Sunday, February 14, 2016

নানা রঙের বাহার বিক্রিও ভালো by শফিকুল ইসলাম

গতকাল শনিবার ছিল পয়লা ফাল্গুন। ঋতুরাজ বসন্তের প্রথম দিনে বাসন্তি সাজে বর্ণিল হয়ে উঠে অমর একুশে গ্রন্থমেলা। বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষ বসন্তের পোশাক পরে মেলায় ভিড় জমিয়েছিলেন। বিশেষ করে উঠতি বয়সের তরুণ-তরুণীরা মেলায় এসেছিলেন ঘুরতে। এসব তরুণ-তরুণীর গায়ে ছিল বর্ণাঢ্য পাঞ্জাবি, শাড়ি, থ্রি-পিস। মেয়েদের খোঁপায় ছিল হরেক রকমের ফুল। ছিল রকমারি ফুলের তৈরি মালা। ছিল চুড়ির ঝনঝনানি। একুশে গ্রন্থমেলা এবং পয়লা ফাল্গুন উপলক্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা, শাহবাগ ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে নেমেছিল জনতার ঢল। ফলে এসব এলাকার ট্রাফিকব্যবস্থাও ছিল স্থবির। ট্রাফিক পুলিশ উপস্থিত থাকলেও তারা কোনো নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি।
গতকালের বইমেলায় প্রেমিক জুটির উপস্থিতিও ছিল লণীয়। তারা একে অপরের হাত ধরে বইমেলায় এসে বিভিন্ন স্টলে পছন্দের বই কিনেন। ঘুরে দেখেন মেলার বিভিন্ন আঙিনা। মেলায় আসা এক জুটির সাথে কথা বললে জানান, প্রতি বছর ফাল্গুনের জন্য আমরা অপো করি।
বইমেলার পাশের রাস্তায় গতকাল আবারো দেখা যায় পুরনো চিত্র। হকারেরা বিভিন্ন ধরনের পণ্য নিয়ে পসরা বসিয়েছিলেন। ফলে মেলায় প্রবেশ করতে ভোগান্তিতে পড়তে হয়েছে আগতদের।
বসন্তে রঙিন রাজধানী : বসন্তের প্রথম দিন উৎসবে রঙিন হয়ে উঠে রাজধানী। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউট চত্বর ও আশপাশের এলাকায় সকাল থেকে দলবেঁধে আসতে থাকে তরুণ-তরুণীসহ নানা বয়সী মানুষ। বাসন্তি রঙে বাহারি সাজে ফাল্গুনকে বরণ করে নেন তারা।
ভোরের আলো ফোটার সাথে সাথে চারুকলার বকুলতলায় বসন্ত উদযাপন করতে আসে শত শত মানুষ। এখানে বেশ কয়েকটি সাংস্কৃতিক সংগঠন গানে ও নৃত্যের তালে তালে বসন্তকে বরণ করে নেয়। তরুণীদের পরনে ছিল হলুদ শাড়ি। মাথায় এক গোছা ফুল বা ফুলের মালা। ছেলেদের পরনে ছিল হলুদ আর রঙিন পাঞ্জাবি। অনেকে আবির মেখে বসন্তের সাজে আসে। সকাল ১০টায় বের হয় বসন্তের শোভাযাত্রা। শাহবাগের ফুলের দোকানগুলোতেও ফুলের মালার বিক্রি বেড়েছে কয়েক গুণ। বসন্ত উৎসব বকুলতলা ছাড়িয়ে পুরো চারুকলা চত্বরে ছড়িয়ে পড়ে।
বসন্তের উচ্ছ্বাস বইমেলায় : গতকাল ঋতুরাজ বসন্তের প্রথম দিনেই উচ্ছ্বসিত হয়ে ওঠে বাংলা একাডেমির অমর একুশে গ্রন্থমেলা। উঠতি বয়সের তরুণ-তরুণী আর নানা বয়সী মানুষের ভিড়ে মেলা ছিল প্রাণোচ্ছল। মেলায় প্রবেশের জন্য রাস্তার দুই দিকেই আর্চওয়েতে দীর্ঘ লাইন ছিল আগতদের। সারিবদ্ধভাবে মেলায় প্রবেশ করেন তারা।
বেসামাল ট্রাফিক : এক দিকে বইমেলা। অন্য দিকে পয়লা ফাল্গুন। ফলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে মানুষের আগমন ছিল সবচেয়ে বেশি। গতকাল বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় এতই লোকসমাগম হয়, ট্রাফিকব্যবস্থা বেসামাল হয়ে পড়ে। পুলিশ যানবাহন নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়েছে। টিএসসি, শাহবাগ, দোয়েল চত্বর, রাজু ভাস্কর্য এলাকা, শহীদ মিনার, ভিসি চত্বরসহ বিভিন্ন এলাকায় কয়েক ঘণ্টাব্যাপী যানজটের সৃষ্টি হয়। এ ছাড়া মেলার বাইরের রাস্তায় আবারো বিভিন্ন পণ্যের পসরা সাজিয়ে রাস্তা বন্ধ করে রাখে হকারেরা। মুড়ি, মুড়কি, পাইরেটেড বইসহ বিভিন্ন দোকান বসে পড়ে রাস্তায়। এসব কিছুর দিকেও পুলিশের কোনো খেয়াল ছিল না।
বিক্রি ভালো : গতকাল ছিল গ্রন্থমেলার ১৩তম দিন। তবে যারা মেলায় প্রবেশ করেছিলেন তারা সবাই বই না কিনলেও অধিকাংশই বই কিনেছেন বলে প্রকাশকেরা জানান। ঐতিহ্য প্রকাশনীর স্টল ইনচার্জ আমজাদ হোসেন কাজল বলেন, বসন্তের প্রথম দিনে বিক্রি ভালোই। তুলনামূলকভাবে বিক্রি ভালোই হচ্ছে। আদর্শ প্রকাশনীর মালিক মামুন অর রশিদ বলেন, শুরু থেকেই বিক্রিতে জোয়ার-ভাটা ছিল। কিন্তু পয়লা ফাল্গুনে লোকসমাগম হিসেবে বিক্রি ভালোই হয়েছে।
গতকাল মেলায় নতুন বই : ১৩ ফেব্র“য়ারি ২০১৬ শনিবার। অমর একুশে গ্রন্থমেলার ১৩তম দিন। মেলায় আজ নতুন বই এসেছে ১৩৫টি। এর মধ্যেÑ গল্প ২৫, উপন্যাস ২২, প্রবন্ধ ১, কবিতা ৪২, গবেষণা ৩, ছড়া ৫, জীবনী ৫, রচনাবলি ১, মুক্তিযুদ্ধ ৬, নাটক ১, বিজ্ঞান ১, ভ্রমণ ৩, চিকিৎসা ১, কম্পিউটার ১, সায়েন্স ফিকশন ১ এবং অন্যান্য ১৭টি। উল্লেখযোগ্য নতুন বইয়ের মধ্যেÑ ঐতিহ্য থেকে কাইজার চৌধুরীর ভুলু সর্দারের চিঠি, রওশন আরা মুক্তার আলেদোরাদো, শাহানা আকতার মহুয়ার দূরের ক্যানভাস, অন্য প্রকাশ থেকে একুয়া রিজিয়ার মনোসরণি, নাসরীন জাহানের সেরা দশ গল্প, লিয়াকত হোসেন খোকনের চিরদিনের উত্তম কুমার, অ্যাডর্ন থেকে ডা: অমূল্য রতন চক্রবর্ত্তীর একজন ক্যাপ্টেন দত্তের তিন শতাব্দীর গল্প, অনিন্দ্য থেকে জামিল হাসান সুজনের প্রবাসে সুখ দুঃখ, অনন্যা থেকে সামসুদ্দিন আহ্মেদের কেনো মিছে ভালোবাসা, পপি পারমিতর সঙ্গিনী।
সাধারণ জ্ঞান প্রতিযোগিতার ফল : অমর একুশে উদযাপন উপলে সকাল ১০টায় বাংলা একাডেমির মূল মঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় শিশু-কিশোর সাধারণ জ্ঞান ও উপস্থিত বক্তৃতা প্রতিযোগিতার চূড়ান্ত পর্ব। প্রতিযোগিতায় বিচারক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন শিশুসাহিত্যিক সুজন বড়–য়া, নাট্যজন মাসুম রেজা এবং বাংলা একাডেমির পরিচালক শাহিদা খাতুন। উপস্থিত বক্তৃতা প্রতিযোগিতায় প্রথম হয়েছেন অনিশা দাস, দ্বিতীয় হয়েছেন যুগ্মভাবে আনান আবরার ইসলাম ও রেজা শাওয়াল রিজওয়ান এবং তৃতীয় হয়েছেন সিরাতুল মোস্তাকিম শ্রাবণী। সাধারণ জ্ঞান প্রতিযোগিতায় প্রথম হয়েছেন আকিবা আফরোজ রাকা, দ্বিতীয় হয়েছেন তাসফিয়া চৌধুরী এবং তৃতীয় হয়েছেন আদনান বিন আলমগীর। অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন সাধারণ জ্ঞান ও উপস্থিত বক্তৃতা কমিটির আহ্বায়ক ড. আমিনুর রহমান সুলতান।
মেলামঞ্চে গতকাল : বিকেল ৪টায় গ্রন্থমেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধ চর্চা : অতীত থেকে বর্তমান শীর্ষক আলোচনা। এতে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন অধ্যাপক মেসবাহ কামাল। আলোচনায় অংশ নেন ইতিহাসবিদ অধ্যাপক ড. সৈয়দ আনোয়ার হোসেন, ড. মোহাম্মদ সেলিম এবং দিব্যদ্যুতি সরকার। সভাপতিত্ব করেন অধ্যাপক সনৎকুমার সাহা। অনুষ্ঠানের শুরুতে কবি কায়সুল হকের মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করে দাঁড়িয়ে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়।
প্রাবন্ধিক বলেন, বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধ চর্চার নানা মাত্রা রয়েছে। প্রাতিষ্ঠানিকপর্যায়ে ও ব্যক্তিগত উদ্যোগে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ে গবেষণা হয়েছে। আবার রাষ্ট্রমতায় মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তি থাকাকালে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতও হয়েছে। ৯ মাসের রক্তাক্ত মুক্তিযুদ্ধ, গেরিলাযোদ্ধা, যুদ্ধাপরাধ, বধ্যভূমি, গণহত্যা, নারী নির্যাতন ইত্যাদি নানা বিষয়ে গবেষণা হলেও মুক্তিযুদ্ধের লাখ লাখ শরণার্থী নিয়ে আরো বিস্তৃত গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে। সেই সাথে মুক্তিযুদ্ধের পরে জাতীয়তাববাদী ও বামপন্থী রাজনৈতিক শক্তির ভূমিকা এবং একই সাথে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী পরে দলের ভূমিকা নিয়েও গবেষণা জরুরি। তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর গৌরবময় ভূমিকাও ব্যাপক বিশ্লেষণের দাবি রাখে।
সন্ধ্যায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে আবৃত্তি পরিবেশন করেন আবৃত্তিশিল্পী নিমাই মণ্ডল এবং তামান্না নীপা। সোহেল রহমানের পরিচালনা নৃত্য পরিবেশন করেন নৃত্য সংগঠন ‘শিখর কালচারাল অর্গানাইজেশন’-এর শিল্পীরা। এ ছাড়াও সঙ্গীত পরিবেশন করেন কণ্ঠশিল্পী জিনাত রেহানা, বদরুন্নেসা ডালিয়া, শ্যামা সরকার, জয় শাহরিয়ার, পল্লব গোমেজ, রাজু আহমেদ এবং জুলি শারমিলী।
মেলায় আজকের আয়োজন : আজ রোববার গ্রন্থমেলা শুরু হবে বেলা ৩টায় এবং চলবে রাত ৮টা পর্যন্ত। বিকেল ৪টায় গ্রন্থমেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হবে বাংলাদেশে রবীন্দ্রচর্চা : অতীত থেকে বর্তমান শীর্ষক আলোচনা। এতে প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন অধ্যাপক বিশ্বজিৎ ঘোষ। আলোচনা করবেন বিশিষ্ট সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব রামেন্দু মজুমদার, অধ্যাপক করুণাময় গোস্বামী এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আতিউর রহমান। সভাপতিত্ব করবেন অধ্যাপক গোলাম মুরশিদ। সন্ধ্যায় রয়েছে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।

No comments:

Post a Comment