বিহার-দিল্লিতে
পর্যুদস্ত হওয়ায় নিজের ভাবমূর্তি ফেরাতে ‘আসাম জয়ের’ স্বপ্নে বিভোর ভারতের
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সর্বশক্তি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন।
উত্তর-পূর্ব ভারতে সবচেয়ে বড় ‘কংগ্রেস দুর্গে’ ধস নামিয়ে গেরুয়া পতাকা
ওড়াতে মরিয়া বিজেপি আস্তিনের প্রায় সব তাসই প্রকাশ্যে নিয়ে এসেছে।
নরেন্দ্র মোদি নিজে তো বটেই, দলের ছোট, মাঝারি, বড়—সব ধরনের নেতাই উড়ে
এসে প্রচারে ঝড় তুলছেন বরাক ও ব্রহ্মপুত্র উপত্যকায়। প্রতিশ্রুতি আর কুৎসার
বন্যা বইছে ফি-বছর ভয়ংকর বানভাসি রাজ্যটির অলিতে-গলিতে। তবে বিজেপি যেখানে
আদাজল খেয়ে দলের সর্বভারতীয় নেতৃত্বকে প্রচারে শামিল করেছে, সেখানে
অনেকটাই ভারমুক্ত দেখাচ্ছে ক্ষমতাসীন কংগ্রেসকে। এ বছর ভারতের পাঁচটি
রাজ্যে বিধানসভার ভোট হচ্ছে। কংগ্রেস শাসিত আসামে ভোট শুরু হচ্ছে সোমবার।
বাস্তব পরিস্থিতি বলছে, আসাম বাদে আর কোথাও জয়ের শক্তি নেই বিজেপির। ২০১৪
সালে মোদি বিপুল জয়ের মাধ্যমে দিল্লির মসনদে বসার পর থেকে আঞ্চলিক
নির্বাচনে বিজেপির হারার যে ‘ঐতিহ্য’ শুরু হয়েছে, আসাম না পেলে সেই ধারাই
অব্যাহত থাকবে। দিল্লিতে অরবিন্দ কেজরিওয়াল বা বিহারে নিতীশ কুমার
‘মোদি-ম্যাজিক’কে এক্কেবারে ভোঁতা করে দেওয়ার পর অনেকেই মনে করছেন, আসামই
হতে পারে তাঁর ঘুরে দাঁড়ানোর একমাত্র পথ। তাই অমিত শাহকে সঙ্গে নিয়ে আসাম
যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন প্রধানমন্ত্রী নিজেই। বহু আগে থেকেই মন্ত্রিসভার
সদস্যদের পাশাপাশি নিজে উড়ে এসেছেন আসামে। ভোট প্রচার শুরু হতেও একই ছবি।
প্রথম দফার ভোটের আগে দুই দিনে মোদি নিজেই সাতখানা সভা করলেন। অমিত শাহ,
অরুণ জেটলি, নিতীন গড়কড়ি, সুষমা স্বরাজ—সবাইকে নামালেন ভোট প্রচারে। যদিও
লাগাম রইল মোদির হাতেই। আসামে টানা ১৫ বছর ক্ষমতায় থেকে রেকর্ড করেছেন
বর্তমান কংগ্রেসি মুখ্যমন্ত্রী তরুণ গগৈ। এবার সরাসরি তাঁকেই চ্যালেঞ্জ
ছুড়ে দিলেন মোদি। লড়াই হয়ে দাঁড়াল ‘আসামের মুখ্যমন্ত্রী বনাম ভারতের
প্রধানমন্ত্রী’। সৌজন্যে সেই নরেন্দ্র মোদিই। কংগ্রেস অবশ্য এত হইচইয়ে নেই।
রাহুল গান্ধীকে দিয়ে খান তিনেক, সোনিয়া গান্ধিকে দিয়ে একটি নির্বাচনী
জনসভা করিয়েই প্রথম দফার ভোটে লড়তে যাচ্ছে। কংগ্রেস নেতারা বোঝাতে চাইছেন,
‘জয় তাঁদের নিশ্চিত। আর সেটা রাজ্য-রাজনীতির সমীকরণেই।’ গত লোকসভা
নির্বাচনে ১৪টি আসনের মধ্যে ৭টি আসন পেয়েই বিজেপি এই রাজ্যে ক্ষমতায় আসার
বিষয়ে আশাবাদী। কংগ্রেস পেয়েছিল মাত্র তিনটি। বাকি তিনটি গিয়েছিল সংখ্যালঘু
মুসলিমদের সংগঠন সাদৌ ভারত সংযুক্ত গণতান্ত্রিক মোর্চার (এআইইউডিএফ) দখলে।
এটা বিজেপিকে আরও উৎসাহিত করে। তারা ধরে নেয়, কংগ্রেস আর এআইইউডিএফ মুসলিম
ভোট ভাগাভাগিতে মত্ত থাকায় তারা সহজেই আসামের ক্ষমতায় আসবে। সেই অঙ্ক
মাথায় রেখেই স্থানীয় পর্যায়ে জোটও করে তারা। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে,
স্থানীয় পর্যায়ে সেই অঙ্ক মিলছে না। বিধানসভার ভোটে নাগরিকদের মনোভাব
বেশির ভাগ সময়ই লোকসভা ভোটের চেয়ে আলাদা রকম দেখা গিয়েছে। চমক জাগানো
সেই ‘মোদি-ম্যাজিক’ও এখন অনেকটাই স্থিমিত। আসামের ভোটে চিরকালই ভাষিক ও
ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের একটা প্রভাব থাকে। সেই সঙ্গে রয়েছে চা-শ্রমিক ও
পাহাড়ি জনজাতিদের ভোট ব্যাংক। কংগ্রেস চিরকালই এই ‘পার্টি গণিতে’ বেশ শক্ত
খেলোয়াড়। বিজেপি নেতারাও সেটা জানেন। তাই চেষ্টার ত্রুটি রাখছেন না।
‘আলি-কুলি-বঙ্গালি’ ভোট ভাগাভাগি করার পাশাপাশি ১৫ বছরের
‘প্রতিষ্ঠানবিরোধী’ হাওয়াকেও কাজে লাগাতে চাইছে বিজেপি। সেই সঙ্গে রয়েছে
কংগ্রেস সরকারের বিরুদ্ধে লাগামছাড়া দুর্নীতির অভিযোগ। এটাই লড়াইয়ের
ময়দানে শক্ত জমি দিয়েছে বিজেপিকে।
Subscribe to:
Post Comments (Atom)

No comments:
Post a Comment