Sunday, February 14, 2016

মানুষ পোড়ানোর গন্ধে বন্দিশিবিরের বাতাস ভারী by সরাফ আহমেদ

আদালতে যাচ্ছেন জাস্টিন সনডার। ছবি: সরাফ আহমেদ, জার্মানি
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ৭১ বছর পর শুরু হওয়া যুদ্ধাপরাধী পোল্যান্ডের অশউইৎজ বন্দিশিবিরে কর্মরত এসএস বাহিনীর প্রহরী ৯৩ বছর বয়স্ক রাইনহোল্ড হানিংয়ের বিচারপ্রক্রিয়ার দ্বিতীয় দিনে তিনজন বন্দীর সাক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। আদালতে একজন সাক্ষী বলেন, মানুষ পোড়ানোর উৎকট গন্ধে অশউইৎজ বন্দিশিবিরের বাতাস ভারী হয়ে ওঠে।
জার্মানির ছোট শহর ডেটমন্ডের আদালত ভবনে স্থান সংকুলান না হওয়ায় শহরের চেম্বার অব কমার্স ভবনে জনাকীর্ণ আদালতে বিচারপতি আঙ্কে গ্রুডার সামনে গত শুক্রবার অশউইৎজ বন্দিশিবিরের সাবেক তিন বন্দী তাঁদের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেন। এঁরা হলেন হামবুর্গে জন্ম নেওয়া ৯৪ বছর সাক্ষী লিয়ন সায়ার্জবাউম, ৯০ বছর বয়সী জার্মানির কেমনিজে জন্ম নেওয়া জাস্টিন সনডার ও কাউজার লাউটের ৯২ বছরের এর্না ডি ভেরেস।
দুই বছর আগে জার্মানির বাডেনভুর্টেনবুর্গ রাজ্যের লুডভিগবুর্গ শহরে অবস্থিত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-বিষয়ক কেন্দ্রীয় মহাফেজখানায় পাওয়া একটি দলিলের সূত্র ধরে পোল্যান্ডের অশউইৎজ বন্দিশিবিরে কর্মরত এসএস বাহিনীর প্রহরী ও কর্মচারীদের মধ্য যে ৩০ জন জীবিত যুদ্ধাপরাধীর নাম-পরিচয় খুঁজে পাওয়া গিয়েছিল, হানিং তাঁদের অন্যতম।
লিয়ন সায়ার্জবাউম বলেন, ‘বিশাল হলে গ্যাস চেম্বারের পাশেই হত্যা করা বন্দীদের পোড়ানোর চুল্লি দিয়ে আগুনের ঝলক বের হচ্ছে। আর সারা এলাকায় ছড়িয়ে পড়া মানুষ পোড়ানোর উৎকট অসহনীয় গন্ধে অশউইৎজ বন্দিশিবিরের বাতাস ভারী হয়ে পড়েছিল।’
লিয়ন সায়ার্জবাউম বলেন, ‘অশউইৎজ বন্দিশিবির কর্তৃপক্ষ নানা কাজে আমাকে শ্রমদাস হিসেবে রাখার কারণে প্রায়ই গ্যাস চেম্বারের কাছে যেতে হতো। লম্বা সারি দিয়ে গ্যাস চেম্বারে প্রবেশের আগে অসহায় বন্দীরা ‘পানি পানি’ করে চিৎকার করত।’ এরপর নিজের কাছে থাকা একটি ছবি বের করে আদালতে তিনি বলেন, ‘দেখুন ছবিতে আমার বাবা আর মা। এঁদেরও গ্যাস চেম্বারে হত্যা করা হয়। কী দোষ ছিল তাঁদের?’ বলেই কান্নায় ভেঙে পড়েন ৯৪ বছর বয়স্ক লিয়ন সায়ার্জবাউম।
এরপর আদালতে সাক্ষ্য দেন ৯০ বছর বয়সী জার্মানির কেমনিজে জন্ম নেওয়া জাস্টিন সনডার। ১৯৪৩ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি হিটলারের গেস্টাপো বাহিনীর হাতে ধরা পড়ে প্রথমে ড্রেসডেন, এরপর মধ্যরাতে কুখ্যাত অশউইৎজ বন্দিশিবিরে আনার বর্ণনা দিয়ে জাস্টিন সনডার বলেন, সদ্য আসা বন্দীদের বয়স ও পেশা জিজ্ঞাসার পর বিশাল বন্দিশিবিরের লম্বা কুঠুরিগুলোতে জায়গা দেওয়া হতো। বন্দিজীবনে অশউইৎজ বন্দিশিবিরে কোনো সদাশয় প্রহরীর সাক্ষাৎ​ পেয়েছিলেন কি না, এই প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘তেমন কোনো প্রহরীর দেখা পাইনি।’
যুদ্ধাপরাধীর বিচারপ্রক্রিয়ার দ্বিতীয় দিনে শেষ সাক্ষী ছিলেন কাউজার লাউটের ৯২ বছরের এর্না ডি ভেরেস। তিনি বলেন, প্রথমে তাঁদের রেভেনসব্রুকের বন্দিশিবিরে আটকে রাখা হয়েছিল। সেখানে তাঁর বাবাকে হত্যার পর মাসহ তাঁকে অশউইৎজ বন্দিশিবিরে পাঠানো হয়। বন্দিশিবিরে বাছাইপ্রক্রিয়ায় তাঁকে তাঁর মায়ের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখা হয় এবং এরপর মাকে আর খুঁজে পাননি বলে জানান তিনি।
যুদ্ধাপরাধী পোল্যান্ডের অশউইৎজ বন্দিশিবিরে কর্মরত এসএস বাহিনীর প্রহরী ৯৩ বছর বয়স্ক রাইনহোল্ড হানিং গতকাল বলেছেন, সব সাক্ষীর কথা শোনার পর তিনি বক্তব্য দেবেন।
আদালতের বিচারপতি আঙ্কে গ্রুডার জানিয়েছেন আগামী বৃহস্পতিবার ১৮ ফেব্রুয়ারি আদালত আবার অপর সাক্ষীদের বক্তব্য শুনবেন।

No comments:

Post a Comment