Tuesday, March 15, 2016

অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে দ্বন্দ্বের পরিণতি না আরও কিছু

এ পতন আকস্মিক। তবে অনুনেময় নয়। অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরেই শীতল সম্পর্ক বিরাজ করছিল বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আতিউর রহমানের। সর্বশেষ কয়েকমাস অনেকটা মুখ দেখাদেখিও বন্ধ ছিল তাদের। দুজনই ছিলেন ক্ষমতার শীর্ষ পর্যায়ের ঘনিষ্ঠ। দেশের অর্থনীতির নীতিনির্ধারণে প্রধান ভূমিকা ছিল তাদের। শেষ পর্যন্ত রাজকোষ কেলেঙ্কারিতে পদত্যাগে বাধ্য হলেন আতিউর রহমান।
প্রায় সাত বছরের শাসনামলে গভর্নর আতিউর রহমান নানা সংস্কার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। নিজেকে তিনি পরিচয় দিতেন গরিবের ব্যাংকার বলে। তার এসব উদ্যোগের অনেকগুলোই কোন কাজে লাগেনি। তবে আতিউর রহমানের সবচেয়ে বড় সমালোচনা তার সময়ে দেশের অর্থনীতিতে ঘটে যাওয়া নানা কেলেঙ্কারি। অর্থনৈতিক কেলেঙ্কারি সামাল দেয়ার ক্ষেত্রে তিনি বড় ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছিলেন। বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি ব্যাংকে যেসব কেলেঙ্কারি ঘটে তা নিয়ন্ত্রণে তিনি শতভাগ ব্যর্থতার পরিচয় দেন। বিসমিল্লাহ গ্রুপের ঋণ কেলেঙ্কারি, হলমার্ক কেলেঙ্কারি প্রতিরোধ বা পরবর্তী সময়ে ব্যবস্থা নেয়ার ক্ষেত্রে ব্যর্থ ছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। ডেসটিনি এবং শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারির ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। তবে এসব ক্ষেত্রে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের দায় আরও বেশি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে ৮০০ কোটি টাকা চুরি হওয়ার ঘটনা দীর্ঘদিন গোপন রেখে সর্বশেষ তোপের মুখে পড়েন আতিউর রহমান। গত দু-তিন ধরেই এ নিয়ে সরব ছিলেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। মন্ত্রিসভার বৈঠকেও তিনি আতিউরের বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রীর কাছে নালিশ করেন। সোমবার নানা ধরনের নাটকীয় ঘটনা ঘটে। সচিবালয়ে আতিউর রহমানের জন্য অপেক্ষা করেন অর্থমন্ত্রী। গভর্নর সচিবালয়ে যাননি। রাতে অবশ্য বাসায় গিয়ে অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করেন আতিউর রহমান।
মঙ্গলবার সকালে নিজ বাসায় সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় আবেগাক্রান্ত হয়ে পড়েন আতিউর রহমান। এসময় দেশবাসীর কাছে ক্ষমাও চান তিনি। আতিউর রহমান বলেন, সোমবার ভারত থেকে দেশে ফেরার পর রাতেই  অর্থমন্ত্রীর বাসায় গিয়ে তার সঙ্গে দেখা করেছি। তিনি বলেছেন, আমি চলে গেলে বাংলাদেশ ব্যাংক ভালো চলবে। কিন্তু আমি আমার বিবেক দ্বারা চালিত হই। মনে করি, প্রধানমন্ত্রী আমাকে নিয়োগ দিয়েছেন, তিনি না বললে আমার পদত্যাগ করা উচিত নয়। তিনি বলেন, আমি অপেক্ষা করছি, প্রধানমন্ত্রী কি বলেন। আমি পদত্যাগ করলে যদি বাংলাদেশ ব্যাংকের ভালো হয়, দেশের ভাল হয়, তাহলে পদত্যাগ করতে আমার দ্বিধা নাই। আমি পদত্যাগপত্র লিখে বসে আছি। প্রধানমন্ত্রী বলার সঙ্গে সঙ্গে আমি পদত্যাগ করবো। অর্থমন্ত্রীকে না জানানোর যুক্তি তুলে ধরে গভর্নর বলেন, অর্থমন্ত্রীকে বিষয়টি জানাইনি, কারণ আমি চেষ্টা করছিলাম- টাকাটা ফেরত আনার জন্য। অর্থমন্ত্রীকে জানালে যে টাকাটা ফেরত এসেছে সেটাও ফেরত পেতাম না। কথা বলার একপর্যায়ে আবেগতাড়িত হয়ে পড়েন আতিউর রহমান। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, যা কিছু করেছি সবই দেশের স্বার্থে করেছি। ২৮ মিলিয়ন ডলার আমার সন্তানের মতো। প্রতিটি ডলারই তিল তিল করে সঞ্চয় করেছি। একটি ডলারও যাতে নষ্ট না হয় সে চেষ্টা করেছি। কিন্তু এটি ছিল একটা সাইবার অ্যাটাক। কোথা থেকে হ্যাক হয়েছে সে বিষয়ে আমরা কেউই কিছুই জানি না। তিনি বলেন, এ ঘটনা জানার পর আমরা কিছুটা গোপনীয়তা অবলম্বন করেছি। আমাদের ইন্টিলিজেন্সকে সঙ্গে নিয়ে কাজ করেছি। র‌্যাবকেও নিয়ে তদন্ত করেছি। তাদের বলেছি- আমাদের ব্যাংকের যদি কেউ জড়িত থাকে তাহলে যে কোন সময় গ্রেপ্তার করতে পারেন। পরে অর্থমন্ত্রীকে চিঠি দিয়ে বিষয়টি জানিয়েছি। পুরো টাকাই পাওয়ার আশ্বাস দিয়ে গভর্নর বলেন, টাকা চুরির পর ফিলিপিনের গভর্নরের সঙ্গে কথা বলেছি। চুরি হওয়ার টাকার একটি অংশ ফেরত পেয়েছি। আজ সকালে ফিলিপিন থেকে সংবাদ এসেছে- বাকি টাকাও ফেরত পাওয়া যাবে। ভারত সফরে যাওয়ার বিষয়ে গভর্নর বলেন, প্রধানমন্ত্রী ও অর্থমন্ত্রীকে জানিয়েই আমি ভারত সফরে গিয়েছিলাম। এবং সেখানে চুরি যাওয়া অর্থ কিভাবে ফেরত পাওয়া যাবে তা নিয়ে আলোচনা করেছি। পরে সকালেই প্রধানমন্ত্রী বরাবর পদত্যাগপত্র জমা দেন আতিউর রহমান। শেষ পর্যন্ত গায়ে কাদা মেখেই পদত্যাগ করলেন আতিউর।

No comments:

Post a Comment