Tuesday, April 19, 2016

পঙ্গুতে টাকা ছাড়া মেলে না হুইলচেয়ার-স্ট্রেচার by নজরুল ইসলাম

রাজধানীর জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠানে (পঙ্গু হাসপাতাল) টাকা ছাড়া স্ট্রেচার ও হুইলচেয়ার পাওয়া যায় না বলে অভিযোগ রোগীদের। হাসপাতালে ঢোকা, বের হওয়া, এক্স-রে বা অন্যান্য পরীক্ষার জন্য রোগীদের কোলে নিয়ে, কাঁধে নিয়ে যেতে হয় স্বজনদের। যথাসময়ে সুচিকিৎসা পাওয়ার নিশ্চয়তাও নেই। গত রোববার সরেজমিনে পঙ্গু হাসপাতালে গিয়ে রোগীদের কাছে এসব অভিযোগ পাওয়া যায়। রাজধানীর মোহাম্মদপুরে ছয়তলা থেকে রশি ছিঁড়ে পড়ে যাওয়া স্বপন পঙ্গু হাসপাতালে ঢোকার সময় স্ট্রেচার পাননি। হুইলচেয়ারও মেলেনি। ঢুকেছেন সহকর্মী শ্রমিকদের কোলে চড়ে। এরপর হাসপাতালের জরুরি বিভাগে (ইমার্জেন্সি অবজারভেশন রুম) যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছেন। বললেন, ‘ভাই আমি কি বাঁচব...? আমার বাঁ হাতটা কি ভালো হবে...? আল্লাহ আমাকে এমন শাস্তি কেন দিলেন। কেউ আমার পাশে নেই। আমার বুকে খুব ব্যথা করছে।’ স্বপনের বয়স ২০-২২ বছর হবে। মোহাম্মদপুর তাজমহল রোডে আমিন-মোমিন কোম্পানির ছয়তলা একটা দালানে আস্তরের কাজ করছিলেন। হঠাৎ রশি ছিঁড়ে গেলে তিনি আর আরেক সহকর্মী পড়ে যান। সহকর্মীরা তাঁকে ধরে হাসপাতালে নিয়ে আসেন। প্রাথমিকভাবে স্যালাইন আর এক হাতে ব্যান্ডেজ করা হলেও রোগীর পাশে আর কেউ না থাকায় তাঁর দিকে হাসপাতালের সেবিকা বা অন্য কর্মীরা কেউ ফিরেও তাকাচ্ছেন না। স্বপন প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা দুজন রশি ছিঁড়ে পড়ে গেছি। আমাকে এখানে নিয়ে এসেছে। আরেকজনকে অন্য কোনো হাসপাতালে নিয়েছে কি না, তা আমি বলতে পারব না।’ তিনি আরও বলেন, অন্য শ্রমিকেরা তাঁকে এখানে নিয়ে এসেছেন। কিন্তু তাঁর সঙ্গে এখন কেউ নেই। স্বপনের আহাজারিতে হাসপাতালের অন্য রোগী ও তাঁদের স্বজনেরাও উদ্বিগ্ন। কিন্তু হাসপাতালের সেবক-সেবিকা ও কর্মীদের মাথাব্যথা নেই। স্বপনের হয়ে অন্য এক রোগীর স্বজন কামরুল ইসলাম একজন সেবিকার সঙ্গে কথা বলতে যান। তিনি বললেন, ‘রোগী আপনার কী হয়?’ কিছু হয় না শুনে তাঁকে বলা হলো, ‘আপনি এখান থেকে যান। ডাক্তার ওই রুমে আছে, আপনি ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলেন।’ পঙ্গু হাসপাতালে ঢোকা ও বের হওয়ার সময় স্ট্রেচার ও হুইলচেয়ার না পেয়ে ভোগান্তির শিকার হতে দেখা গেল অনেক রোগী ও স্বজনদের। ইউসুফ হোসেন নামের এক ব্যক্তি তাঁর বাবাকে নিয়ে হাসপাতালে এসেছেন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘এখানে স্ট্রেচার নেই, হুইলচেয়ার নেই। আমার বাবা হাঁটতে পারেন না। বাবাকে এক্স-রে করাতে নিয়ে গেছি নিজের কাঁধে করে।’ তিনি অভিযোগ করেন, ‘হাসপাতালের কর্মীদের টাকা না দিলে কোনো কাজ করতে চায় না।’ ১০-১২ বছরের শিশুকে কোলে করে হাসপাতাল থেকে বের হচ্ছেন বাবা। ‘স্ট্রেচার নেই, আপনি কেন নিয়ে আসছেন? হাসপাতালের লোক নেই?’ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আপনিও এ দেশের মানুষ, আমিও এ দেশের মানুষ। সবই তো বোঝেন, কী বলব আর।’ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে যে কয়টি স্ট্রেচার আর হুইলচেয়ার রয়েছে, তা নিয়েও টানাটানি করছেন কয়েকজন। তাঁদের মধ্যে কয়েকজন পুরুষ ও কয়েকজন নারী। হাসপাতালে তাঁরা দালাল নামে পরিচিত। টাকা দিলে সব কাজই করে দেন। টাকা ছাড়া মেলে না স্ট্রেচার ও হুইলচেয়ার। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক হাসপাতালের এক কর্মী প্রথম আলোকে বলেন, স্ট্রেচার আর হুইলচেয়ার নিয়ে যাঁরা টানাটানি করছেন, তাঁরা কেউ হাসপাতালের লোক নন। তাঁরা এগুলো নিজেদের দখলে রাখে। টাকার বিনিময়ে রোগীদের এসব নিতে হয়। পরিচিত কেউ থাকলে ভোগান্তি কিছু কম হয় বলে জানালেন গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলার চাকরিজীবী ফারুক হাওলাদার। বাইক দুর্ঘটনায় তাঁর পা ভেঙেছে। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমার সঙ্গে লোক আছে, হাসপাতালে পরিচিত লোকও আছে। এ কারণে তেমন সমস্যা হয়নি। কিন্তু যাদের হাসপাতালে পরিচিত কেউ নেই, তাদের সেবা পেতে অনেক ভোগান্তি পোহাতে হয়।’ হাসপাতালের জরুরি বিভাগের ইনচার্জ আঁখির কাছে এসব সমস্যার বিষয়ে জানতে চাইলে রোববার বলেন, ‘আমরা ডাক্তার বলার আগেই সবকিছু ব্যবস্থা করে দিই। কোনো অবহেলা করি না।’ তিনি আরও বলেন, টানা তিন দিন সরকারি ছুটি (বৃহস্পতি, শুক্র, শনি) ছিল। রোগী অনেক বেড়ে গেছে। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকেরা সবাই আসছেন না। তাই রোগীদের রিলিজ করা যায়নি। অন্য ডাক্তারেরা রোগীদের রিলিজ দিতে ভয় পান। অনেকগুলো স্ট্রেচার ও হুইলচেয়ার ওয়ার্ডে আটকা পড়ে আছে। তাই রোগী আনা-নেওয়া করার জন্য স্ট্রেচার ও হুইলচেয়ারের সংকট হচ্ছে। এ ব্যাপারে হাসপাতালের যুগ্ম পরিচালক মোহাম্মদ গোলাম মোস্তফা বলেন, ‘অনেক সমস্যা আছে। তবে আমি নতুন এসেছি, তাই এখনই কিছু বলতে পারব না।’

No comments:

Post a Comment