Wednesday, April 6, 2016

আরও প্রায় ১ কোটি ডলার ফেরত দেবেন কিম ওয়ং

বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভের চুরি যাওয়া ৮ কোটি ১০ লাখ ডলারের মধ্য থেকে আরও ৯৬ লাখ ৪০ হাজার মার্কিন ডলার ফেরত দেবেন ফিলিপাইনের ক্যাসিনো ব্যবসায়ী ক্যাম সিন ওয়ং বা সংক্ষেপে কিম ওয়ং। আগামী এক মাসের মধ্যে তিনি এ অর্থ ফেরত দেবেন বলে অঙ্গীকার করেছেন। গতকাল মঙ্গলবার ফিলিপাইনের সিনেটে অনুষ্ঠিত শুনানিতে কিম ওয়ং এ অঙ্গীকার করেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভের অর্থ চুরির ঘটনা নিয়ে গতকাল ফিলিপাইনের সিনেটে চতুর্থ দফা শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। গতকালের শুনানিতে ফিলিপাইনের অ্যান্টি মানি লন্ডারিং কাউন্সিল (এএমসিএল) জানিয়েছে, ফিলিপাইনে পাচার হওয়া অর্থ উদ্ধারের অংশ হিসেবে স্থানীয় কয়েকটি ক্যাসিনো ও জাঙ্কেট অপারেটরসহ ১৯ ব্যক্তির বিরুদ্ধে ‘সম্পদ বাজেয়াপ্ত’ করার মামলা করা হবে। আগামী সপ্তাহে এসব মামলা করা হবে বলে জানান এএমসিএলের নির্বাহী পরিচালক জুলিয়া বাকে-আবাদ। যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাংক থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভের চুরি যাওয়া অর্থের মধ্যে ৮ কোটি ১০ লাখ ডলার গিয়েছিল ফিলিপাইনে। দেশটির রিজাল কমার্শিয়াল ব্যাংকিং করপোরেশন বা আরসিবিসির মাকাতি শহরের জুপিটার স্ট্রিট শাখার মাধ্যমে এ অর্থ স্থানান্তর হয়। আরসিবিসির পাঁচটি ব্যাংক হিসাব হয়ে চুরির অর্থ গিয়েছিল কিম ওয়ংয়ের মালিকানাধীন ক্যাসিনো ইস্টার্ন হাওয়াই লেইজার কোম্পানিসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে। সিনেটের গতকালের শুনানির আগে কিম ওয়ং দুই দফায় ৫৪ লাখ ৬০ হাজার ডলার ফেরত দিয়েছেন। এখন আরও ৯৬ লাখ ৬০ হাজার ডলার ফেরত দেওয়ার কথা বলেছেন। এ অর্থ পাওয়া গেলে কিম ওয়ংয়ের কাছ থেকে সব মিলিয়ে ১ কোটি ৫১ লাখ ডলারেরও বেশি অর্থ উদ্ধার হবে। সিনেটের শুনানিতে অংশ নিয়ে কিম এ অর্থ পাচারের ঘটনায় নিজের যোগসূত্রসহ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেন। সেই সঙ্গে নিজে বড় অঙ্কের অর্থ ফেরত দেওয়ার ঘোষণা দেন। তারই অংশ হিসেবে এরই মধ্যে প্রায় ৫৫ লাখ ডলার ফেরত দিয়েছেন। ফিলিপাইনের স্থানীয় মুদ্রা পেসোতে এসব অর্থ ফেরত দেওয়া হয়। গতকালের শুনানিতে সিনেটের ব্লু রিবন কমিটির চেয়ারম্যান কিম ওয়ংয়ের কাছে জানতে চান, ‘আপনি কি জনসমক্ষে ৪৫ কোটি পেসো বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষকে ফিরিয়ে দেওয়ার ওয়াদা করবেন?’ জবাবে কিম বলেন, ‘হ্যাঁ, আমি একটি ওয়াদাপত্র দেব। কারণ, অর্থ ফিরিয়ে দিতে হলে আমাকে আমার বন্ধুদের কাছ থেকে ধার করতে হবে। পাশাপাশি আমার শেয়ার থেকেও কিছু অর্থ জোগাড় করতে হবে। এতে ১৫ দিনের মতো সময় লাগতে পারে। এরপরই উল্লিখিত অর্থ নগদ ফিরিয়ে দেব।’ পরে অর্থ ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য কিম ওয়ংকে ১৫ থেকে ৩০ দিন সময় দেওয়া হয়। ফিলিপাইনের তদন্ত-সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভের চুরি যাওয়া অর্থের মধ্যে যে ৮ কোটি ১০ লাখ ডলার ফিলিপাইনে গিয়েছিল, তার মধ্য থেকে একাধিক হাত ঘুরে ২ কোটি ১৫ লাখ ডলার গেছে কিম ওয়ংয়ের ক্যাসিনোতে। এদিকে গতকালের শুনানিতে অংশ নিয়েছেন আরসিবিসির জুপিটার স্ট্রিট শাখার সাবেক শাখা ব্যবস্থাপক বা ব্রাঞ্চ ম্যানেজার মায়া সান্তোস দেগুইতো। শুনানিতে অংশ নিয়ে মায়া সান্তোস বলেন, ‘এরই মধ্যে অন্যান্য ব্যক্তি যেসব সাক্ষ্য দিয়েছেন, তাতে সবাই এ অর্থ পাচারের জন্য এমনভাবে আমাকে দায়ী করেছেন, তা থেকে মনে হচ্ছে আমার মতো ব্যাংকের মধ্যম সারির একজন কর্মকর্তার এ ধরনের অপরাধ ঘটানো কোনো ব্যাপারই নয়। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে এ মাত্রার একটি অপরাধ কয়েকটি দেশের ক্ষমতাবান, প্রভাব ও সম্পদশালী ব্যক্তির অংশগ্রহণ ছাড়া সম্ভব নয়।’ মায়া সান্তোস তাঁর লিখিত বক্তব্যে আরও বলেন, ‘ঘটনার পর আমার এ উপলব্ধি হচ্ছে, এ ঘটনায় আমি “বলির পাঁঠা” হয়েছি। অথচ আমি চেয়েছিলাম একজন শাখা ব্যবস্থাপক হিসেবে আমার যোগ্যতা ও কর্মদক্ষতা দিয়ে ক্যারিয়ারকে এগিয়ে নিতে। যাতে আমার স্বামীর সঙ্গে মিলে আমি আমার পরিবারকে সহায়তা করতে পারি। প্রত্যেক কর্মজীবী মায়েরই এটাই লক্ষ্য থাকে।’ মায়া সান্তোস আরও বলেন, ‘ঘটনাটি যদি আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং ও আর্থিক লেনদেনের সঙ্গে জড়িত রাঘববোয়ালদের একটি দাবা খেলা হয়, তাহলে আমি সেখানে একটি দাবার ঘুঁটিমাত্র।’ এ সময় মায়া সান্তোস সিনেট কমিটিকে উদ্দেশ করে বলেন, ‘এ কমিটি যদি ঘটনার “গ্র্যান্ডমাস্টার” খুঁজে বের করার জন্য কাজ করে থাকে, তবে এটা বলতে পারি, সেই “গ্র্যান্ডমাস্টার” আমি নই।’ গত ৪ ফেব্রুয়ারি দিবাগত রাতে (প্রকারান্তরে ৫ ফেব্রুয়ারি) বাংলাদেশ ব্যাংকের দিক থেকে আর্থিক লেনদেনের বার্তা আদান-প্রদানকারী আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক সুইফট থেকে পরামর্শ পাঠিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব নিউইয়র্কে রক্ষিত বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভের ১০ কোটি ১০ লাখ ডলার চুরি করা হয়। এর মধ্যে ২ কোটি ডলার যায় শ্রীলঙ্কায় আর বাকি ৮ কোটি ১০ লাখ ডলার গেছে ফিলিপাইনে। এরই মধ্যে শ্রীলঙ্কার ২ কোটি ডলার ফেরত পেয়েছে বাংলাদেশ। আর ফিলিপাইনে এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত কিম ওয়ং এখন পর্যন্ত প্রায় ৫৫ লাখ ডলার ফেরত দিয়েছে।

No comments:

Post a Comment