Tuesday, April 5, 2016

তিনি আমাদেরই লোক by জাহীদ রেজা নূর

ছায়ানটের সভাপতি সন্‌জীদা খাতুনের ৮৪তম জন্মদিনে বাবা
কাজী মোতাহার হোসেনের ছবির সামনে দাঁড়ালেন তিন বোন
মাহমুদা খাতুন(বাঁ থেকে),সন্‌জীদা খাতুন ও ফাহ্‌মিদা খাতুন
‘মিনু আপা, আপনি কি কোনো এপ্রিলের ৪ তারিখে এ রকম ঝুম বৃষ্টি দেখেছেন?’ একজন প্রশ্ন করলেন সন্জীদা খাতুনকে, মিনু যাঁর ডাক নাম—সোমবার ছিল তাঁর ৮৪তম জন্মদিন। তখন ‘মনে হলো যেন পেরিয়ে এলেম অন্তবিহীন পথ’ গানটি কেবল শেষ হয়েছে। স্মৃতি হাতড়ে সন্জীদা খাতুন বললেন, ‘না মনে হয়।’ চৈত্রের এই সময়টায় রোদই বাড়ে কেবল, আকাশে থাকে জ্বলজ্বলে সূর্য। অথচ এ বছর এই দিনটিতে সকাল থেকেই মেঘের আনাগোনা। ঝেরা ঝেরা মুখর বাদরদিন। সকাল আটটা থেকেই গুণমুগ্ধ মানুষ যাচ্ছেন তাঁর কাছে, তাঁর ধানমন্ডির বাড়িতে, জন্মদিনের শ্রদ্ধা জানাতে। এদিন আর কিছু নয়, শুধু গান আর কবিতা। একজনের পর একজন হারমোনিয়ামের কাছে যান, গান শোনান। তারপর আরেকজন। বসার ঘরের সোফাগুলো চলে এসেছে ঘরের এক প্রান্তে। সেখানেই বসেছেন তিনি। সামনে গোল হয়ে বসেছেন অভ্যাগতরা। ‘তুমি আমায় যবে জাগাও গুণী’ গানটি গাইলেন একজন। সন্জীদা খাতুন বললেন, ‘তোমার কণ্ঠে রবীন্দ্রসংগীতও তো ভালো হয়। গাও না একটা।’ ‘আমার এ পথ গেছে বেঁকে’ গানটি করল সেই মেয়েটা। গান শেষে সন্জীদা খাতুন বললেন, ‘তোমরাই বলো, রবীন্দ্রসংগীতটা ওর বেশি ভালো না?’ এরপর একজন যখন ‘আকাশ ভরা সূর্য তারা’ গানটি ধরল, তখন অন্যরাও কণ্ঠ মেলাল। যাঁকে নিয়ে এই আয়োজন, তিনি আঙুলে তাল ঠুকতে লাগলেন। এর মধ্যে একবার রসভঙ্গ হতে হতেও হলো না। ছবি তোলা শখ, এমন একজন সংস্কৃতিকর্মী সাহস করে গাইলেন একটি গান ‘দয়া দিয়ে হবে’। ‘তুমি তালে ফেল’—রায় দিলেন সন্জীদা খাতুন। ‘একেবারে শেষ করার তালে থাকো কেন? গলা তো ভালো!’ এরই মধ্যে বাংলাদেশ বেতারে আবৃত্তি করেন, এমন দুজন হাজির হন। সঙ্গে কণ্ঠশীলনের একজন। তিনজনে মিলে রবীন্দ্রনাথের কবিতা আবৃত্তি করেন তাঁরা। মুহূর্তে পাল্টে যায় পরিবেশ। এরপর আবার গান। সকাল ক্রমে দুপুরের দিকে যেতে থাকে। যে যার মতো টেবিলে থাকা লুচি, ভাজি, ডাল, সন্দেশ, মিষ্টিতে ভাগ বসায়। রান্নাঘর থেকে মাঝে মাঝে কেউ একজন বলে ওঠেন, ‘আরও লুচি ভাজব?’ দুপুর ১২টার দিকে ঘটে আরেক ঘটনা। দরজা খুলে যায়। ঘরে ঢোকেন দুই বর্ষীয়সী নারী। সন্জীদা খাতুনের দুই সহোদরা। ফাহমিদা খাতুন ও মাহমুদা খাতুন। তিন বোনের কথোপকথনে আয়োজনটি অন্য মাত্রা পায়। তিনজনকে তাঁদের বাবার প্রতিকৃতির সামনে দাঁড় করিয়ে আমরা ছবি তুলি। মাহমুদা খাতুন হেসে বলেন, ‘তিন বোনের মধ্যে আমি সবার ছোট। কিন্তু আমারই সব চুল পেকে গেছে!’ একটু অবসর পেয়ে সন্জীদা খাতুনকে বলি, ‘শঙ্খ ঘোষের যখন ছিয়াত্তর, তখন তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, এই বয়সে কেমন লাগে? তিনি উত্তর দিয়েছিলেন, এখন নিজেকে অনেক বাচ্চা বাচ্চা লাগে। আপনার কেমন লাগে?’ শঙ্খ ঘোষের উত্তরটি শুনে হাসলেন তিনি। তবে উত্তর দিলেন একেবারে অন্য রকম, ‘আমি ভাবি যে আমার কিছু কাজ আছে, যা শেষ করে যেতে হবে। চেষ্টা করি কাজ করতে। নানা রকম অসুখবিসুখও হয়।’ ‘সব সময় শুনে এসেছি আপনি রাশভারি। আপনার কাছে এলে সবাই ভয়ে ভয়ে থাকে। কিন্তু আমি যখন থেকে আপনার কাছাকাছি হয়েছি, আমার তো সে রকম মনে হয়নি।’ ‘একেবারেই নয়। আমি এ রকমই। মানুষ আমাকে দূর থেকে ভয় পায়। কাছে এলে ভয় পায় না।’ রবীন্দ্রনাথের ‘পরিচয়’ কবিতাটি এ সময় আবৃত্তি করেন একজন। শেষ হলে সন্জীদা খাতুন বলেন, ‘এটা ভারি সুন্দর কবিতা।’ সুন্দর তো বটেই। এ কবিতার শেষ দিকেই তো আছে সেই অবিস্মরণীয় পঙ্ক্তি দুটি, ‘মোর নাম এই বলে খ্যাত হোক, আমি তোমাদেরই লোক’। সন্জীদা খাতুন। আপনি শুধু ছায়ানটেরই নন, আপনি আমাদের সবার। জন্মদিনে সকলের ভালোবাসায় আপনি সিক্ত হচ্ছেন, এ আমাদেরই গর্ব।

No comments:

Post a Comment