Tuesday, April 26, 2016

কান্নার সঙ্গে ক্ষোভ

শোকসভায় বক্তব্য দেন অধ্যাপক রেজাউলের স্ত্রী হোসনে আরা
অধ্যাপক এ এফ এম রেজাউল করিম সিদ্দিকীর শোকসভার পুরোটা সময় কাঁদলেন তাঁর স্ত্রী আর ছেলেমেয়েরা। সঙ্গে কাঁদলেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। কাঁদতে কাঁদতে তাঁরা যা বললেন তাতে ঝরে পড়ল ক্ষোভ। গতকাল সোমবার দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদুল্লাহ্ কলাভবনে ইংরেজি বিভাগে এ শোকসভা হয়। অধ্যাপক রেজাউলের স্ত্রী হোসনে আরা শোকসভায় বলেন, ‘আমি প্রধানমন্ত্রীকে বলছি, আপনি যদি সত্যিকার অর্থে শক্তিশালী প্রধানমন্ত্রী হয়ে থাকেন, সিদ্দিকীর খুনিদের খুঁজে বের করুন। তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিয়ে আমাকে দেখান। এটা দেখে যেন আমার মৃত্যু হয়। প্রধানমন্ত্রীর কাছে আমার অনুরোধ রইল, দেখি বাংলাদেশের কত অগ্রগতি হয়েছে। সিদ্দিকীর খুনিদের শাস্তি দিন।’ স্বামী হত্যার সুষ্ঠু বিচার নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করে হোসনে আরা বলেন, ‘আমি ভয় পাচ্ছি, সাগর-রুনির মতো হত্যাকাণ্ডের বিচার যেখানে হয় না, সেখানে নিরীহ সিদ্দিকী হত্যার বিচার কি হবে?’ এই হত্যাকাণ্ডকে ব্লগার হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে মিলিয়ে ফেলা নিয়ে অধ্যাপক রেজাউলের মেয়ে রিজওয়ানা হাসিন শোকসভায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, ‘আমার বাবার গ্রামে একটা মসজিদ আছে। তিনি পছন্দের মিস্ত্রিদের দিয়ে সেই মসজিদে পছন্দের টাইলস লাগিয়েছেন—কোথাও তো দেখতে পেলাম এ কথা কেউ বলছেন। বাবা শুক্রবারে নামাজ পড়তে যাওয়ার আগে দাদিকে টুপি দেখিয়ে জিজ্ঞেস করতেন, ‘‘কোন টুপিতে বেশি ভালো লাগছে?”—কোথাও তো পেলাম না এ কথা কেউ লিখেছেন।’ ব্লগার-নাস্তিকতার বিষয়ে রিজওয়ানা বলেন, ‘ফেসবুকিং, সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং সম্পর্কে আব্বু কোনো কিছু বুঝতেনই না। ব্লগিংয়ের কথা সম্পূর্ণ মিথ্যা, বানোয়াট। আর আমার আব্বু সৃষ্টিকর্তায় বিশ্বাস করতেন।’ তিনি তাঁর বাবার বিভাগের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের প্রতি আহ্বান জানান, তাঁরা যেন হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু বিচারের দাবিতে সব সময় সোচ্চার থাকেন। রিজওয়ানা বলেন, ‘একটা মিথ সৃষ্টি হয়ে গেছে, একটু গানবাজনা করলে, একটু সেতার চর্চা করলেই লোকটা খুব খারাপ, নামাজ পড়ে না। লোকটা নাস্তিক।’ এই মিথ দূর করতে সবাইকে আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘তা না হলে খুনিরা উসকানি পাবে। কারণ তারা ভাববে, আমরা তো খুন করে চলে যাব। তারপর সেটা নিয়ে বাণিজ্য হবে, অনেক বিতর্ক হবে। আর বাণিজ্য-বিতর্কের আড়ালে আসল ঘটনা চাপা পড়ে যাবে এবং সঠিক বিচার হবে না।’ নিহত রেজাউলের ছেলে রিয়াসাত ইমতিয়াজ বলেন, ‘অধ্যাপক এ এফ এম রেজাউল করিম সিদ্দিকী একটি চেতনার নাম, একটি ধারণার নাম। তাঁকে হত্যা করলেই সেই চেতনা শেষ হয়ে যায় না।’ স্ত্রী হোসনে আরা বলেন, ‘আমি এখানে এভাবে কথা বলব কোনো দিন ভাবিনি। এর আগে আমি এই ইংরেজি বিভাগে অনেকবার এসেছি। সিদ্দিকীর সঙ্গে এসেছি, দুজনে একসঙ্গে বাড়ি ফিরেছি। আজ সিদ্দিকীর জন্যই এখানে এসেছি, কিন্তু সিদ্দিকী নেই। সিদ্দিকী আর কখনো বাড়ি ফিরবেন না।’ শোকসভায় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য মুহম্মদ মিজানউদ্দিন বলেন, ‘আজকে আমাদের মাঝে যে শূন্যতা তৈরি হয়েছে, যে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে, যে দুঃখভারাক্রান্ত হৃদয় নিয়ে শোকসভায় মিলিত হয়েছি এবং বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করেছি, তা অব্যাহত রাখতে হবে।’ তিনি আহ্বান জানিয়ে বলেন, এ হত্যাকাণ্ড শুধু ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থীদের বিষয় যেন না থাকে। পুরো বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা যেন এ আন্দোলনে শরিক হন। সভায় আরও বক্তব্য দেন বিশ্ববিদ্যালয়ের সহ-উপাচার্য অধ্যাপক চৌধুরী সারওয়ার জাহান, ইংরেজি বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী মোস্তাফিজুর রহমান, হাবিবুন্নাহার, সোহান রেজা, হাসান রাজা প্রমুখ।

No comments:

Post a Comment