Thursday, March 24, 2016

নির্বাচন ও কবর খোঁড়ার রাজনীতি by ফারুক ওয়াসিফ

ভোটে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার উপায় না দেখে আত্মহত্যার পথ নিয়েছিলেন একজন। নিজ উঠানে কবর খুঁড়ে তার মধ্যে দাঁড়িয়ে ছিলেন আওয়ামী লীগের ওই বিদ্রোহী প্রার্থী। পুলিশ সেখান থেকে তাঁকে উঠিয়ে সোজা কারাগারে পাঠিয়েছে। কবরবাসের চেয়ে নিশ্চয়ই জেলবাস অতি উত্তম। ঘটনাটি গত শুক্রবারের, বরিশালের মুলাদী উপজেলার কাজীরচর ইউনিয়নের। এরপর মঙ্গলবার এল, ইউপি নির্বাচনের প্রথম দফা ভোট সাঙ্গ হলো। আজ বুধবার পর্যন্ত নির্বাচনী ঝড়ে ঝরে গেল ২২টি প্রাণ। দ্বিতীয় দফায়, তৃতীয় দফায় কী হয় বলা যায় না। মুলাদী উপজেলার আওয়ামী লীগের সভাপতি, ইউনিয়ন পরিষদের বিদ্রোহী চেয়ারম্যান প্রার্থী ইঞ্জিনিয়ার ইউসুফ আলী হাওলাদার আত্মহত্যার হুমকি দিয়ে কেবল নিজে কবরই খুঁড়েছিলেন! এখন খুঁড়তে হচ্ছে ২২টি কবর। ভোট গ্রহণ চলাকালে আইনশৃঙ্খলা পুলিশের গুলিতে আহত হাজারের ওপর। এঁদের অনেকে হাসপাতালের নার্সের সেবা নিচ্ছেন। কিন্তু আমরা দ্বিধান্বিত-নির্বাচনের আসল জায়গাটা আসলে কোথায়-কারাগারে, না কবরে? এখন যে তা আহত বা রুগ্‌ণ, তা নিয়ে সন্দেহ নেই। কিন্তু কোন নার্সের সেবায় সুস্থ হবে এটি? নির্বাচন কমিশনার বলেছেন, তাঁর কোনো দায় নেই। কী বিচিত্র ‘স্বাধীন’, ‘সক্ষম’ ও ‘নিদায়’ তিনি!
বিএনপির বেলায় অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র, নির্বাচন ইত্যাদি উঠেই গেছে। কিন্তু আওয়ামী লীগকে সেই দোষ দেওয়া যাবে না। এবারের নির্বাচনী মাঠের দুই প্রান্তেই তাঁদের লোক-অফিশিয়াল আওয়ামী লীগ বনাম বিদ্রোহী আওয়ামী লীগ। মারামারি, ব্যালট ছিনতাই, কারচুপিও যা হচ্ছে, তা তাদের বরাতেই হচ্ছে। পুলিশকেও সরকারি পক্ষ ধরা যায়। তারা কোথাও আওয়ামী লীগের ‘ক’ দলের, কোথাও ‘খ’ দলের হয়ে লড়াই করছে। স্ব-দলের মধ্যে প্রতিযোগিতাকে অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রচর্চা বলা হয়। ইউপি নির্বাচনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ প্রতিযোগিতা প্রকাশ্যে গুলি-বারুদ সহযোগে ঘটে চলাকে তাই গণতন্ত্রের উত্তরণই বলতে হবে। আামাদের নির্বাচন কমিশন একদলীয় নির্বাচন করার কাজের কাজি হিসেবে ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। তাদের ধন্যবাদ। কিন্তু এই স্বদলীয় সংঘাত থেকে এটাও বোঝা গেল যে, আওয়ামী লীগ সংগঠনে হানাহানি কত বেশি! ব্রিটিশ ও পাকিস্তানিরা যা পারেনি, বাঙালিরা তা পেরেছে। জাতীয় ও স্থানীয় কোনো নির্বাচনকেই আর অংশগ্রহণমূলক বলা যাচ্ছে না, শান্তিপূর্ণ তো নয়ই। মান্ধাতা নামে এক প্রাচীন শাসক ছিলেন। তাঁর আমল থেকেই ক্ষমতার মসনদে কে বসবে তা যুদ্ধ, প্রাসাদ ষড়যন্ত্র ও হত্যালীলার মাধ্যমে ঠিক করা হতো। অর্থাৎ, যিনি গায়ের জোরে জিতবেন, তিনিই রাজা হবেন। জো জিতা ওহি সিকান্দার। তারপর বঙ্গদেশে গোপাল নামে এক রাজাকে এলিট নাগরিকেরা মিলে নির্বাচিত করলেন। তিব্বতি বৌদ্ধ পণ্ডিত তারানাথের ‘হিস্ট্রি অব বুদ্ধিজম ইন ইনডিয়া’ বইয়ে তাঁর অনেক সুনাম করা আছে। ২০ বছর সুশাসনের পর ৭৭০ খ্রিষ্টাব্দে তিনি গত হন। রাজা গোপাল ছিলেন পাল বৌদ্ধ সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা। তাঁর আমলে বাংলার বিস্তর উন্নতি হয়েছিল। সুতরাং ব্রিটিশ আসার আগেও বঙ্গদেশে নির্বাচনের প্রচলন ছিল। বাংলাদেশের ইতিহাসে সশস্ত্র বিপ্লব হয়নি। তবে শান্তিপূর্ণ নির্বাচনী বিপ্লব একাধিকবার হয়েছিল। ১৯৩৭ সালের নির্বাচনে শেরে বাংলা ফজলুল হকের নেতৃত্বে কৃষক প্রজা পার্টি জমিদারদের কংগ্রেস ও অভিজাতদের মুসলিম লীগকে পরাজিত করে। কৃষক শ্রেণির একটি দলের মাধ্যমে এভাবে শ্রেণি সংগ্রাম ও অসাম্প্রদায়িক সেক্যুলার রাজনীতির বড় বিজয় আসে। হক সাহেবের নেতৃত্বেই জমিদারি ব্যবস্থা দুর্বল হয় এবং মহাজনি শোষণ উচ্ছেদ হয়। বাঙালি মুসলমানের অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির এই ধারাই ১৯৭০ সালে আওয়ামী লীগের নামে ভোটবিপ্লব ঘটিয়ে স্বাধীনতার দাবিকে প্রচণ্ড করে তোলে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সমাজ-প্রগতির ইতিহাসে তাই নির্বাচন বিরাট ভূমিকা রেখেছিল। শান্তি আর নির্বাচন তখন সমার্থক ছিল। নির্বাচনের মাহাত্ম্যই এখানে যে এ পদ্ধতিতে যুদ্ধ না করে শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা পাওয়া সম্ভব। সেই আওয়ামী লীগ আমলে নির্বাচন থেকে শান্তি শত যোজন দূরে চলে গেল এবং খোদ নির্বাচনটাই পরিণত হলো প্রহসনে। যে প্রহসন ও বলপ্রয়োগের শাসন ব্রিটিশ ও পাকিস্তানের দ্বারা সম্ভব হয়নি, তা সম্ভব হলো বাঙালিদের দ্বারা। নির্বাচন এখন কি স্থানীয় কি জাতীয়, কোথাও ক্ষমতা হস্তান্তরের উপায় নয়। যখন নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতার পালাবদল হয় না, তখন বলপ্রয়োগ হয়ে ওঠে একমাত্র ঔষধ। তাই স্থানীয় ও জাতীয় সরকারে কে ক্ষমতাবান হবেন, তা নির্ধারিত হচ্ছে বলপ্রয়োগের মাধ্যমে। খোলসটা নির্বাচন হলেও যাকে বলে modus operandi বা কার্যপ্রণালি, তা হলো বলপ্রয়োগ। হোক তা রাষ্ট্রীয় অথবা দলীয়। যত দিন না সুষ্ঠু নিরপেক্ষ নির্বাচনী ব্যবস্থা কায়েম না হবে, তত দিন রাজনীতি থেকে বলপ্রয়োগের বাড়াবাড়ি বিদায় হবে না। তত দিন, চান বা না চান নির্বাচন কমিশন ও তার কমিশনারকে বলপ্রয়োগের ম্যানেজারি ও সাফাইকারী হয়েই থাকতে হবে। বরিশালের মুলাদী উপজেলার বিদ্রোহী প্রার্থী অবশ্যই ভবিষ্যৎদর্শী। তিনি দেখতে পেয়েছিলেন, বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক নির্বাচনী ব্যবস্থা উপায় না পেয়ে নিজেই নিজের কবর খুঁড়ে চলেছে।
পুনশ্চ: দুই দিন আগে শেষ হওয়া স্কুল ক্যাবিনেট নির্বাচনেও এক ছাত্র ছুরি মেরেছে আরেক ছাত্রকে। মহাজ্ঞানী, মহজানদের দেখে-শুনে কচি ছাত্ররাও যা শেখার তা শিখে ফেলেছে।

No comments:

Post a Comment