেন চার বছর আগে। এক বছর আগে তিনি এখানে বাংলাদেশী মেয়ে মেরিনাকে বিয়েও করেন।
এদিকে তথ্যানুসন্ধানে জানা গেছে, আদম ব্যবসার সূত্র ধরে বাংলাদেশে আসেন থমাস। শীর্ষ এক আদম ব্যবসায়ীর সঙ্গে যোগাযোগ করে কিছু লোককে বিদেশেও পাঠিয়েছেন। একটি দেশের ভিসা অফিসারের সঙ্গে গোপন আঁতাত করে আদম ব্যবসা নিয়ন্ত্রণে নেয়ার চেষ্টাও ছিল তার। কিন্তু তার প্রধান টার্গেট ছিল ক্রেডিট কার্ড জালিয়াতি। এটি ছিল তার খুবই সিক্রেট ক্রাইম। কিছুদিনের মধ্যে তিনি এ জালিয়াতি করে কোটি কোটি টাকা লুফে নেন। যখন বুঝতে পারেন তার এ কাজের জন্য বাংলাদেশ খুবই নিরাপদ, তখন তিনি বাংলাদেশে স্থায়ীভাবে থেকে যাওয়ার চেষ্টায় লিপ্ত হন। এর অংশ হিসেবে তিনি হোটেল হলিডে প্লানেট’র এক রিসিভসোনিস্টকে বেছে নেন। নাম মেরিনা। বিয়ে করার জন্য বাংলাদেশী মেরিনার সঙ্গে ভাব জমিয়ে তোলার চেষ্টা করেন। এক পর্যায়ে বিপুল অর্থবৃত্ত দেখে পিটারের ফাঁদে পা দেন মেরিনা। আগের স্বামীর ঘরে বেশিদিন সংসার হয়নি তার। আছে সে ঘরের একটি সন্তানও। পিটারের সঙ্গে কিছুদিন লিভ টুগেদারের পর বিয়ে বন্ধনে আবদ্ধ হন বছরখানেক আগে। এরপর গুলশান-২ এলাকার ১১২নং রোডের ১২নং বাড়ির একটি ফ্ল্যাট ভাড়া নেন। সেখানেই তারা বসবাস করতেন। সম্প্রতি মেরিনার গর্ভে তার এক পুত্রসন্তানের জন্ম হয়। এ নবজাতকের বয়স ৭ দিন। পিটার গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের জানিয়েছেন, ঘটনার পর একবার তিনি ঢাকা ত্যাগ করার সিদ্ধান্তও নিয়েছিলেন। কিন্তু সন্তানের মুখের দিকে তাকিয়ে তার মত পাল্টান।
এদিকে পিটারকে আটক করলেও তার স্ত্রী মেরিনাকে পুলিশ আয়ত্তের মধ্যে রেখেছে। তদন্তের প্রয়োজনে যে কোনো সময় তাকেও জিজ্ঞাসাবাদ করা হতে পারে। এ বিষয়ে একজন গোয়েন্দা কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, ‘মানবিক কারণে মেরিনাকে এ মুহূর্তে আটক করা হয়নি। আমরা একটু সময় নিচ্ছি। এছাড়া প্রথমদিকে পিটার তথ্য দিয়ে সহায়তা না করলেও এখন মোটামুটি অনেক কিছুই জানিয়েছেন।’
সূত্র আরও জানায়, বাংলাদেশে এসে কয়েকজনের সঙ্গে ব্যবসায়ী পরিচয়ে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলেন এ আন্তর্জাতিক প্রতারক। যারা তাকে শুধু একজন ব্যবসায়ী হিসেবে জানেন। ব্যবসা-বাণিজ্যের নানা সূত্রে তাদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগও ছিল তার। গুলশানের একটি বিলাসবহুল হোটেলে পিটার নিয়মিত পার্টির আয়োজন করতেন। সেখানে সরকার ও সমাজের অনেক প্রভাবশালী লোকজনও উপস্থিত হতেন। যাদের সঙ্গে ছবি তুলে তিনি তা বাংলাদেশী অনেক ব্যবসায়ীকে দেখিয়ে নিজের শক্ত অবস্থানের কথা জানান দিতেন।
জানা গেছে, থমাস পিটার আন্তর্জাতিক অপরাধী চক্রের সঙ্গে জড়িত। রাশিয়া, ইউক্রেন ও পোল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশে রয়েছে তার বহু সহযোগী। বাংলাদেশে বসেই আন্তর্জাতিক প্রতারক চক্রকে নিয়ন্ত্রণ করতেন তিনি। কয়েকটি দেশের পুলিশের তালিকায় পিটার আন্তর্জাতিক অপরাধী হিসেবে তালিকাভুক্ত। প্রথম এক বছর বাংলাদেশে ব্যবসায়ী হিসেবে ভিসা নিয়ে বসবাস করেন। এরপর গত তিন বছর ধরেই আছেন অবৈধভাবে। দেশীয় একটি চক্রের সহায়তায় বিভিন্ন ব্যাংকের এটিএম বুথ থেকে বিপুল অংকের টাকা লুট করার বড় ধরনের প্রস্তুতি ছিল তার। প্রথম ধাপেই স্কিমিং ডিভাইসের সাহায্যে টাকা লুট করার কৌশল রপ্ত করতে রোমানিয়া ও স্পেন থেকে তার তিন বন্ধুকে বাংলাদেশে নিয়ে আসেন। গত মাসের শেষ সপ্তাহে তারা শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়ে ঢাকায় প্রবেশ করেন। এরপর যথরীতি এটিএম বুথ থেকে টাকা তুলে নেয়ার পরই তারা পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। এর আগে গুলশানের হলিডে প্লানেট আবাসিক হোটেলে তারা থেকেছেন। হোটেল কর্তৃপক্ষ গোয়েন্দা পুলিশকে এসব তথ্য সম্পর্কে নিশ্চিত করেছে। প্রথমদিকে পিটার কয়েক মাস হলিডে প্লানেট আবাসিক হোটেলে নিজের আসল নাম ‘থমাস’ গোপন করে পিটার নামে ওই হোটেলে ডায়রিভুক্ত হন। এরপর নিয়মিত হোটেলটিতে যাতায়াত করার কারণে হোটেল কর্তৃপক্ষের কাছে পিটার নামে পরিচিত হয়ে উঠেন তিনি।
সূত্র জানায়, মাতাল অবস্থায় একবার হোটেলের এক দারোয়ানের মাথা ফাটিয়ে দেন পিটার। একপর্যায়ে বিদেশী অতিথি হওয়ায় বিষয়টি আইনশৃংখলা বাহিনীর সদস্যদের নজরে আনা হয়নি। সে সময় ওই দারোয়ানকে ৫ হাজার টাকা দিয়ে সমঝোতা করলেও হোটেলটির কর্মচারীরা তাকে ভাল চোখে দেখতেন না। এখানকার কর্মচারীরা গোয়েন্দা পুলিশকে জানিয়েছেন, গত কয়েক বছরে রোমানিয়া, ইউক্রেন, স্পেন ও রাশিয়ার বেশকিছু লোক পিটারের অতিথি হিসেবেই এই হোটেলেই থেকেছেন। তাদের গতিবিধি ছিল সব সময় সন্দেহজনক। কিন্তু তারা চাকরি হারানোর ভয়ে মুখ খুলতেন না।

No comments:
Post a Comment