![]() |
| সুন্দরবনে সাড়ে তিন লাখ লিটার তেল ছড়িয়ে পড়ার এক বছর তিন মাস পরেও তেলের ক্ষত রয়ে গেছে। গত ৬ জানুয়ারি জয়মণিরঘোল এলাকা থেকে ছবিটি তুলেছেন গবেষক আবদুল্লাহ হারুন চৌধুরী |
দূষণ
কমলেও বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনে ফার্নেস তেলের ক্ষত এখনো শুকায়নি। প্রায় ১৫
মাস আগে ছড়িয়ে পড়া তেল শ্যালা নদীর পানি, মাটি ও প্রাণের বেশ ক্ষতিই করে
গেছে। বনের ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় উদ্ভিদ থেকে শুরু করে মাছ, সাপ, শামুক ও
কাঁকড়ার সংখ্যা এখনো কম পাওয়া যাচ্ছে। এতে বনের সব স্তরের প্রাণীর খাদ্যের
জোগানে ঘাটতি দেখা দিয়েছে।
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক আবদুল্লাহ হারুন চৌধুরীর নেতৃত্বে একদল গবেষকের বছরব্যাপী করা একটি গবেষণায় এ তথ্য ও পর্যবেক্ষণ উঠে এসেছে। এতে বলা হয়েছে, দৃশ্যত সেখানে তেল দেখা না গেলেও তা কাদার স্তরে স্তরে জমে আছে, যা বিশ্বের সর্ববৃহৎ এই ম্যানগ্রোভ বনকে মারাত্মক ক্ষতি করছে। এ গবেষণা বলছে, ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় তেলের পরিমাণ এখনো স্বাভাবিকের চেয়ে ২০ গুণ বেশি।
২০১৪ সালের ৯ ডিসেম্বর সুন্দরবনের চাঁদপাই রেঞ্জের কাছে শ্যালা নদীতে তেলের ট্যাংকার সাড়ে তিন লাখ লিটার তেল ছড়িয়ে পড়ে। সে সময় জাতিসংঘ এবং পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের যৌথ সমীক্ষায় সেখানকার জলজ জীববৈচিত্র্যের দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির আশঙ্কা করা হয়েছিল। কিন্তু বনের ভেতর দিয়ে জাহাজ চলাচল এখনো বন্ধ হয়নি।
জানতে চাইলে বন্য প্রাণী বিশেষজ্ঞ রেজা খান মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, ‘সুন্দরবনের ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা থেকে যে পরিমাণ তেল কমেছে এবং প্রাণিকণা ও উদ্ভিদকণা যেভাবে বেড়েছে, তা আমাদের আশাবাদী করে। এটা প্রমাণ করে যে সুন্দরবনের প্রাকৃতিক শক্তি কতটা তীব্র। তবে ২০০৭ সালে ঘূর্ণিঝড় সিডর সুন্দরবনে আঘাত হানার কয়েক মাসের মাথায় একটি বর্ষা পাওয়ার পরই সবুজ হয়ে উঠেছিল। ক্ষতি পুষিয়ে উঠেছিল। কিন্তু তেল ছড়িয়ে পড়ার এক বছর পরও বনের প্রতিবেশব্যবস্থায় তেল ও এর প্রভাব রয়ে গেছে।’
অধ্যাপক আবদুল্লাহ হারুন চৌধুরীর নেতৃত্বে ‘সুন্দরবনে তেল ছড়িয়ে পড়ার পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন ও পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদন-২০১৬’ শীর্ষক গবেষণাটি দুই পর্বে হয়েছে। প্রথম পর্ব ছিল ২০১৪ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। দ্বিতীয় পর্ব ২০১৫ সালের মার্চ থেকে ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। তেল ছড়ায়নি এবং তেল ছড়িয়েছে—এমন এলাকার তুলনামূলক অবস্থার পর্যবেক্ষণ এখানে উঠে এসেছে। এ গবেষণায় আরও যুক্ত ছিলেন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ইফতেখার ইসলাম ও সামুদ্রিক প্রাণবৈচিত্র্য বিশেষজ্ঞ জি এম জগলুল ইসলাম।
গবেষণায় দেখা গেছে, তেল ছড়ায়নি এমন স্থানে প্রতি লিটার পানিতে দ্রবীভূত তেলের পরিমাণ প্রায় ৯ মিলিগ্রাম। আর ক্ষতিগ্রস্ত ৩০০ বর্গকিলোমিটার এলাকার তিনটি স্থানে প্রতি লিটার পানিতে দ্রবীভূত তেল রয়েছে ৪৩ মিলিগ্রাম। দুর্ঘটনার পরপরই এর পরিমাণ ছিল প্রায় ১ গ্রাম।
দুই ইঞ্চি গভীর থেকে সংগৃহীত মাটি পরীক্ষা করে দেখা গেছে, তেল ছড়ায়নি এমন এলাকায় প্রতি কেজি মাটিতে তেল পাওয়া গেছে সাড়ে পাঁচ মিলিগ্রাম। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় এখনো প্রতি কেজি মাটিতে ১২৩ মিলিগ্রাম তেল রয়ে গেছে। গত বছর যা ছিল ১ গ্রামেরও বেশি। তেলের পরিমাণ কমলেও তা এখনো স্বাভাবিকের চেয়ে ২০ গুণ বেশি।
তেল কমার বিষয়ে আবদুল্লাহ হারুন চৌধুরীর ব্যাখ্যা, ছড়িয়ে পড়া সাড়ে তিন লাখ লিটার তেলের মধ্যে সরকার এক লাখ লিটার বন থেকে অপসারণ করেছিল। বাকিটা বনের পানি, মাটি ও গাছে রয়ে যায়। দুর্ঘটনার পর বন বিভাগ ও সরকারি বিভিন্ন সংস্থা স্থানীয় লোকজনের মাধ্যমে পাড়া দিয়ে কিছু তেল সুন্দরবনের মাটির নিচে চাপা দিয়েছিল। এই তেল বনের প্রতিবেশব্যবস্থার মধ্যে ঢুকে পড়ে, যা সেখানকার জীববৈচিত্র্যের জন্য বিষাক্ত উপাদান হিসেবে রয়ে গেছে। তবে আশার কথা, গত জুন থেকে সুন্দরবনে বৃষ্টি ও জোয়ার-ভাটায় সেই তেলের পরিমাণ কমেছে।
সুন্দরবনে সাধারণত প্রতি লিটার পানিতে খাদ্যচক্রের প্রাথমিক উপাদান উদ্ভিদকণা থাকে ৩২৬টি। গবেষণায় দেখা গেছে, ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় গত ফেব্রুয়ারিতে এই উদ্ভিদকণা ছিল ১০৩টি। আর দুর্ঘটনার পর পাওয়া গিয়েছিল ৩২টি। প্রাণিকণা থাকার কথা ৫৩টি, ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় বর্তমানে আছে ২২টি, দুর্ঘটনার পর পর যা ছিল ৭টি। পানিতে জৈব উপাদানের মাত্রা কেমন, তা নির্ধারণের জন্য সিওডি পরীক্ষা করা হয়। এতে দেখা গেছে, প্রতি লিটার পানিতে সিওডি ৬৮ মিলিগ্রাম। আর ফেব্রুয়ারিতে পাওয়া গেছে ১৫৩ মিলিগ্রাম।
গবেষক দল তেল ছড়িয়ে পড়া এলাকা জয়মণি, হারবাড়িয়া ও করমজলে এক বছর পরেও কোনো লোনা পানির পদ্মফুল দেখতে পায়নি। সুন্দরবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই ফুলকে ওই এলাকায় আগে প্রায়ই দেখা যেত। বনের শ্বাসমূলে জড়িয়ে থাকা একধরনের লাল ও বাদামি শেওলা দেখা যায়। কিন্তু ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় ওই দুই প্রজাতির শেওলা দেখা যাচ্ছে না। শেওলা দুটি সুন্দরবনের মাছের অন্যতম খাবার। দূষণ নেই এমন এলাকায় ২৭ থেকে ৩৩ প্রজাতির মাছ পাওয়া যায়। কিন্তু ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় দেখা গেছে ১৫ থেকে ২৩টি।
ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় কুমিরের বাচ্চা দেওয়ার স্থানগুলোতে গবেষণাকালে কোনো কুমির দেখতে পাওয়া যায়নি। দূষণ হয়নি এমন এলাকায় ৮ থেকে ১৪ প্রজাতির শামুক দেখা যায়। কিন্তু ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় মাত্র ৪ প্রজাতির শামুক দেখা গেছে। এ ছাড়া সাপ, কাঁকড়াসহ বিভিন্ন প্রাণী পর্যবেক্ষণ করে তা আগের চেয়ে প্রায় অর্ধেকে নেমে আসতে দেখা গেছে।
এ বিষয়ে আবদুল্লাহ হারুন চৌধুরী বলেন, সুন্দরবনের প্রতিটি প্রাণী একে অপরের ওপর নির্ভরশীল। উদ্ভিদকণা সুন্দরবনের প্রাথমিক প্রাণ, আর বাঘ সর্বোচ্চ প্রাণী। কোনো একটি স্তরের প্রাণীর সংখ্যা কমে গেলে তা অন্য স্তরের টিকে থাকার জন্য হুমকি হিসেবে দেখা দেবে। তেল ছড়িয়ে পড়ার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব সম্পর্কে আরও বিস্তারিত গবেষণা হওয়া উচিত। গবেষণার ফলাফল আমলে নিয়ে সরকারের উচিত এ ধরনের দুর্ঘটনা মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া।
তবে দুর্ঘটনার পর গত বছরের মার্চে জাতিসংঘ এবং পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের করা যৌথ সমীক্ষা প্রতিবেদনের সুপারিশ সরকার আমলে নেয়নি। সুন্দরবনে তেল নিঃসরণসহ যেকোনো দুর্ঘটনা রোধে করণীয় নির্ধারণে একটি কর্মপরিকল্পনা করার সুপারিশ ছিল ওই প্রতিবেদনে। এ ছাড়া সুন্দরবনে দীর্ঘমেয়াদি কোনো প্রভাব পড়েছে কি না, আবারও সমীক্ষা চালিয়ে তা দেখতে বলা হয়েছিল। কিন্তু সেই কর্মপরিকল্পনা এখনো চূড়ান্ত হয়নি। ওই সমীক্ষাটিও করা হয়নি।
এ বিষয়ে জাতিসংঘ এবং পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে গঠিত সমীক্ষা দলের উপদলনেতা খুরশিদ আলম প্রথম আলোকে বলেন, ‘সরকারের আমন্ত্রণে আমরা সমীক্ষাটি করেছিলাম। সেখানে বেশ কিছু সুপারিশও ছিল। দীর্ঘমেয়াদি সমীক্ষা করা তার একটি। সরকার চাইলে এ ধরনের সমীক্ষায় আমরা সহযোগিতা দিতে এখনো প্রস্তুত আছি।’
অবশ্য সুন্দরবনের প্রাণ চক্রের ওপর প্রভাব নিরূপণে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ অ্যান্ড মেরিন রিসোর্সেস টেকনোলজি অনুষদের অধ্যাপক মুহাম্মদ আবদুর রউফকে প্রধান করে একটি সমীক্ষা শুরু করেছিল বন বিভাগ। কিন্তু দুই মাস সমীক্ষা চলার পর তা থেমে যায়। পরিবেশ অধিদপ্তর থেকে সুন্দরবনের দ্রবীভূত অক্সিজেনের নমুনা দিয়ে দু-তিন মাস পরীক্ষা করার পর তার ধারাবাহিকতা রাখা হয়নি।
এ বিষয়ে পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের সচিব কামাল উদ্দিন আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘তেল ছড়িয়ে পড়ার কারণে সুন্দরবনের তেমন কোনো ক্ষতি হয়নি। তাই পরে আমরা আর কোনো ফলোআপ গবেষণা করিনি। অবশ্য সুন্দরবনের জন্য একটি কর্মপরিকল্পনার খসড়া আমরা চূড়ান্ত করেছি।’
তবে সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে জাহাজ চলাচল এখনই বন্ধ করার পরামর্শ দিয়েছেন বন্য প্রাণী বিশেষজ্ঞ রেজা খান। তিনি বলেন, ‘এ ধরনের ক্ষতি আর হতে দেওয়া যাবে না। বর্তমানে যেভাবে জাহাজ চলছে, তাতে যেকোনো সময় দুর্ঘটনার আশঙ্কা রয়েছে। এরপরে আরেকটি দুর্ঘটনা যে ঘটবে না, তার নিশ্চয়তা কে দেবে? এ ধরনের দুর্ঘটনা নিয়মিত ঘটলে একদিন এই বনটাই আমাদের কাছ থেকে হারিয়ে যাবে।’
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক আবদুল্লাহ হারুন চৌধুরীর নেতৃত্বে একদল গবেষকের বছরব্যাপী করা একটি গবেষণায় এ তথ্য ও পর্যবেক্ষণ উঠে এসেছে। এতে বলা হয়েছে, দৃশ্যত সেখানে তেল দেখা না গেলেও তা কাদার স্তরে স্তরে জমে আছে, যা বিশ্বের সর্ববৃহৎ এই ম্যানগ্রোভ বনকে মারাত্মক ক্ষতি করছে। এ গবেষণা বলছে, ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় তেলের পরিমাণ এখনো স্বাভাবিকের চেয়ে ২০ গুণ বেশি।
২০১৪ সালের ৯ ডিসেম্বর সুন্দরবনের চাঁদপাই রেঞ্জের কাছে শ্যালা নদীতে তেলের ট্যাংকার সাড়ে তিন লাখ লিটার তেল ছড়িয়ে পড়ে। সে সময় জাতিসংঘ এবং পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের যৌথ সমীক্ষায় সেখানকার জলজ জীববৈচিত্র্যের দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির আশঙ্কা করা হয়েছিল। কিন্তু বনের ভেতর দিয়ে জাহাজ চলাচল এখনো বন্ধ হয়নি।
জানতে চাইলে বন্য প্রাণী বিশেষজ্ঞ রেজা খান মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, ‘সুন্দরবনের ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা থেকে যে পরিমাণ তেল কমেছে এবং প্রাণিকণা ও উদ্ভিদকণা যেভাবে বেড়েছে, তা আমাদের আশাবাদী করে। এটা প্রমাণ করে যে সুন্দরবনের প্রাকৃতিক শক্তি কতটা তীব্র। তবে ২০০৭ সালে ঘূর্ণিঝড় সিডর সুন্দরবনে আঘাত হানার কয়েক মাসের মাথায় একটি বর্ষা পাওয়ার পরই সবুজ হয়ে উঠেছিল। ক্ষতি পুষিয়ে উঠেছিল। কিন্তু তেল ছড়িয়ে পড়ার এক বছর পরও বনের প্রতিবেশব্যবস্থায় তেল ও এর প্রভাব রয়ে গেছে।’
অধ্যাপক আবদুল্লাহ হারুন চৌধুরীর নেতৃত্বে ‘সুন্দরবনে তেল ছড়িয়ে পড়ার পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন ও পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদন-২০১৬’ শীর্ষক গবেষণাটি দুই পর্বে হয়েছে। প্রথম পর্ব ছিল ২০১৪ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। দ্বিতীয় পর্ব ২০১৫ সালের মার্চ থেকে ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। তেল ছড়ায়নি এবং তেল ছড়িয়েছে—এমন এলাকার তুলনামূলক অবস্থার পর্যবেক্ষণ এখানে উঠে এসেছে। এ গবেষণায় আরও যুক্ত ছিলেন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ইফতেখার ইসলাম ও সামুদ্রিক প্রাণবৈচিত্র্য বিশেষজ্ঞ জি এম জগলুল ইসলাম।
গবেষণায় দেখা গেছে, তেল ছড়ায়নি এমন স্থানে প্রতি লিটার পানিতে দ্রবীভূত তেলের পরিমাণ প্রায় ৯ মিলিগ্রাম। আর ক্ষতিগ্রস্ত ৩০০ বর্গকিলোমিটার এলাকার তিনটি স্থানে প্রতি লিটার পানিতে দ্রবীভূত তেল রয়েছে ৪৩ মিলিগ্রাম। দুর্ঘটনার পরপরই এর পরিমাণ ছিল প্রায় ১ গ্রাম।
দুই ইঞ্চি গভীর থেকে সংগৃহীত মাটি পরীক্ষা করে দেখা গেছে, তেল ছড়ায়নি এমন এলাকায় প্রতি কেজি মাটিতে তেল পাওয়া গেছে সাড়ে পাঁচ মিলিগ্রাম। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় এখনো প্রতি কেজি মাটিতে ১২৩ মিলিগ্রাম তেল রয়ে গেছে। গত বছর যা ছিল ১ গ্রামেরও বেশি। তেলের পরিমাণ কমলেও তা এখনো স্বাভাবিকের চেয়ে ২০ গুণ বেশি।
তেল কমার বিষয়ে আবদুল্লাহ হারুন চৌধুরীর ব্যাখ্যা, ছড়িয়ে পড়া সাড়ে তিন লাখ লিটার তেলের মধ্যে সরকার এক লাখ লিটার বন থেকে অপসারণ করেছিল। বাকিটা বনের পানি, মাটি ও গাছে রয়ে যায়। দুর্ঘটনার পর বন বিভাগ ও সরকারি বিভিন্ন সংস্থা স্থানীয় লোকজনের মাধ্যমে পাড়া দিয়ে কিছু তেল সুন্দরবনের মাটির নিচে চাপা দিয়েছিল। এই তেল বনের প্রতিবেশব্যবস্থার মধ্যে ঢুকে পড়ে, যা সেখানকার জীববৈচিত্র্যের জন্য বিষাক্ত উপাদান হিসেবে রয়ে গেছে। তবে আশার কথা, গত জুন থেকে সুন্দরবনে বৃষ্টি ও জোয়ার-ভাটায় সেই তেলের পরিমাণ কমেছে।
সুন্দরবনে সাধারণত প্রতি লিটার পানিতে খাদ্যচক্রের প্রাথমিক উপাদান উদ্ভিদকণা থাকে ৩২৬টি। গবেষণায় দেখা গেছে, ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় গত ফেব্রুয়ারিতে এই উদ্ভিদকণা ছিল ১০৩টি। আর দুর্ঘটনার পর পাওয়া গিয়েছিল ৩২টি। প্রাণিকণা থাকার কথা ৫৩টি, ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় বর্তমানে আছে ২২টি, দুর্ঘটনার পর পর যা ছিল ৭টি। পানিতে জৈব উপাদানের মাত্রা কেমন, তা নির্ধারণের জন্য সিওডি পরীক্ষা করা হয়। এতে দেখা গেছে, প্রতি লিটার পানিতে সিওডি ৬৮ মিলিগ্রাম। আর ফেব্রুয়ারিতে পাওয়া গেছে ১৫৩ মিলিগ্রাম।
গবেষক দল তেল ছড়িয়ে পড়া এলাকা জয়মণি, হারবাড়িয়া ও করমজলে এক বছর পরেও কোনো লোনা পানির পদ্মফুল দেখতে পায়নি। সুন্দরবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই ফুলকে ওই এলাকায় আগে প্রায়ই দেখা যেত। বনের শ্বাসমূলে জড়িয়ে থাকা একধরনের লাল ও বাদামি শেওলা দেখা যায়। কিন্তু ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় ওই দুই প্রজাতির শেওলা দেখা যাচ্ছে না। শেওলা দুটি সুন্দরবনের মাছের অন্যতম খাবার। দূষণ নেই এমন এলাকায় ২৭ থেকে ৩৩ প্রজাতির মাছ পাওয়া যায়। কিন্তু ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় দেখা গেছে ১৫ থেকে ২৩টি।
ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় কুমিরের বাচ্চা দেওয়ার স্থানগুলোতে গবেষণাকালে কোনো কুমির দেখতে পাওয়া যায়নি। দূষণ হয়নি এমন এলাকায় ৮ থেকে ১৪ প্রজাতির শামুক দেখা যায়। কিন্তু ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় মাত্র ৪ প্রজাতির শামুক দেখা গেছে। এ ছাড়া সাপ, কাঁকড়াসহ বিভিন্ন প্রাণী পর্যবেক্ষণ করে তা আগের চেয়ে প্রায় অর্ধেকে নেমে আসতে দেখা গেছে।
এ বিষয়ে আবদুল্লাহ হারুন চৌধুরী বলেন, সুন্দরবনের প্রতিটি প্রাণী একে অপরের ওপর নির্ভরশীল। উদ্ভিদকণা সুন্দরবনের প্রাথমিক প্রাণ, আর বাঘ সর্বোচ্চ প্রাণী। কোনো একটি স্তরের প্রাণীর সংখ্যা কমে গেলে তা অন্য স্তরের টিকে থাকার জন্য হুমকি হিসেবে দেখা দেবে। তেল ছড়িয়ে পড়ার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব সম্পর্কে আরও বিস্তারিত গবেষণা হওয়া উচিত। গবেষণার ফলাফল আমলে নিয়ে সরকারের উচিত এ ধরনের দুর্ঘটনা মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া।
তবে দুর্ঘটনার পর গত বছরের মার্চে জাতিসংঘ এবং পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের করা যৌথ সমীক্ষা প্রতিবেদনের সুপারিশ সরকার আমলে নেয়নি। সুন্দরবনে তেল নিঃসরণসহ যেকোনো দুর্ঘটনা রোধে করণীয় নির্ধারণে একটি কর্মপরিকল্পনা করার সুপারিশ ছিল ওই প্রতিবেদনে। এ ছাড়া সুন্দরবনে দীর্ঘমেয়াদি কোনো প্রভাব পড়েছে কি না, আবারও সমীক্ষা চালিয়ে তা দেখতে বলা হয়েছিল। কিন্তু সেই কর্মপরিকল্পনা এখনো চূড়ান্ত হয়নি। ওই সমীক্ষাটিও করা হয়নি।
এ বিষয়ে জাতিসংঘ এবং পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে গঠিত সমীক্ষা দলের উপদলনেতা খুরশিদ আলম প্রথম আলোকে বলেন, ‘সরকারের আমন্ত্রণে আমরা সমীক্ষাটি করেছিলাম। সেখানে বেশ কিছু সুপারিশও ছিল। দীর্ঘমেয়াদি সমীক্ষা করা তার একটি। সরকার চাইলে এ ধরনের সমীক্ষায় আমরা সহযোগিতা দিতে এখনো প্রস্তুত আছি।’
অবশ্য সুন্দরবনের প্রাণ চক্রের ওপর প্রভাব নিরূপণে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ অ্যান্ড মেরিন রিসোর্সেস টেকনোলজি অনুষদের অধ্যাপক মুহাম্মদ আবদুর রউফকে প্রধান করে একটি সমীক্ষা শুরু করেছিল বন বিভাগ। কিন্তু দুই মাস সমীক্ষা চলার পর তা থেমে যায়। পরিবেশ অধিদপ্তর থেকে সুন্দরবনের দ্রবীভূত অক্সিজেনের নমুনা দিয়ে দু-তিন মাস পরীক্ষা করার পর তার ধারাবাহিকতা রাখা হয়নি।
এ বিষয়ে পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের সচিব কামাল উদ্দিন আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘তেল ছড়িয়ে পড়ার কারণে সুন্দরবনের তেমন কোনো ক্ষতি হয়নি। তাই পরে আমরা আর কোনো ফলোআপ গবেষণা করিনি। অবশ্য সুন্দরবনের জন্য একটি কর্মপরিকল্পনার খসড়া আমরা চূড়ান্ত করেছি।’
তবে সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে জাহাজ চলাচল এখনই বন্ধ করার পরামর্শ দিয়েছেন বন্য প্রাণী বিশেষজ্ঞ রেজা খান। তিনি বলেন, ‘এ ধরনের ক্ষতি আর হতে দেওয়া যাবে না। বর্তমানে যেভাবে জাহাজ চলছে, তাতে যেকোনো সময় দুর্ঘটনার আশঙ্কা রয়েছে। এরপরে আরেকটি দুর্ঘটনা যে ঘটবে না, তার নিশ্চয়তা কে দেবে? এ ধরনের দুর্ঘটনা নিয়মিত ঘটলে একদিন এই বনটাই আমাদের কাছ থেকে হারিয়ে যাবে।’

No comments:
Post a Comment