Tuesday, March 29, 2016

বছরে দুবার মায়ের দেখা

নানা–নানির বাড়ির উঠানে বসে স্কুলের
বাড়ির কাজ করছে চায়ানিত।
আট বছরের শিশু চায়ানিত। স্কুলে যাওয়ার সময় চুল বেঁধে দেন নানি। খাইয়ে দেন নানি। ঘুম পাড়ান তিনি। মা থাকেন এই গ্রাম থেকে বহু দূরে, রাজধানী ব্যাংককে। ভালো কাজের আশায় মা ওকে গ্রামে রেখে শহরে গেছেন। ভাগ্য সহায় হলে এ বছর বার দুয়েক মায়ের দেখা পাবে সে।
শুধু চায়ানিতই নয়, থাইল্যান্ডের প্রত্যন্ত গ্রামগুলোতে এমন আরও অনেক শিশু রয়েছে, যাদের বাবা-মা রুজি-রোজগারের আশায় গ্রাম ছেড়ে দূরের শহর, বিশেষ করে ব্যাংককে গিয়ে জীবিকার সন্ধান করছেন। এমন শিশুর সংখ্যা প্রায় ৩০ লাখ।
এসব পরিবারের শিশুদের লালন-পালনের দায়িত্ব পড়ে নানা-নানি বা দাদা-দাদির কাঁধে। দেশটিতে অভ্যন্তরীণ ব্যাপক অভিবাসনের কারণে চায়ানিতের মতো শিশুরা বাবা-মায়ে
থাইল্যান্ডে নিযুক্ত ইউনিসেফের প্রতিনিধি টমাস ডেভিন বলেন, এটি দারিদ্র্যের ফাঁদ। এসব অভিবাসী তাদের শিশুদের জীবন ধ্বংস করে...এখানে গরিবেরা আরও গরিব হচ্ছে...এই চক্র একই বৃত্তে ঘুরপাক খাচ্ছে।
চায়ানিতের পাঁচ বছরের ভাই কিতিপপকে
স্কুলে পাঠাতে তৈরি করছেন নানি।
র স্নেহ-মমতা ছাড়াই বেড়ে উঠছে। সমাজ বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, এটি সামাজিক সংকটে রূপ নিতে পারে। হাস্যোজ্জ্বল চায়ানিত চুলে ঝুঁটি বাঁধতে বাঁধতে বলে, গ্রামের জীবনে তার ভালো লাগে। থাইল্যান্ডের ইসান অঞ্চলে গ্রামটি অবস্থিত। কিন্তু যখনই তার পরিবারের কথা উঠল, হাসিটি আপনিতেই মিইয়ে গেল। বলে, ‘আমার নানা-নানির সঙ্গে থাকতে ভালো লাগে। কিন্তু মায়ের কথা খুব মনে পড়ে। আমি তাঁকে দেখতে যেতে পারি না। আর মা শুধু ছয় মাসে একবার আসতে পারে।’ ধানের জন্য বিখ্যাত এ অঞ্চলের অর্থনৈতিক বাস্তবতা হলো, এখানে কাজ করা ঝুঁকির আর মজুরিও খুব কম। এর সঙ্গে চলমান খরা ইসানের জীবনযাত্রাকে কঠিন করে তুলেছে। তাই দরিদ্র ও ঘনবসতিপূর্ণ ইসান অঞ্চলের লোকজন যুগ যুগ ধরে অভিবাসনের মধ্য দিয়ে পরিবারকে ভেঙে যেতে দেখে আসছে। বানদাও গ্রামে এখন কর্মজীবী কোনো মানুষ নেই বললেই চলে। থাকেন শুধু বয়স্করা। বেশির ভাগই চলে গেছেন ব্যাংককে। যেখানে একজন ট্যাক্সিচালক একজন কৃষকের মজুরির তুলনায় কয়েকগুণ বেশি আয় করেন। চায়ানিতের মা ব্যাংককে একটি অফিসে কাজ করেন।
বাড়ির উঠানে নানির সঙ্গে চায়ানিত।
আর প্রতি মাসে বাড়িতে প্রায় তিন থেকে চার হাজার বাথ (৮৫-১১০ ডলার) পাঠাতে পারেন। এক জরিপে দেখা গেছে, এই অঞ্চলের ১৮ বছরের নিচের বয়সী শিশু-কিশোরদের ৩০ শতাংশই অভিবাসী কর্মজীবীদের সন্তান। এসব কর্মজীবীর বেশির ভাগই কয়েক বছর টানা বাড়িতে আসেন না। এরপর হয়তো সরকারি কোনো এক বড় ছুটিতে এসে কিছুদিন থেকে যান।মাহিদোল ইউনিভার্সিটি ইনস্টিটিউট ফর পপুলেশন অ্যান্ড সোশ্যাল রিসার্চের অধ্যাপক আরি জ্যামপাকলে বিষয়টিকে বিশ্লেষণ করতে গিয়ে বলেন, দলগতভাবে স্থানান্তর হওয়াটা থাই সমাজের ‘গা-সওয়া’ হয়ে গেছে। এর মধ্যে যে ভবিষ্যতের জন্য এক বিশাল ঝুঁকি রয়েছে, তা তারা অনুধাবন করতে পারে না। গবেষণায় দেখা গেছে, মা-বাবাকে ছাড়া বড় হয়ে ওঠা এসব শিশুর সঠিক যত্ন হয় না। এমনকি তাদের বিকাশের ক্ষেত্রে ও আচরণগত বিভিন্ন সমস্যা দেখা দেয়। চায়ানিতের ৭০ বছরের নানি চানপেন উথাচন বলেন, ৮০ শতাংশ নয়, প্রায় ৯০ শতাংশ পরিবারের নানা-নানি বা দাদা-দাদি শিশুদের লালন পালন করছেন।
নানা প্রাজাকের কোলে কিতিপপ।
এখানে কোনো কাজ নেই। তাই আমার সব সন্তান কাজের জন্য ব্যাংকক গেছে। তিনি ও তাঁর স্বামী প্রাজাক এখন চায়ানিত ও তার পাঁচ বছরের ভাইকে দেখাশোনা করেন। ভালোবাসার অভাব না থাকলেও চানপেন বলেন, ‘নিজের সন্তানদের যখন বড় করেছি, তখন শক্তি-সামর্থ্য ছিল, কিন্তু এখন আর তা না। যখন নাতি-নাতনিরা অসুস্থ হয়ে পড়ে সারা রাত ওদের পাশে জেগে থাকাটা আমার জন্য কঠিন হয়ে পড়ে।’ স্থানীয় শিক্ষকেরা বলেন, মা-বাবার আদরের অভাবে বড় হয়ে ওঠা গ্রামের এসব শিশু পাঠে তেমন মনোযোগী হয় না। এতে শিক্ষাক্ষেত্রে তারা তেমন ভালো করে না। শহরের সমবয়সী শিক্ষার্থীদের তুলনায় তারা অনেক পিছিয়ে। কিছু শিক্ষার্থীর বাজে ফলাফলের কারণে স্কুল বন্ধ করে দিতে হয়েছে।
চায়ানিত এখন আছে ইসান অঞ্চলের উবন রাতচানথানি প্রদেশের বানদাও গ্রামে।

No comments:

Post a Comment