Monday, April 4, 2016

‘স্বপ্ন ছিল স্বাবলম্বী হব’

রাজধানীর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে এসএমই ফাউন্ডেশন
আয়োজিত এসএমই মেলা উদ্বোধনের পর অতিথিদের সঙ্গে পুরস্কারপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা
এসএসসি পরীক্ষার পর বিয়ে হয়ে যায় মাসুদা ইয়াসমীনের। সংসার সামলানোর পাশাপাশি গ্র্যাজুয়েশন একসময় শেষ করলেন। তাঁর ইচ্ছে ছিল চাকরি করার। ২০০৮ সালের ঘটনা। একদিন দোকানে চামড়ার ব্যাগ কিনতে গেছেন মাসুদা ইয়াসমীন। হঠাৎ তাঁর মনে হলো তিনিও এ ধরনের ব্যাগ তৈরি করতে পারেন। হাতে টাকা ছিল না। নিজের সব সোনার গয়না বিক্রি করে দুটি সেলাই মেশিন কিনে দুজন কারিগর নিয়ে প্রতিষ্ঠা করলেন স্মার্ট লেদার প্রোডাক্টস। ব্যাগের পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের চামড়াজাত পণ্য তৈরি হয় তাঁর কারখানায়। মোহাম্মদপুরে বিক্রয়কেন্দ্র আছে। তা ছাড়া ঢাকার বড় বড় বিপণিবিতানে স্মার্ট লেদারের পণ্য বিক্রি হচ্ছে। বর্তমানে ইয়াসমীনের কারখানায় কাজ করেন ২৪-২৫ জন কারিগর। সফল এই নারী উদ্যোক্তা চলতি বছরের বর্ষসেরা মাইক্রো উদ্যোক্তার (নারী) স্বীকৃতি পেয়েছেন। রাজধানীর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে গতকাল রোববার শুরু হওয়া পাঁচ দিনের চতুর্থ জাতীয় এসএমই মেলা, ২০১৬-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে মাসুদা ইয়াসমীনের হাতে পুরস্কার তুলে দেন শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু। সব মিলিয়ে তিনটি ক্যাটাগরিতে পাঁচজনকে পুরস্কৃত করা হয়। প্রত্যেক বিজয়ী উদ্যোক্তার হাতে পুরস্কার হিসেবে এক লাখ টাকা, ক্রেস্ট ও সনদ তুলে দেওয়ার আগে তাঁদের উদ্যোক্তা হওয়ার পেছনের গল্প তথ্যচিত্র আকারে দেখানো হয় বড় পর্দায়। এতে মাসুদা ইয়াসমীন বলেন, ‘আমার স্বপ্ন ছিল স্বাবলম্বী হব। আমি স্বাবলম্বী হতে পেরেছি।’ বর্ষসেরা মাইক্রো উদ্যোক্তার (পুরুষ) পুরস্কার পেয়েছেন মো. লুৎফুর রহমান। চাকরি ছেড়ে ১৯৮৪ সালে পাটপণ্য উৎপাদনে নামেন। শুরুর দিকে ব্যবসা কোনোরকমে চলে। তবে ১৯৯৪-৯৫ সালের দিকে পাটপণ্যের নকশায় বৈচিত্র্য আনেন। এরপরই ব্যবসা দ্রুত বাড়তে থাকে। বর্তমানে বছরে সাড়ে তিন থেকে চার কোটি টাকার পাটপণ্য বিদেশে রপ্তানি করেন লুৎফর। তাঁর প্রতিষ্ঠানের নাম সাজু ইন্টারন্যাশনাল ট্রেডিং কোম্পানি। কারখানাটিতে কাজ করেন ৩৫ জন শ্রমিক। চট্টগ্রামের সুলতানা নুরজাহান পেয়েছেন বর্ষসেরা ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা (নারী) পুরস্কার। তাজনুর ফুড প্রোডাক্টস নামে তাঁর প্রতিষ্ঠানে বিস্কুট, ড্রাই কেকসহ বিভিন্ন ধরনের খাবার তৈরি করে স্থানীয় বেকারি ও দোকানে সরবরাহ করেন। এ জন্য আছে ২০টি ভ্যান ও একটি পিকআপ গাড়ি। নুরজাহান বললেন, ‘মানের বিষয়ে আমার প্রতিষ্ঠান কখনোই আপস করে না।’ ২০১০ সালে মাকে নিয়ে সৌদি আরবে হজ করতে গিয়ে কাগজের কাপের সঙ্গে পরিচয় ঘটে কাজী সাজিদুর রহমানের। সেটিকে ঘিরেই তাঁর ব্যবসার স্বপ্ন ডালপালা গজায়। পরে মালয়েশিয়া গিয়ে প্রশিক্ষণ নেন। ২০১২ সালে শুরু করেন কেপিসি ইন্ডাস্ট্রিজ। কারখানাটিতে পরিবেশবান্ধব ও পুনর্ব্যবহারযোগ্য কাগজের কাপ তৈরি হয়। বিভিন্ন বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান কোমল পানীয়, কফি ইত্যাদি পরিবেশনের জন্য কেপিসির কাগজের কাপ কিনে নেয়। কেপিসির এই সাজিদুর রহমানই পেয়েছেন বর্ষসেরা ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা (পুরুষ)। তাঁর কথা, ‘আমি তখনই সফল হব, যখন আরও মানুষের কর্মসংস্থান করতে পারব।’দিনাজপুরের এ টি এম সামসুজ্জামান রিকশা, বাইসাইকেল ও মোটরসাইকেলের চেইন উৎপাদন শুরু করেছেন ২০১৪ সালে। ফলে একসময়কার আমদানি পণ্য এখন দেশেই পাওয়া যাচ্ছে। সামসুজ্জামানের কিউবিসি বিডি লিমিটেডের কারখানায় দেড় শ শ্রমিক কাজ করেন। বিভিন্ন যন্ত্রপাতির পাশাপাশি তিন বছরের মধ্যে নিজস্ব ব্র্যান্ডের মোটরসাইকেল তৈরির স্বপ্ন দেখেন তিনি। এই উদ্যোক্তাই পেলেন বর্ষসেরা মাঝারি উদ্যাক্তা (পুরুষ)। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন অর্থ ও পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী এম এ মান্নান। তিনি বলেন, ‘উদ্যোক্তাদের পুঁজি দেওয়ার মতো শক্তি এসএমই ফাউন্ডেশনের থাকতে হবে। সেই শক্তি তাদের নেই। তবে ব্যবসা-বাণিজ্যের রক্ত হচ্ছে টাকা।’ তিনি ফাউন্ডেশনকে শক্তিশালী করতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নিয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ে বৈঠক করবেন বলে আশ্বাস দেন। প্রতিমন্ত্রীর মতোই এসএমই ফাউন্ডেশনকে শক্তিশালী করার কথা বলেন এফবিসিসিআইয়ের সভাপতি আবদুল মাতলুব আহ্মাদ। তিনি বলেন, ‘এসএমই ফাউন্ডেশনকে সত্যিকার অর্থে কাজ লাগাতে হলে তাদের অর্থায়ন করার ক্ষমতা দিতে হবে।’ এ সময় তিনি রাজশাহীর এক নারী উদ্যোক্তার দুই লাখ টাকার ঋণ পেতে ছয় মাস ব্যাংকের দ্বারে দ্বারে ঘোরার গল্প বলেন। অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন এসএমই ফাউন্ডেশনের চেয়ারপারসন কে এম হাবিব উল্লাহ ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সফিকুল ইসলাম, ২০০৮ সালের সেরা নারী উদ্যোক্তা তানিয়া ওয়াহাব। পাঁচ দিনের এসএমই মেলায় ১৮৩টি প্রতিষ্ঠান অংশ নিয়েছে। প্রতিষ্ঠানগুলো পাট ও চামড়াজাত পণ্য, পোশাক, হস্তশিল্প, কৃষি প্রক্রিয়াজাত পণ্য, প্লাস্টিক, ইলেকট্রিক্যাল ও ইলেকট্রনিক, হালকা প্রকৌশল পণ্য প্রদর্শন ও বিক্রয় করছে। বৃহস্পতিবার পর্যন্ত প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে রাত আটটা পর্যন্ত সবার জন্য মেলার দুয়ার খোলা থাকবে।

No comments:

Post a Comment