![]() |
| রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনে গতকাল বিএনপির কাউন্সিলের উদ্বোধনী পর্বে বক্তব্য দেন দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। -প্রথম আলো |
বিএনপি
নতুনধারার রাজনীতি ও সরকার প্রতিষ্ঠা করতে চায়। এ জন্য নতুন এক সামাজিক
সমঝোতা বা চুক্তিতে উপনীত হতে উদ্যোগ নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন দলের চেয়ারপারসন
খালেদা জিয়া। তিনি বলেছেন, তাঁর দল রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় গেলে প্রধানমন্ত্রীর
নির্বাহী ক্ষমতায় ভারসাম্য আনা হবে এবং দুই কক্ষবিশিষ্ট জাতীয় সংসদ করার
পদক্ষেপ নেবে।
গতকাল শনিবার সকালে রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন চত্বরে বিএনপির ষষ্ঠ জাতীয় সম্মেলনে খালেদা জিয়া এ ঘোষণা দেন। তিনি বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর একক নির্বাহী ক্ষমতা সংসদীয় সরকারের আবরণে একটি স্বৈরাচারী একনায়কতান্ত্রিক শাসনের জন্ম দিয়েছে। এই অবস্থার অবসানকল্পে প্রজাতন্ত্রের নির্বাহী ক্ষমতার ক্ষেত্রে ভারসাম্য আনা হবে।’
বিএনপির চেয়ারপারসন বলেন, রাষ্ট্রের এককেন্দ্রিক চরিত্র অক্ষুণ্ন রেখে বিদ্যমান সংসদীয় ব্যবস্থা সংস্কারের অংশ হিসেবে বিভিন্ন সম্প্রদায়, প্রান্তিক গোষ্ঠী ও পেশার জ্ঞানী-গুণী ও মেধাবী ব্যক্তিদের সমন্বয়ে জাতীয় সংসদে একটি উচ্চকক্ষ প্রতিষ্ঠা করা হবে। এ ছাড়া জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে জনগণের সম্মতি গ্রহণের পন্থা ‘রেফারেন্ডাম’ বা ‘গণভোট’ ব্যবস্থা সংবিধানে পুনঃপ্রবর্তন করা হবে।
বেলা পৌনে ১১টায় জাতীয় সংগীত পরিবেশন ও জাতীয় পতাকা উত্তোলনের মধ্য দিয়ে বিএনপির জাতীয় সম্মেলন উদ্বোধন করেন খালেদা জিয়া। এর আগেই ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন চত্বর আমন্ত্রিত অতিথি, কাউন্সিলর ও দলের নেতা-কর্মীদের উপস্থিতিতে কানায় কানায় ভরে যায়। একপর্যায়ে তা সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের এক পাশ, সামনের সড়কের মৎস্য ভবন থেকে শিশুপার্ক পর্যন্ত ছাড়িয়ে যায়। রমনা পার্কের ভেতরেও অনেকে অবস্থান নেন। ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনের সামনের সড়কের এক পাশে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।
খালেদা জিয়া প্রায় ১ ঘণ্টা ২০ মিনিট বক্তব্য দেন। তিনি সংলাপে বসার জন্য সরকারের প্রতি আবারও আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ‘দেশের প্রায় সবাই একটি জনপ্রতিনিধিত্বশীল, গণতান্ত্রিক সরকার চায়। এ জন্য যত দ্রুত সম্ভব সবার অংশগ্রহণে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ জাতীয় নির্বাচন প্রয়োজন। কীভাবে এটি হতে পারে, সে ব্যাপারে সবার সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে একটা সমাধানে পৌঁছাতে চাই। তাহলে দ্বন্দ্ব-সংঘাত থাকবে না। আন্দোলনেরও কোনো প্রয়োজন হবে না।’
খালেদা জিয়া বলেন, ‘কেবল ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য একটি নির্বাচন বা সংলাপ চাইছি না। এর লক্ষ্য গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনা, জবাবদিহিমূলক সরকার প্রতিষ্ঠা করা, ভোটাধিকার ফিরিয়ে আনা, একটি স্থিতিশীল ও সমঝোতামূলক পরিবেশ সৃষ্টি করা।’
সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশে ক্ষমতায় থাকা না-থাকার মধ্যে বেহেশত ও দোজখের মতো দুস্তর ব্যবধান সৃষ্টি হয়েছে। স্বর্গচ্যুত হয়ে নরকযন্ত্রণা ভোগের ভয়ে অনেকে ক্ষমতা ছাড়তে ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়েন। তাই ক্ষমতায় টিকে থাকতে বা ক্ষমতায় যেতে মরিয়া হয়ে সব রকমের অপকৌশলের আশ্রয় নিয়ে থাকেন। তিনি বলেন, ‘এই দূষিত রাজনীতির চক্র থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে।’
সরকার ও বিরোধী দলকে মর্যাদা ও অধিকারের দিক থেকে আরও কাছাকাছি আনতে আলাপ-আলোচনার ভিত্তিতে একটি পথ উদ্ভাবন করতে হবে উল্লেখ করে খালেদা জিয়া বলেন, বিএনপি রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পেলে কাউকে অযথা হেনস্তার শিকার হতে হবে না, কারও প্রতি অবিচার হবে না। তিনি বলেন, ‘এই যে ইতিবাচক ও ভবিষ্যৎমুখী রাজনীতি ও পরিকল্পনার কথা আমরা বলছি, এগুলো কেবল কথার কথা নয়।’
বিএনপির নেত্রী ‘ভিশন ২০৩০’ নামে একটি পরিকল্পনার সারসংক্ষেপ তুলে ধরে বলেন, এর মাধ্যমে ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশ হবে উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশ। মাথাপিছু আয় দাঁড়াবে পাঁচ হাজার মার্কিন ডলার। এ জন্য বার্ষিক প্রবৃদ্ধির হার দুই অঙ্কে উন্নীত করতে সৃজনশীল ও বুদ্ধিদীপ্ত উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে।
তবে ‘ভিশন ২০৩০’ কীভাবে বাস্তবায়িত হবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি। এ বিষয়ে বিএনপির চেয়ারপারসন বলেন, শিগগিরই এটি চূড়ান্ত করে জানানো হবে। সেখানে বিস্তারিত পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন পদ্ধতির বিবরণ থাকবে।
খালেদা জিয়া বক্তব্যের শুরুতে শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক, মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, শেখ মুজিবুর রহমানসহ প্রয়াত জাতীয় নেতাদের অবদানের কথা স্মরণ করেন। তিনি মুক্তিযুদ্ধে সহযোগিতার জন্য ভারতসহ বন্ধুপ্রতিম দেশ ও জনগণকে ধন্যবাদ জানান।
খালেদা জিয়া বলেন, বিএনপি অন্য কোনো রাষ্ট্রের জন্য নিরাপত্তা সমস্যা সৃষ্টি করতে চায় না। বাংলাদেশের মাটি থেকে অপর কোনো রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী ও বিচ্ছিন্নতাবাদী তৎপরতা বিএনপি মেনে নেবে না। বিএনপিও আশা করে, অন্য কোনো রাষ্ট্র বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি সৃষ্টি করবে না। তিনি তাঁর সরকারের সময় সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে অবস্থানের কথা উল্লেখ করে বলেন, ভবিষ্যতেও সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদ দমনে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে তাঁরা একযোগে কাজ করে যাবেন।
বর্তমান সরকারের সমালোচনা করে বিএনপির চেয়ারপারসন বলেন, সন্ত্রাস-দুর্নীতি আজ ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। এখন বিদেশি হ্যাকাররা পর্যন্ত কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অর্থ লুণ্ঠনের প্রক্রিয়ায় যোগ দিয়েছে। এই অযোগ্য ও দুর্নীতিগ্রস্ত সরকারের আমলে ব্যাংক, এটিএম বুথ, এমনকি বাংলাদেশ ব্যাংকেও জনগণের অর্থ নিরাপদ নয়। তিনি বলেন, দেশের সম্মানিত নাগরিকেরা লাঞ্ছিত ও অপমানিত হচ্ছেন। প্রতিবাদ-বিক্ষোভ দূরের কথা, অন্যায়-অনাচারের বিরুদ্ধে কথা বলারও সুযোগ নেই। স্বাধীন সাংবাদিকতা, ন্যায়বিচার ও মানবাধিকার আজ পুরোপুরি ভূলুণ্ঠিত ও বিপন্ন।
খালেদা জিয়া দলের কাউন্সিলর ও ডেলিগেটদের উদ্দেশে বলেন, ‘সম্মেলন শেষে দিকনির্দেশনা নিয়ে সারা দেশে জনগণের মধ্যে ছড়িয়ে পড়বেন। তাঁদের ঐক্যবদ্ধ করবেন। তাহলেই আমরা অজেয় শক্তিতে পরিণত হব।’ দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘আপনারা জেগে উঠুন, ঐক্যবদ্ধ হোন। আপনাদের যে অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছে, তা ছিনিয়ে নিন।’
সম্মেলনের আগে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় খালেদা জিয়া বিএনপির চেয়ারপারসন ও তাঁর ছেলে তারেক রহমান সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান পুনর্নির্বাচিত হয়েছেন। বিষয়টি উল্লেখ করে খালেদা জিয়া তাঁর প্রতি অকুণ্ঠ আস্থা ও সমর্থন জ্ঞাপন করায় নেতা-কর্মীদের ধন্যবাদ জানান।
সন্ধ্যায় সম্মেলনের দ্বিতীয় অধিবেশনে কাউন্সিলররা সর্বসম্মতিক্রমে দুই শীর্ষ নেতা নির্বাচনকে অনুমোদন দেন। একই কাউন্সিলররা মহাসচিবসহ দলের স্থায়ী কমিটি ও নির্বাহী কমিটির পদগুলোতে নেতা নির্বাচনের সর্বময় ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব খালেদা জিয়াকে দেন।
দ্বিতীয় অধিবেশনে সমাপনী বক্তব্যে খালেদা জিয়া বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ হ্যাক হয়নি, চুরি হয়েছে। কারা এর সঙ্গে জড়িত, তা পত্রিকা লিখলে গুম করে ফেলা হবে। তাই তারা রাঘববোয়াল লিখছে। তিনি বলেন, ‘সোশ্যাল মিডিয়াতে অনেক কিছু বের হয়েছে। ... বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আতিউর রহমান শেখ হাসিনাকে অবহিত করেছেন। কিন্তু হাসিনা এর বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেননি।’
খালেদা জিয়া বলেন, শেখ হাসিনাকে বাদ দিয়েই আগামীতে নির্বাচন হবে। সে জন্য এখন থেকেই কাজ করতে হবে। হাসিনা মার্কা নির্বাচন নয়, নিরপেক্ষ নির্বাচন হতে হবে। হাসিনা-মার্কা নির্বাচনে বিএনপি যাবে না।
গতবারের মতো এবারও সম্মেলনে লন্ডনপ্রবাসী তারেক রহমানের একটি ধারণকৃত ভিডিও বক্তব্য বড় পর্দায় প্রচার করা হয়। বক্তব্যের বিভিন্ন পর্যায়ে নেতা-কর্মীরা তারেক রহমানের নামে স্লোগান দেন।
এরপর সম্মেলনে উপস্থিত চার বিদেশি অতিথি ব্রিটিশ পার্লামেন্টের স্বতন্ত্র সাংসদ সায়মন ডেনচুক, ওই দেশের লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) আন্তর্জাতিক-বিষয়ক স্ট্যান্ডিং কমিটির সদস্য ও সাবেক ইউরোপীয় পার্লামেন্টের সদস্য ফিল বেনিয়ন এবং যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতাসীন ডেমোক্রেটিক পার্টির নেতা বারবারা মুর ও শিকাগো সিটির কাউন্সিলর অলডারম্যান জো মুর শুভেচ্ছা জানিয়ে বক্তব্য দেন। ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ও বৈদেশিক সেলের দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতা বিজয় জলি এক ভিডিও বার্তার মাধ্যমে শুভেচ্ছা জানান।
উদ্বোধনী পর্বে বিএনপির প্রতিষ্ঠাকালীন মহাসচিব ও বিকল্পধারার সভাপতি এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী বলেন, ‘দেশে আজ গণতন্ত্র বিপন্ন, রাজনীতি স্তব্ধ। শান্তি-শৃঙ্খলা নেই। আজ শুধু এটুকুই বলব, রাজনীতি নতুন করে অভ্যুদয় হোক, গণতন্ত্র মুক্তি পাক।’
২০-দলীয় জোটের পক্ষে এলডিপির সভাপতি অলি আহমদ বলেন, সমগ্র দেশ আজ বিপদে। এত দিন শেয়ারবাজার, বেসরকারি ব্যাংক লুটপাট হয়েছে। এখন বাংলাদেশ ব্যাংক লুট হচ্ছে।
মঞ্চে ছিলেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মওদুদ আহমদ, খন্দকার মোশাররফ হোসেন, তরিকুল ইসলাম, জমির উদ্দিন সরকার, নজরুল ইসলাম খান, মাহবুবুর রহমান, আবদুল মঈন খান ও গয়েশ্বর চন্দ্র রায়। সম্মেলনে জামায়াতে ইসলামীসহ জোটের শরিক দলগুলোর শীর্ষ পর্যায়ের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
বিএনপির আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক আসাদুজ্জামান রিপন বলেন, সম্মেলনে ঢাকায় পাকিস্তানের হাইকমিশনার সুজা আলম এবং ভারত, রাশিয়া, চীন, সৌদি আরবসহ ৪২ দেশের কূটনীতিকেরা উপস্থিত ছিলেন। বিদেশি অতিথিরা মঞ্চের ডান দিকে আলাদা মঞ্চে বসেন।
সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বিএনপির দলীয় পতাকা তোলেন দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি স্বাগত বক্তব্যে ইলিয়াস আলী, চৌধুরী আলমসহ গুমের শিকার বিএনপি ও ২০-দলীয় জোটের নেতা-কর্মীদের স্মরণ করেন।
ফখরুল বলেন, গত কয়েক বছরে সরকারের দমন-পীড়ন এবং পুলিশ ও সরকারি দলের সন্ত্রাসীদের গুলিতে বিএনপির ৫০২ জন নেতা-কর্মী নিহত হয়েছেন। অপহৃত হয়েছেন ২২৩ জন নেতা-কর্মী। গুরুতর আহত হয়েছেন ৪ হাজার। জেল খেটেছেন প্রায় ৭৫ হাজার। বিরোধী দলের বিরুদ্ধে প্রায় ২৪ হাজার মামলা হয়েছে এবং এতে ৪ লাখ ৩০ হাজার জনকে আসামি করা হয়েছে। ‘মিথ্যা মামলায়’ ৫০ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
বিকেল পৌনে চারটায় ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে সম্মেলনের দ্বিতীয় অধিবেশন শুরু হয়। খালেদা জিয়ার সভাপতিত্বে রুদ্ধদ্বার এই অধিবেশনে সারা দেশ থেকে আসা প্রায় ৩ হাজার কাউন্সিলর অংশ নেন। রাতে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
গতকাল শনিবার সকালে রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন চত্বরে বিএনপির ষষ্ঠ জাতীয় সম্মেলনে খালেদা জিয়া এ ঘোষণা দেন। তিনি বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর একক নির্বাহী ক্ষমতা সংসদীয় সরকারের আবরণে একটি স্বৈরাচারী একনায়কতান্ত্রিক শাসনের জন্ম দিয়েছে। এই অবস্থার অবসানকল্পে প্রজাতন্ত্রের নির্বাহী ক্ষমতার ক্ষেত্রে ভারসাম্য আনা হবে।’
বিএনপির চেয়ারপারসন বলেন, রাষ্ট্রের এককেন্দ্রিক চরিত্র অক্ষুণ্ন রেখে বিদ্যমান সংসদীয় ব্যবস্থা সংস্কারের অংশ হিসেবে বিভিন্ন সম্প্রদায়, প্রান্তিক গোষ্ঠী ও পেশার জ্ঞানী-গুণী ও মেধাবী ব্যক্তিদের সমন্বয়ে জাতীয় সংসদে একটি উচ্চকক্ষ প্রতিষ্ঠা করা হবে। এ ছাড়া জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে জনগণের সম্মতি গ্রহণের পন্থা ‘রেফারেন্ডাম’ বা ‘গণভোট’ ব্যবস্থা সংবিধানে পুনঃপ্রবর্তন করা হবে।
বেলা পৌনে ১১টায় জাতীয় সংগীত পরিবেশন ও জাতীয় পতাকা উত্তোলনের মধ্য দিয়ে বিএনপির জাতীয় সম্মেলন উদ্বোধন করেন খালেদা জিয়া। এর আগেই ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন চত্বর আমন্ত্রিত অতিথি, কাউন্সিলর ও দলের নেতা-কর্মীদের উপস্থিতিতে কানায় কানায় ভরে যায়। একপর্যায়ে তা সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের এক পাশ, সামনের সড়কের মৎস্য ভবন থেকে শিশুপার্ক পর্যন্ত ছাড়িয়ে যায়। রমনা পার্কের ভেতরেও অনেকে অবস্থান নেন। ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনের সামনের সড়কের এক পাশে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।
খালেদা জিয়া প্রায় ১ ঘণ্টা ২০ মিনিট বক্তব্য দেন। তিনি সংলাপে বসার জন্য সরকারের প্রতি আবারও আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ‘দেশের প্রায় সবাই একটি জনপ্রতিনিধিত্বশীল, গণতান্ত্রিক সরকার চায়। এ জন্য যত দ্রুত সম্ভব সবার অংশগ্রহণে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ জাতীয় নির্বাচন প্রয়োজন। কীভাবে এটি হতে পারে, সে ব্যাপারে সবার সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে একটা সমাধানে পৌঁছাতে চাই। তাহলে দ্বন্দ্ব-সংঘাত থাকবে না। আন্দোলনেরও কোনো প্রয়োজন হবে না।’
খালেদা জিয়া বলেন, ‘কেবল ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য একটি নির্বাচন বা সংলাপ চাইছি না। এর লক্ষ্য গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনা, জবাবদিহিমূলক সরকার প্রতিষ্ঠা করা, ভোটাধিকার ফিরিয়ে আনা, একটি স্থিতিশীল ও সমঝোতামূলক পরিবেশ সৃষ্টি করা।’
সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশে ক্ষমতায় থাকা না-থাকার মধ্যে বেহেশত ও দোজখের মতো দুস্তর ব্যবধান সৃষ্টি হয়েছে। স্বর্গচ্যুত হয়ে নরকযন্ত্রণা ভোগের ভয়ে অনেকে ক্ষমতা ছাড়তে ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়েন। তাই ক্ষমতায় টিকে থাকতে বা ক্ষমতায় যেতে মরিয়া হয়ে সব রকমের অপকৌশলের আশ্রয় নিয়ে থাকেন। তিনি বলেন, ‘এই দূষিত রাজনীতির চক্র থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে।’
সরকার ও বিরোধী দলকে মর্যাদা ও অধিকারের দিক থেকে আরও কাছাকাছি আনতে আলাপ-আলোচনার ভিত্তিতে একটি পথ উদ্ভাবন করতে হবে উল্লেখ করে খালেদা জিয়া বলেন, বিএনপি রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পেলে কাউকে অযথা হেনস্তার শিকার হতে হবে না, কারও প্রতি অবিচার হবে না। তিনি বলেন, ‘এই যে ইতিবাচক ও ভবিষ্যৎমুখী রাজনীতি ও পরিকল্পনার কথা আমরা বলছি, এগুলো কেবল কথার কথা নয়।’
বিএনপির নেত্রী ‘ভিশন ২০৩০’ নামে একটি পরিকল্পনার সারসংক্ষেপ তুলে ধরে বলেন, এর মাধ্যমে ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশ হবে উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশ। মাথাপিছু আয় দাঁড়াবে পাঁচ হাজার মার্কিন ডলার। এ জন্য বার্ষিক প্রবৃদ্ধির হার দুই অঙ্কে উন্নীত করতে সৃজনশীল ও বুদ্ধিদীপ্ত উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে।
তবে ‘ভিশন ২০৩০’ কীভাবে বাস্তবায়িত হবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি। এ বিষয়ে বিএনপির চেয়ারপারসন বলেন, শিগগিরই এটি চূড়ান্ত করে জানানো হবে। সেখানে বিস্তারিত পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন পদ্ধতির বিবরণ থাকবে।
খালেদা জিয়া বক্তব্যের শুরুতে শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক, মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, শেখ মুজিবুর রহমানসহ প্রয়াত জাতীয় নেতাদের অবদানের কথা স্মরণ করেন। তিনি মুক্তিযুদ্ধে সহযোগিতার জন্য ভারতসহ বন্ধুপ্রতিম দেশ ও জনগণকে ধন্যবাদ জানান।
খালেদা জিয়া বলেন, বিএনপি অন্য কোনো রাষ্ট্রের জন্য নিরাপত্তা সমস্যা সৃষ্টি করতে চায় না। বাংলাদেশের মাটি থেকে অপর কোনো রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী ও বিচ্ছিন্নতাবাদী তৎপরতা বিএনপি মেনে নেবে না। বিএনপিও আশা করে, অন্য কোনো রাষ্ট্র বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি সৃষ্টি করবে না। তিনি তাঁর সরকারের সময় সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে অবস্থানের কথা উল্লেখ করে বলেন, ভবিষ্যতেও সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদ দমনে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে তাঁরা একযোগে কাজ করে যাবেন।
বর্তমান সরকারের সমালোচনা করে বিএনপির চেয়ারপারসন বলেন, সন্ত্রাস-দুর্নীতি আজ ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। এখন বিদেশি হ্যাকাররা পর্যন্ত কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অর্থ লুণ্ঠনের প্রক্রিয়ায় যোগ দিয়েছে। এই অযোগ্য ও দুর্নীতিগ্রস্ত সরকারের আমলে ব্যাংক, এটিএম বুথ, এমনকি বাংলাদেশ ব্যাংকেও জনগণের অর্থ নিরাপদ নয়। তিনি বলেন, দেশের সম্মানিত নাগরিকেরা লাঞ্ছিত ও অপমানিত হচ্ছেন। প্রতিবাদ-বিক্ষোভ দূরের কথা, অন্যায়-অনাচারের বিরুদ্ধে কথা বলারও সুযোগ নেই। স্বাধীন সাংবাদিকতা, ন্যায়বিচার ও মানবাধিকার আজ পুরোপুরি ভূলুণ্ঠিত ও বিপন্ন।
খালেদা জিয়া দলের কাউন্সিলর ও ডেলিগেটদের উদ্দেশে বলেন, ‘সম্মেলন শেষে দিকনির্দেশনা নিয়ে সারা দেশে জনগণের মধ্যে ছড়িয়ে পড়বেন। তাঁদের ঐক্যবদ্ধ করবেন। তাহলেই আমরা অজেয় শক্তিতে পরিণত হব।’ দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘আপনারা জেগে উঠুন, ঐক্যবদ্ধ হোন। আপনাদের যে অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছে, তা ছিনিয়ে নিন।’
সম্মেলনের আগে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় খালেদা জিয়া বিএনপির চেয়ারপারসন ও তাঁর ছেলে তারেক রহমান সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান পুনর্নির্বাচিত হয়েছেন। বিষয়টি উল্লেখ করে খালেদা জিয়া তাঁর প্রতি অকুণ্ঠ আস্থা ও সমর্থন জ্ঞাপন করায় নেতা-কর্মীদের ধন্যবাদ জানান।
সন্ধ্যায় সম্মেলনের দ্বিতীয় অধিবেশনে কাউন্সিলররা সর্বসম্মতিক্রমে দুই শীর্ষ নেতা নির্বাচনকে অনুমোদন দেন। একই কাউন্সিলররা মহাসচিবসহ দলের স্থায়ী কমিটি ও নির্বাহী কমিটির পদগুলোতে নেতা নির্বাচনের সর্বময় ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব খালেদা জিয়াকে দেন।
দ্বিতীয় অধিবেশনে সমাপনী বক্তব্যে খালেদা জিয়া বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ হ্যাক হয়নি, চুরি হয়েছে। কারা এর সঙ্গে জড়িত, তা পত্রিকা লিখলে গুম করে ফেলা হবে। তাই তারা রাঘববোয়াল লিখছে। তিনি বলেন, ‘সোশ্যাল মিডিয়াতে অনেক কিছু বের হয়েছে। ... বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আতিউর রহমান শেখ হাসিনাকে অবহিত করেছেন। কিন্তু হাসিনা এর বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেননি।’
খালেদা জিয়া বলেন, শেখ হাসিনাকে বাদ দিয়েই আগামীতে নির্বাচন হবে। সে জন্য এখন থেকেই কাজ করতে হবে। হাসিনা মার্কা নির্বাচন নয়, নিরপেক্ষ নির্বাচন হতে হবে। হাসিনা-মার্কা নির্বাচনে বিএনপি যাবে না।
গতবারের মতো এবারও সম্মেলনে লন্ডনপ্রবাসী তারেক রহমানের একটি ধারণকৃত ভিডিও বক্তব্য বড় পর্দায় প্রচার করা হয়। বক্তব্যের বিভিন্ন পর্যায়ে নেতা-কর্মীরা তারেক রহমানের নামে স্লোগান দেন।
এরপর সম্মেলনে উপস্থিত চার বিদেশি অতিথি ব্রিটিশ পার্লামেন্টের স্বতন্ত্র সাংসদ সায়মন ডেনচুক, ওই দেশের লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) আন্তর্জাতিক-বিষয়ক স্ট্যান্ডিং কমিটির সদস্য ও সাবেক ইউরোপীয় পার্লামেন্টের সদস্য ফিল বেনিয়ন এবং যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতাসীন ডেমোক্রেটিক পার্টির নেতা বারবারা মুর ও শিকাগো সিটির কাউন্সিলর অলডারম্যান জো মুর শুভেচ্ছা জানিয়ে বক্তব্য দেন। ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ও বৈদেশিক সেলের দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতা বিজয় জলি এক ভিডিও বার্তার মাধ্যমে শুভেচ্ছা জানান।
উদ্বোধনী পর্বে বিএনপির প্রতিষ্ঠাকালীন মহাসচিব ও বিকল্পধারার সভাপতি এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী বলেন, ‘দেশে আজ গণতন্ত্র বিপন্ন, রাজনীতি স্তব্ধ। শান্তি-শৃঙ্খলা নেই। আজ শুধু এটুকুই বলব, রাজনীতি নতুন করে অভ্যুদয় হোক, গণতন্ত্র মুক্তি পাক।’
২০-দলীয় জোটের পক্ষে এলডিপির সভাপতি অলি আহমদ বলেন, সমগ্র দেশ আজ বিপদে। এত দিন শেয়ারবাজার, বেসরকারি ব্যাংক লুটপাট হয়েছে। এখন বাংলাদেশ ব্যাংক লুট হচ্ছে।
মঞ্চে ছিলেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মওদুদ আহমদ, খন্দকার মোশাররফ হোসেন, তরিকুল ইসলাম, জমির উদ্দিন সরকার, নজরুল ইসলাম খান, মাহবুবুর রহমান, আবদুল মঈন খান ও গয়েশ্বর চন্দ্র রায়। সম্মেলনে জামায়াতে ইসলামীসহ জোটের শরিক দলগুলোর শীর্ষ পর্যায়ের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
বিএনপির আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক আসাদুজ্জামান রিপন বলেন, সম্মেলনে ঢাকায় পাকিস্তানের হাইকমিশনার সুজা আলম এবং ভারত, রাশিয়া, চীন, সৌদি আরবসহ ৪২ দেশের কূটনীতিকেরা উপস্থিত ছিলেন। বিদেশি অতিথিরা মঞ্চের ডান দিকে আলাদা মঞ্চে বসেন।
সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বিএনপির দলীয় পতাকা তোলেন দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি স্বাগত বক্তব্যে ইলিয়াস আলী, চৌধুরী আলমসহ গুমের শিকার বিএনপি ও ২০-দলীয় জোটের নেতা-কর্মীদের স্মরণ করেন।
ফখরুল বলেন, গত কয়েক বছরে সরকারের দমন-পীড়ন এবং পুলিশ ও সরকারি দলের সন্ত্রাসীদের গুলিতে বিএনপির ৫০২ জন নেতা-কর্মী নিহত হয়েছেন। অপহৃত হয়েছেন ২২৩ জন নেতা-কর্মী। গুরুতর আহত হয়েছেন ৪ হাজার। জেল খেটেছেন প্রায় ৭৫ হাজার। বিরোধী দলের বিরুদ্ধে প্রায় ২৪ হাজার মামলা হয়েছে এবং এতে ৪ লাখ ৩০ হাজার জনকে আসামি করা হয়েছে। ‘মিথ্যা মামলায়’ ৫০ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
বিকেল পৌনে চারটায় ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে সম্মেলনের দ্বিতীয় অধিবেশন শুরু হয়। খালেদা জিয়ার সভাপতিত্বে রুদ্ধদ্বার এই অধিবেশনে সারা দেশ থেকে আসা প্রায় ৩ হাজার কাউন্সিলর অংশ নেন। রাতে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।

No comments:
Post a Comment