ভারতের
পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনের ছয় পর্বের মধ্যে তিন পর্ব শেষ
হলো। ভোট প্রক্রিয়ার মাঝামাঝি এসে শাসক তৃণমূল কংগ্রেসে এবং তার প্রধান
বিরোধী পক্ষ কংগ্রেস-বামপন্থী জোটের শিবিরে এখন চুলচেরা হিসাব শুরু
হয়েছে, প্রথম তিন পর্বের লড়াইয়ে কে কোথায় পৌঁছাতে পারল। তৃণমূল কংগ্রেসের
শিবির থেকে দুটি মত উঠে আসছে। প্রথমটি দলের নির্বাচনী ম্যানেজার মুকুল
রায়ের ঘনিষ্ঠ মহলের। তাঁদের মত, দল এখনো ১৬০-১৭০টি আসনে জিতে আসতে পারে।
অন্য মতে, লড়াইটা এখন প্রায় সমানে সমান চলছে। কংগ্রেস শিবিরের প্রধান
সেনাপতি অধীর চৌধুরী বা সোমেন মিত্রের মতো নেতারা এবং সিপিএমের
সূর্যকান্ত মিশ্র প্রকাশ্যে যতই বলুন না কেন যে জোট জিতবেই, তাঁদের ঘনিষ্ঠ
মহলে কিন্তু এখন নানা অঙ্ক নিয়ে হিসাব মেলানোর চেষ্টা চলছে। বিরোধী
জোটের নেতারা বলছেন, ভোটের হাওয়া যে এখন অনেকটাই তাঁদের অনুকূলে ঘুরছে,
সেটা তাঁরা টের পাচ্ছেন। কিন্তু একই সঙ্গে সিপিএম রাজ্য কমিটির এক সদস্য
গতকাল শুক্রবার স্বীকার করলেন, গত পাঁচ বছরে গ্রামাঞ্চলে দলের সংগঠন
অনেকটাই দুর্বল হয়ে যাওয়ায় গ্রামের মানুষ কোন দিকে ভোট দিচ্ছেন, তা তাঁরা
ঠিকমতো বুঝতে পারছেন না। ফলে গত তিন দফার ভোটে তাঁরা কোথায় কোথায়
এগিয়ে রয়েছেন, তার কোনো ইঙ্গিত বুঝতে পারছেন না। মনে রাখতে হবে,
পশ্চিমবঙ্গের শহরাঞ্চলের মধ্যবিত্তরা যতই মমতার বিরুদ্ধে সোচ্চার হোন না
কেন, আসনের সংখ্যায় গ্রামাঞ্চলের ভোটই নির্বাচনের ফল নির্ণায়ক হয়ে থাকে।
পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভার মোট ২৯৪ আসনের মধ্যে এ পর্যন্ত ১৬৭ আসনে ভোট
গ্রহণ হয়েছে। উত্তরবঙ্গের কোচবিহারের ৯টি, দক্ষিণবঙ্গের উত্তর চব্বিশ
পরগনার ৩৩, দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার ৩১, কলকাতার ৪, হাওড়ার ১৫, হুগলির ১৮ এবং
পূর্ব মেদিনীপুরের ১৬টি আসনে ভোট বাকি। ২০১১ এবং তার পরের বিভিন্ন ভোটে
এসব জেলায় তৃণমূল কংগ্রেসের প্রাধান্য অটুট রয়েছে। মুকুল রায়রা তাই চেষ্টা
করছেন, এই ১২৭ আসন থেকে যত বেশি পারা যায় দখল করতে। এটা নিশ্চিত করার জন্য
দৃশ্যত তাদের প্রধান কৌশল সন্ত্রাস ছড়িয়ে যত বেশি সংখ্যায় সম্ভব বিরোধী
দলের ভোটদাতাদের নির্বাচনী বুথে আসতে না দেওয়া। বৃহস্পতিবারের ভোটে দেখা
গেল, কলকাতায় এবং বর্ধমানে পুলিশ ও কেন্দ্রীয় বাহিনী বেশ কয়েকটি জায়গায়
শাসক দলের ছেলেদেরই পেটাচ্ছে। বর্ধমানের গ্রামাঞ্চলে নারীরা সন্ত্রাসের
কারণে ভোট দিতে বেরোতে পারছিলেন না। কেন্দ্রীয় বাহিনী গিয়ে তাদের বুথে
পৌঁছে দিল। এত দিন বিরোধী দলের মুখে পুলিশ ও নির্বাচন কমিশনের খুব
সমালোচনা শোনা যাচ্ছিল। এবার শাসক দলের প্রার্থী ও নেতাদের মুখেও সেই
সমালোচনার সুর। আরও একটা বিষয় তৃণমূল কংগ্রেসের কর্মী ও ছোট-বড় নেতাদের
মনোবলে ঘা দিয়েছে। দলের নিচুতলার নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে গুন্ডামি ও
চাঁদাবাজির নানা অভিযোগ সাধারণ মানুষ নিত্যদিনের অভিজ্ঞতায় বিশ্বাস করলেও
তাঁদের ধারণা ছিল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এসবের ঊর্ধ্বে। কিন্তু নারদা ঘুষ
কেলেঙ্কারির ভিডিও ও বিবেকানন্দ উড়ালপুল ভেঙে পড়ার পরে মুখ্যমন্ত্রী যেভাবে
দলের নেতাদের আড়াল করার চেষ্টা চালাচ্ছেন, তাতে তাঁর সেই সততার ভাবমূর্তি
অনেকটাই মলিন।
Subscribe to:
Post Comments (Atom)

No comments:
Post a Comment