সব
ধরনের জ্বালানি তেলের দাম ‘যৌক্তিক’ করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।
‘যৌক্তিক’ করা মানে দাম কমানো। তবে আন্তর্জাতিক বাজারদর অনুযায়ী দাম
কমানো হচ্ছে না। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) মুনাফা ঠিক
রেখে দাম নির্ধারণ করা হবে। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ এবং অর্থ
মন্ত্রণালয়ের নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, সরকারি এই উদ্যোগের অংশ
হিসেবে ইতিমধ্যে বিদ্যুৎকেন্দ্র ও শিল্প কারখানায় ব্যবহৃত ফার্নেস তেলের
দাম কমানোর সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়েছে। এ ব্যাপারে শিগগিরই সরকারি আদেশ
জারি করা হতে পারে। অন্যান্য জ্বালানি তেলের দাম কবে থেকে বা কতটা কমবে, সে
বিষয়ে সিদ্ধান্ত হতে পারে আগামী মাসে। গতকাল সোমবার অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার
সাপ্তাহিক নিয়মিত বৈঠকে বিষয়টি নিয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনা হয়েছে বলে
সূত্রগুলো জানায়। এ সম্পর্কে জানতে চাইলে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ
প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, ফার্নেস তেলের দাম
প্রতি লিটারে ১৫-১৬ টাকা পর্যন্ত কমতে পারে। এ বিষয়ে কয়েক দিনের মধ্যেই
পরিপত্র জারি করা হবে। অন্যান্য জ্বালানি তেলের বিষয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন,
সরকার সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম পুনর্নির্ধারণের উদ্যোগ নিয়েছে। এসব
তেলের দাম কতটা কমানো হবে এবং তা কবে থেকে কার্যকর হবে, সে বিষয়ে
নীতিনির্ধারক মহলে কাজ চলছে। এ বিষয়টি চূড়ান্ত হতে মাস খানেক লাগতে পারে।
ফার্নেস তেলের দামের সঙ্গে সাধারণ গ্রাহকদের সরাসরি লেনদেনের সম্পর্ক নেই।
তবে বিদ্যুৎ উৎপাদনে এই তেল ব্যবহৃত হওয়ায় এর দামের সঙ্গে বিদ্যুতের দাম
কম-বেশি হওয়ার বিষয়টি জড়িত। তেলচালিত ভাড়াভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্যই
দেশে বিদ্যুতের দাম বাড়াতে হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে এই তেলের দাম কমেছে
প্রায় দেড় বছর ধরে। আন্তর্জাতিক বাজারে বর্তমান দাম অনুযায়ী প্রতি লিটার
ফার্নেস তেলের দাম এখন ৩০ টাকারও কম। কিন্তু সরকারের নির্ধারিত দাম হচ্ছে
৬০ টাকা। ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যয় বেশি পড়ে। সরকার ফার্নেস তেলের দাম না
কমিয়ে এই বাবদ কিছু মুনাফা করছে। অন্যদিকে বিদ্যুতের দাম বেশি পড়ায়
সেখানে ভর্তুকি দিচ্ছে। ফার্নেস তেলের দাম আন্তর্জাতিক বাজারদরের সমান্তরাল
করা না হলে ‘এক হাতে মুনাফা, অন্য হাতে ভর্তুকি’ দেওয়ার এই অহেতুক
কর্মকাণ্ড শেষ হবে না বলে জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের অভিমত। এ বিষয়ে সাবেক
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার বিদ্যুৎ ও জ্বালানি
মন্ত্রণালয়-সংক্রান্ত বিশেষ সহকারী ম তামিম বলেন, ফার্নেস তেলের দাম
আন্তর্জাতিক বাজারদরের সমান্তরাল রাখাই যৌক্তিক। তাতে বারবার বিদ্যুতের
দাম বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তাও থাকবে না। অর্থ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের
সূত্রগুলো বলছে, সরকার বেশি চিন্তিত ডিজেলের দাম নিয়ে। দেশে সিংহভাগ ডিজেল
ব্যবহৃত হয় পরিবহন খাতে। সরকারের বিশ্বাস, ডিজেলের দাম কমানো হলেও
পরিবহনের ভাড়া কমানো হবে না। ফলে সাধারণ মানুষ এই দাম কমানোর কোনো
সুবিধা পাবে না। তারপরও ডিজেলের দাম কিছুটা হলেও কমানো হবে। আর
পেট্রল-অকটেনের দামও কমানো হবে। তবে এসব জ্বালানিতে প্রতি লিটারে ২০ টাকার
মতো মুনাফা রাখা হতে পারে। জ্বালানি তেলের দাম যৌক্তিক করার এই
প্রক্রিয়া শুরু করা হয়েছে গত জানুয়ারি মাসের দ্বিতীয়ার্ধে। তখন অর্থ
মন্ত্রণালয়ের চাহিদা অনুযায়ী বিপিসি একটি পর্যালোচনা প্রতিবেদন জমা দেয়।
তাতে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমার পটভূমিতে বিপিসি সর্বশেষ আর্থিক অবস্থা
কী দাঁড়িয়েছে, সর্বশেষ কত দামে বিপিসি তেল আমদানি করেছে প্রভৃতি বিষয়
উল্লেখ করা হয়। ওই প্রতিবেদনে কোন ধরনের জ্বালানির দাম কত নির্ধারণ করা
যায়, তা উল্লেখ করা হয়নি। তবে দেশে কীভাবে জ্বালানি তেলের দাম যৌক্তিক করা
যায়, সে বিষয়ে আলোকপাত করা হয়েছে। বিপিসির সূত্র জানায়, প্রায় দেড় বছরে
বিপিসি যে মুনাফা করেছে, তা দিয়ে তাদের সব ঋণ পরিশোধ করার পরও প্রায় তিন
হাজার কোটি টাকা উদ্বৃত্ত আছে। দেশে সর্বশেষ জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো
হয় ২০১৩ সালের ৪ জানুয়ারি। তখন আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি ব্যারেল
অপরিশোধিত তেলের দাম ছিল ১২০ মার্কিন ডলার। দেশে তখন দাম বাড়িয়ে প্রতি
লিটার অকটেন ৯৯ টাকা, পেট্রল ৯৬, ডিজেল ও কেরোসিন ৬৮ এবং ফার্নেস তেল ৬০
টাকা করা হয়। ২০১৪ সালের জুন থেকে বিশ্ববাজারে তেলের দাম কমতে শুরু করে।
একপর্যায়ে তা প্রতি ব্যারেল ২৫ ডলারে নামে। এই সময়ের মধ্যে বাংলাদেশসহ হাতে
গোনা কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া পৃথিবীর সব দেশে জ্বালানির দাম কমানো হয়েছে।
বর্তমানে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম কিছুটা বেড়ে প্রতি ব্যারেল ৪০
ডলারের কাছাকাছি উঠেছে। তবে দেশি-বিদেশি জ্বালানি বিশেষজ্ঞ, গবেষক ও
অর্থনীতিবিদদের পূর্বাভাস, দাম কমার প্রবণতা উল্টে গিয়ে দু-তিন বছরে তেলের
দাম ৫০ ডলারের বেশি ওঠার সম্ভাবনা নেই।
জ্বালানি তেল
লিটারপ্রতি বিপিসির লাভ
অকটেন ৪৫
পেট্রল ৪০
ডিজেল ২৮
ফার্নেস ৩০
জ্বালানি তেল
লিটারপ্রতি বিপিসির লাভ
অকটেন ৪৫
পেট্রল ৪০
ডিজেল ২৮
ফার্নেস ৩০

No comments:
Post a Comment