Monday, February 8, 2016

বহাল তবিয়তেই আছেন ডিসিসির দুর্নীতিবাজরা by মতিন আব্দুল্লাহ

দিলকুশায় ৩০ তলা কার পার্কিং ভবন নির্মাণে দুর্নীতি
রাজধানীর দিলকুশায় ৩০ তলা কার পার্কিং ভবন ‘সানমুন স্টার টাওয়ার’ নির্মাণে নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত তৎকালীন ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের (ডিসিসি) দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তারা বহাল তবিয়তেই আছেন। সরকারের দুটি তদন্ত কমিটি সংশ্লিষ্টদের দোষী সাব্যস্ত করে শাস্তির নির্দেশ দেয়ার দেড় মাস পরও অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। উল্টো অভিযুক্তদের বেশিরভাগ পদোন্নতি পেয়েছেন। অভিযুক্তদের কয়েকজন এখন ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনে (ডিএসসিসি) ও ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনে (ডিএনসিসি) কর্মরত রয়েছেন। কয়েকজন অন্যত্র বদলি হয়েছে এবং অবসরে গেছেন দু’জন কর্মকর্তা।
অভিযোগ উঠেছে, ডিএসসিসির দুর্নীতিবাজদের বাঁচাতে মরিয়া হয়ে লড়ছেন সংস্থাটির সচিব খান মো. রেজাউল করিম। তিনি দুর্নীতিবাজদের কাছ থেকে ৪০ লাখ টাকা গ্রহণ করেছেন বলেও ডিএসসিসিতে আলোচনা হচ্ছে। তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করে রেজাউল করিম যুগান্তরকে জানান, দুর্নীতিবাজদের পক্ষ নেয়ার কোনো প্রশ্নেই ওঠে না। মেয়রের নির্দেশনা অনুযায়ী কার্যক্রম পরিচালনা করবেন তিনি। অন্যদিকে ডিএনসিসি সচিব নবীরুল ইসলাম জানান, মন্ত্রণালয়ের চিঠি আগে ইস্যু হলেও পেয়েছেন কয়েকদিন আগে। নির্দেশনা অনুযায়ী ফাইল প্রস্তুত কার্যক্রম চলছে। দ্রুত তা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হবে।
অভিযুক্ত ১৫ কর্মকর্তা হলেন তৎকালীন প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা নুরুল হক, প্রধান প্রকৌশলী আবদুল কাদির, সচিব মো. সামসুজ্জামান, প্রকল্প পরিচালক সেহাব উল্লাহ, নির্বাহী প্রকৌশলী প্রকৌশলী নুরুল আমিন, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী সৈয়দ কুদরত উল্লাহ, সহকারী প্রকৌশলী মফিজুর রহমান খান, সহকারী প্রকৌশলী আবুল কালাম আজাদ, আইন কর্মকর্তা এমএস করিম, সহকারী সচিব জুনায়েদ আমিন, নির্বাহী প্রকৌশলী মনসুর আহমেদ, উপসহকারী প্রকৌশলী আমিনুর রহমান চৌধুরী ও হারুন-অর রশীদ, নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ শহিদ উল্লাহ ও তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ফারুখ আজিজ।
এর মধ্যে ৯ জন পদোন্নতি পেয়েছেন। আবদুল কাদির পদোন্নতি পেয়ে বর্তমানে মিলিটারি ইন্সটিটিউট অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজিতে (এমআইএসটি) কর্মরত। সেহাব উল্লাহ ডিএসসিসির তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী পদে স্থায়ী হয়েছেন। ডিএসসিসির অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী হয়েছেন মো. নুরুল আমিন ও ডিএনসিসির অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী হয়েছেন প্রকৌশলী মো. কুদরত উল্লাহ। মো. সামসুজ্জামান উপসচিব থেকে যুগ্ম সচিব হয়েছেন। বর্তমানে তিনি একটি মন্ত্রণালয়ে কর্মরত রয়েছেন। মফিজুর রহমান খান ও আবুল কালাম আজাদ পদোন্নতি পেয়ে ডিএসসিসির নির্বাহী প্রকৌশলী হয়েছেন। আবুল কালাম আজাদ উচ্চশিক্ষার জন্য বর্তমানে অস্ট্রেলিয়ায়। মনসুর আহমেদ নির্বাহী প্রকৌশলী পদে পদোন্নতি পেয়ে ডিএনসিসিতে কর্মরত। তবে অন্য দুটি প্রকল্পে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগে বর্তমানে তিনি সাময়িক বরখাস্ত। আমিনুর রহমান চৌধুরী ও হারুন-অর রশীদ পদোন্নতি পেয়ে নির্বাহী প্রকৌশলী হয়ে ডিএসসিসিতে কর্মরত। এছাড়া নুরুল হক, শহিদ উল্লাহ নিয়মিত অবসরে ও ফারুখ আজিজ স্বেচ্ছায় অবসর নিয়েছেন।
তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, বঙ্গভবনের উত্তরের প্রাচীর ঘেঁষে ৩৭ দিলকুশায় পৌনে চার বিঘা জমির ওপর আধুনিক পার্কিং ও বহুতল বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণের সিদ্ধান্ত হয় ২০০৩ সালের ৫ এপ্রিল। সিদ্ধান্ত ছিল, তৎকালীন ডিসিসির নিজস্ব কোনো অর্থায়ন ছাড়া সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের (পিপিপি) মাধ্যমে ওই ভবন নির্মাণ করা হবে এবং ৩০ শতাংশ ফ্লোর স্পেস পাবে ডিসিসি। কিন্তু ভবনের প্রথম পাঁচতলা নির্মাণের পুরো খরচই নির্মাতা প্রতিষ্ঠান এমআর ট্রেডিংকে দেয় ডিসিসি। ২৩ তলার পরিবর্তে নির্মাণ করা হয় ৩০ তলা। এছাড়া প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অনুমতিও নেয়া হয়নি।
গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা বঙ্গভবনের ২০ গজের মধ্যে এ ভবন রাষ্ট্রপতির নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ায়- বিষয়টি বঙ্গভবনের দৃষ্টিতে এলে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন যুগ্ম সচিব (তদারকি ও মূল্যায়ন) আবুল কাসেমকে প্রধান করে তদন্ত কমিটি করা হয়। কমিটি ১৮টি অনিয়মের কথা উল্লেখ করে ডিসিসির ১১ প্রকৌশলীসহ মোট ১৫ জন কর্মকর্তাকে অভিযুক্ত করা হয় এবং তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণে সুপারিশ করে।
কিন্তু এ তদন্ত প্রতিবেদনকে ‘পক্ষপাতদুষ্ট’ বলে দাবি করে অভিযুক্তদের দু’জন। এরপর গত বছরের জুনে স্থানীয় সরকার বিভাগের অতিরিক্ত সচিব সিরাজুল ইসলামকে প্রধান করে আরেকটি তদন্ত কমিটি করা হয়। প্রথম প্রতিবেদন যাচাই-বাছাই করে সবকিছু বস্তুনিষ্ঠ হওয়ায় একই ধরনের প্রতিবেদন জমা দেন দ্বিতীয় পর্যায়ের তদন্ত কমিটি। পরবর্তীতে গত বছরের ২২ ডিসেম্বর স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয় থেকে নির্মাণ প্রক্রিয়ায় দুর্নীতির সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেয়া হয়। কিন্তু দেড় মাস পরও কোনো ব্যবস্থা গ্রহণের উদ্যোগ নেয়নি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
মন্ত্রণালয়ের তদন্ত প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, দিলকুশা কার পার্কিং ভবনের প্রতিটি তলায় ৩২ হাজার বর্গফুট ধরে অতিরিক্ত ৭টি তলায় ২ লাখ ২৪ হাজার বর্গফুট স্পেস তৈরির সুযোগ দিয়েছিলেন অসাধু কর্মকর্তারা। প্রতি বর্গফুটের দাম ১০ হাজার টাকা দরে যার বাজার মূল্য ১ হাজার ৩৮০ কোটি টাকা। নির্মাণব্যয় বাদ দিলেও অন্তত ৫০০ কোটি টাকার আর্থিক সুবিধা নির্মাতা প্রতিষ্ঠান এমআর ট্রেডিংকে দিয়েছিলেন অসাধু কর্মকর্তারা। বিনিময়ে তারা নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে সুবিধা পেয়েছেন।
এদিকে, এ ঘটনায় ২০১২ সালের ২৯ মার্চ শাহবাগ থানায় মামলা করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। মামলায় অভিযোগ করা হয়, চুক্তি করার সময় সংস্থার ও সরকারের স্বার্থ নজরে না নেয়ায় সিটি কর্পোরেশনের ৮২৭ কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। মামলায় সাবেক মেয়র সাদেক হোসেন খোকাকে প্রধান আসামি করে নুরুল হক, সেহাব উল্লাহ, মনসুর আহমদ, আমিনুর রহমান চৌধুরী, মফিজুর রহমান ও নির্মাতা প্রতিষ্ঠান এমআর ট্রেডিংয়ের মালিক মিজানুর রহমানকে আসামি করা হয়। কিন্তু গত ২৩ সেপ্টেম্বর দুদকের দেয়া চার্জশিটে শুধু সাদেক হোসেন খোকাসহ মনসুর আহমেদ, মফিজুর রহমান ও আমিনুর রহমান চৌধুরীর নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়। তবে ওই চার্জশিটের বিরুদ্ধে মনসুর আহমেদ রিট করায় আদালত মামলার কার্যক্রম স্থগিত করে। এ বিষয়ে ডিএসসিসির মেয়র সাঈদ খোকন রোববার যুগান্তরকে জানান, তদন্ত প্রতিবেদনের আলোকে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। বলেন, ফাইল প্রসেস হয়ে এখনও আমার দফতরে পৌঁছেনি। ওই ফাইল আমার দফতরে আসামাত্রই আমি ফাইল অনুমোদন করে দেব।
আর ডিএনসিসির মেয়র আনিসুল হক জানান, দিলকুশা কার পার্কিংয়ের ঘটনা অনেক পুরনো। আমি আমার সময়ের বিষয়ে ব্যবস্থা গ্রহণের পক্ষে। পুরনো বিষয় নিয়ে খুব বেশি ঘাঁটাঘাঁটি করতে চাই না। তিনি বলেন, তারপরও সরকারের নির্দেশনায় কী বলা আছে সেগুলো যাচাই-বাছাই করে দেখব।

No comments:

Post a Comment