Monday, April 18, 2016

‘শঙ্খচিল’: সীমান্তের বাস্তবতার ছবি by এম সাখাওয়াত হোসেন

শঙ্খচিল চলচ্চিত্রের একটি দৃশ্য
এবারের পয়লা বৈশাখে, বাংলা নববর্ষের দিনে, বাংলাদেশ ও ভারতের যৌথ প্রযোজনায় বাংলার সুখ্যাত পরিচালক গৌতম ঘোষের পরিচালনায় নির্মিত ছায়াছবি শঙ্খচিল একই সঙ্গে বাংলাদেশে ও পশ্চিমবঙ্গে মুক্তি পেয়েছে। এর আগেই ৩৬তম ভারতীয় জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছে শ্রেষ্ঠ বাংলা ছবি হিসেবে। ছবিটি নির্মিত হয়েছে একটি সত্য ঘটনার ওপর নির্ভর করে। ঘটনাটি বাংলাদেশের সীমান্তে বসবাসরত এবং সীমান্ত অঞ্চলের একটি স্কুলের শিক্ষক ও তাঁর পরিবারকে ঘিরে। ছবিটির গল্পের প্রেক্ষাপট সীমান্তে বসবাসরত মানুষের সুখ-দুঃখ আর অনুভূতির সঙ্গে ভারত-বাংলাদেশ কঠিন বাস্তবতার সম্মুখীন এক সীমান্ত পরিবারের তৃতীয় সদস্য কিশোরী কন্যার জীবন বাঁচানোর লড়াই। এ দুই দেশের সীমান্ত ক্রমে এতই কঠিন হয়ে উঠেছে যে সেখানে অহরহ প্রাণ দিতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে আর ফেলানীর মতো কিশোরীকে। এসব হত্যার জন্য কে দায়ী, সেই প্রশ্ন গুরুত্বসহকারে তুলে ধরা হয়েছে এ ছবিতে। এ ছবি নির্মাণকালে ছবির অন্যতম প্রযোজক হাবিবুর রহমান, যিনি আমার বহু বছরের ঘনিষ্ঠ বন্ধু, আমাকে গল্পটি শুনিয়ে বাস্তবে সাতক্ষীরার সীমান্ত এলাকার দেবহাটায় চিত্রগ্রহণ করার ইচ্ছা প্রকাশ করে সহযোগিতা কামনা করেছিলেন। আমি ৩৭ বছর আগে প্রায় তিন বছর তৎকালীন বিডিআরের (বর্তমানে বিজিবি) সেক্টর কমান্ডার হিসেবে খুলনা সেক্টরে নিয়োজিত ছিলাম। সেই সুবাদে এবং বিজিবির সম্মতির পর মাঠপর্যায়ে কিছু কারিগরি সহায়তার জন্য ছবিটির অন্যতম প্রযোজকের অনুরোধে প্রায় দেড় মাস ওই সীমান্ত এলাকায় ছবিটির চিত্রগ্রহণ পর্বে উপস্থিত ছিলাম। ছবির পরিচালক বাংলার বিখ্যাত ব্যক্তিত্ব গৌতম ঘোষের সঙ্গে হাবিবের বদৌলতে পূর্বপরিচিত ছিলাম। পরিচয় হলো কলাকুশলীদের সঙ্গে। পরিচয় হলো ছবির অভিনেতা যিনি ছবিতে সীমান্তবর্তী ছোট পরিবারের কর্ণধার এবং একজন স্কুলশিক্ষক বাদলরূপী বিখ্যাত অভিনেতা প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে। প্রায় দেড় মাস যাবৎ আমার পক্ষে যতটুকু সম্ভব হয়েছে মাঠপর্যায়ে বিজিবির সঙ্গে সমন্বয় করে বিশেষায়িত পরামর্শ দিয়েছি। এমন একটি চলচ্চিত্রের সঙ্গে যুক্ত থেকে সীমান্তের যে জটিলতা ৩৭ বছর আগে তেমন উপলব্ধি করিনি, তা কয়েক যুগ পর উপলব্ধি করতে পেরেছি। আমার কাছে এ এক বিরাট অভিজ্ঞতা, একটি বাস্তবধর্মী ছবির প্রেক্ষাপটের সঙ্গে যুক্ত থাকা। এই দেড় মাসে আমি ফিরে গিয়েছি প্রায় ৩৭ বছর আগের জীবনে। ওই সীমান্ত এলাকায় আমি আমার জীবনের বহু বিনিদ্র রজনী কাটিয়েছিলাম। তখনকার আর এখনকার মধ্যে সীমান্ত এলাকার মানুষের জীবন ধারণের চিত্রে বেশ কিছু পরিবর্তন হয়েছে। একসময় ওই এলাকায় যথেষ্ট অভাব ছিল, এখন সেই অভাবের জর্জরিত চিত্রে কিছু পরিবর্তন ঘটলেও যেমনটা আশা করা গিয়েছিল তেমনটা হয়নি সীমান্তবর্তী মানুষগুলোর জীবনযাত্রায়। সীমান্ত তখন এতটা কঠিন ছিল না, যতটা এখন করা হয়েছে। তখন কাঁটাতারের বেড়া ছিল না, এখন হয়েছে। একটি বিভাজিত বাঙালি বলে পরিচিত জাতিকে আরও কঠিনতর মুখে ঠেলে দিয়েছে বর্তমানের এই কঠিন সীমান্ত। যখন বিশ্ব সীমান্ত শিথিলতার প্রশ্নে সোচ্চার, তখন ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত দারুণ জটিল করে তোলা হয়েছে। ভবিষ্যতে আরও জটিল হতে যাচ্ছে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত। শঙ্খচিল ছবি এমনই প্রেক্ষাপটে নির্মিত এবং গল্পটি এ প্রেক্ষাপটের আবর্তেই রচিত। ছবিটিতে প্রশ্ন তোলা হয়েছে বিশ্বের সবচেয়ে ‘আজব’ এই সীমান্তরেখা নিয়ে, যেখানে বিভাজনরেখা সৃষ্টি শুধু দুটি ধর্মের আধারেই হয়নি, বহু স্থানে বিভাজিত হয়েছে একই পরিবার, গ্রাম এমনকি বাড়ি পর্যন্ত। পশ্চিম ও পূর্ব সীমান্তরেখা বিভাজন যেমন করেছে অনেক বসতবাড়ির শোয়ার ঘর আর রসুই, ঠিক তেমনি অনেক স্থানে বাড়ির আঙিনায় কাঁটাতার বিভাজিত করেছে একক অভিন্ন পরিবারকে। ছবিটিতে খুবই প্রাসঙ্গিকভাবে তুলে ধরা হয়েছে এই বিভাজিত মানুষগুলোর আকুতি আর এমনই বিভাজনের বাস্তবতা। ঐতিহাসিক থেকে শুরু করে আমাদের মতো সাধারণ মানুষ সাদামাটা দাগে মনে করেন, ১৯৪৭ সালে ভারত বিভাজন হয়েছে। বাস্তবে তা পুরো সত্য নয়। ১৯৪৭ সালের পরিবর্তিত ম্যাপ ও ইতিহাস থেকে প্রতীয়মান যে ভারতের দুটি অঞ্চলই মাত্র বিভাজিত হয়েছিল—পাঞ্জাব ও বাংলা। পাঞ্জাব ভাগের পর সাধারণ মানুষের বেদনার চিত্র বহুভাবে সাহিত্য আর চলচ্চিত্রে ফুটে উঠলেও তার বেশির ভাগই ছিল নির্মমতার চিত্র। কিন্তু পাঞ্জাবে একক শহর, গ্রাম বা বসতবাড়ির বিভাজন হয়নি, যেমন হয়েছে বাংলা ভাগের সময়ে স্যার মেরিল রেডক্লিফের পেনসিলের গুণে। যার বদৌলতে হিলির রেলওয়ে স্টেশন বর্তমান বাংলাদেশের হলেও প্রধান ফটক রয়েছে ভারতে। হিলি শহর ভারতীয় অংশে। এমন বহু উদাহরণ অবশ্যই দেওয়া যায়। ছবিতে যখন কাঁটাতার পার হতে গিয়ে কিশোরী ফেলানীর মতো আরও এক কিশোরকে ভারতীয় সীমান্তরক্ষীদের হাতে মরতে দেখানো হলো, তারপরে সাংবাদিকদের প্রশ্নের মুখে সীমান্তরক্ষা বাহিনী বিএসএফের আঞ্চলিক প্রধানের কাছে উত্থাপিত প্রশ্নের উত্তরে তিনি দুষলেন ইতিহাসকে, স্যার রেডক্লিফের অবিবেচক সীমান্ত ভাগকে। ওই চরিত্রের মুখ দিয়ে বলানো হলো যে এ হত্যার তদন্ত ও বিচার অবশ্যই হবে, তবে ওই কিশোরের মৃত্যুর দায় ইতিহাসের (ফেলানীর ওই ছবির সঙ্গে বহু মিল রেখেছেন পরিচালক) নির্মম বাস্তবতার, যার মানে এক অদ্ভুত অযৌক্তিক সীমান্তরেখা। এ দৃশ্যের প্রতীকীই পুরো ছবিটির গল্পে বারবার প্রতিফলিত হয়েছে। শঙ্খচিল ছবিটি পরিপূর্ণ বাঙালির ছবি। এ ছবির মাধ্যমে যে প্রশ্ন তোলা হয়েছে তার জবাব ছবির নির্মাতাদের বা পরিচালকের কাছে নেই বাংলা কেন ভাগ হলো এর উত্তর অবশ্য ছবিতে নেই, যেটা এই গল্পের মূল উদ্দেশ্য না হলেও সে প্রশ্ন থেকে যায়। তবে ঐতিহাসিক সত্য যে বাংলা ভাগ হয়েছে। ঐতিহাসিক সত্য যে বাঙালি যুদ্ধ করে বাংলাদেশ অর্জন করেছে, যা বর্তমানে বাংলা ভাষা, সংস্কৃতির এবং বাঙালি চেতনার ধারক-বাহক। বাঙালি বলতে বাংলাদেশিদেরই বিশ্বব্যাপী পরিচয়, যদিও খণ্ডিত বাঙালি জাতির অস্তিত্ব অপর পারেও রয়েছে। বাংলা ভাগ হয়েছে কিন্তু ভাগ হয়নি ভাষা, সংস্কৃতি আর মনের আকুতি ও ভাবাবেগ। যেমনটা আগেই বলেছি, শঙ্খচিল ছবিটি ইতিহাসের বাস্তবতাকে চ্যালেঞ্জ করেনি, কিন্তু তুলে ধরেছে বিভাজনের প্রেক্ষাপটে সীমান্ত মানুষগুলোর যন্ত্রণা আর আকুতি। সাতক্ষীরার দেবহাটা সীমান্তের বিভাজিত দুই পার, টাকি আর টাউন শ্রীপুরের মানুষের গল্প। যে গল্পের পেছনের দিকটি বেদনাদায়ক। ঘর–বাড়ি, ভিটা, আত্মীয়-কুটুম আর ঘনিষ্ঠদের ছেড়ে দুপারে বসবাসরত মানুষের অতীত স্মৃতিগুলো এখন যেন পরিত্যক্ত শ্মশান, যার উদাহরণ টাউন শ্রীপুরে জেনারেল শংকর রায় চৌধুরীর জমিদার পূর্বপুরুষদের এবং ডাক বিধান চন্দ্র রায়ের পূর্বপুরুষদের চিহ্ন পরিত্যক্ত জরাজীর্ণ বসতবাড়িগুলো। এ চিহ্নগুলো স্মৃতি ফিরিয়ে আনলে যন্ত্রণা দেয় এদের উত্তরসূরিদের। ছবির গল্পে বিভাজিত বাঙালি জাতির মর্মবেদনা ফুটিয়ে তুললেও বাস্তবে তাদের অনুপ্রবেশকারী হয়ে জেলে যেতে হয়, আর না হয় ফেলানীর মতো তারকাঁটার বেড়ায় লাশ হয়ে লটকে থাকতে হয়। এমন এক সাহসী দৃশ্য তুলে ধরা হয়েছে শঙ্খচিল-এ। প্রশ্নবিদ্ধ করেছে কঠিন সীমান্তের বাস্তবতাকে। আর সেই বাস্তবতা উপেক্ষা করে একমাত্র সন্তানের জীবন বাঁচাতে বাংলাদেশের মুনতাসির চৌধুরী বাদল মাস্টারকে মিথ্যার আশ্রয় নিতে হয়, চিহ্নিত হতে হয় অনুপ্রবেশকারী হিসেবে। এটাই বাস্তবতা। এ বাস্তবতাকে অস্বীকার করেনি এ ছবি বা ছবির গল্পবিন্যাস। শঙ্খচিল বাংলা বিভাজন, কঠিন বাস্তবতা আর ইতিহাসকে মেনে নিয়ে একই ভাষা, কৃষ্টি আর সংস্কৃতিভাবাপন্ন মানুষগুলোকে এক কাতারে দাঁড় করানোর চেষ্টা করেছে। বাঙালি পরিচয়কে প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছে। তবে ঐতিহাসিক ও বাস্তবতার নিরিখের গণ্ডিতে থেকে কীভাবে কত সহজে সীমান্তপারের মানুষগুলোর আবেগের মর্যাদা দেওয়া যায়, তেমন কোনো সহজ-সরল ফর্মুলা এ ছবি দেয়নি এবং দেওয়াও ছবির আঙ্গিক নয়। এখানেই ছবিটি বাস্তবধর্মী। এ ছবিতে আর একটি বিষয় বড় করে তুলে ধরা হয়েছে, যা ইতিপূর্বের কোনো বাংলা ছবিতে দেখেছি বলে মনে পড়ে না। তা হলো ইউনিফর্মে থাকা সীমান্তরক্ষীদের ভেতরের মানবিক দিক; তবে তা সব সময় প্রকাশ করা সম্ভব হয় না বা অনেকে বিভিন্ন কারণে করতেও পারে না। আমাদের দেশের আন্তসীমান্ত সমস্যার মূলে রয়েছে যাঁরা অপর পারে নিয়োজিত হন তাঁদের সিংহভাগের সংস্কৃতি ও ভাষাগত তফাত। এ বিষয়টিও ছবিতে দক্ষতার সঙ্গে ফুটিয়ে তুলেছেন পরিচালক। শঙ্খচিল ছবিটি পরিপূর্ণ বাঙালির ছবি। এ ছবির মাধ্যমে যে প্রশ্ন তোলা হয়েছে, তার জবাব ছবির নির্মাতাদের বা পরিচালকের কাছে নেই। সেই উত্তর রয়েছে উভয় দেশের রাজনীতিবিদদের কাছে, বিশেষ করে ভারতের নীতিনির্ধারকদের কাছে। এ সীমান্ত আর সহজ হবে না বরং আরও কঠিন করে তোলা হবে আশঙ্কা রয়েছে, যার কারণে মৃত্যু হবে আরও অনেক ফেলানী অথবা ছবিতে চিত্রায়িত কিশোরের এবং অনুপ্রবেশের দায়ে জেলে যেতে হবে অসহায় বাদল মাস্টার ও তাঁর স্ত্রী লায়লাকে। এম সাখাওয়াত হোসেন: অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল, সাবেক নির্বাচন কমিশনার ও কলাম লেখক৷
hhintlbd@yahoo.com

No comments:

Post a Comment