![]() |
| ফাত্তাহ-উল-আলম |
ফাত্তাহদের
মিরপুরের বাড়িটায় পা ফেলার জায়গা নেই। ফাত্তাহর মা ফাতেমা খাতুন বৈঠকখানায়
অপেক্ষা করছেন। তাঁর সব অপেক্ষার যেন সমাপ্তি হবে দরজার কাছে লাশের গাড়িটা
এসে পৌঁছালে। গতকাল সোমবার সকাল ১০টায় ফাত্তাহর লাশ বান্দরবান থেকে রওনা
দিয়েছে। এরপর থেকে ফাতেমা খাতুনের ক্ষণ গণনার শুরু একমাত্র ছেলের লাশের
জন্য। শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজের শেষ বর্ষের ছাত্র ফাত্তাহ-উল-আলম
৩০ মার্চ বান্দরবানে বেড়াতে গিয়েছিলেন। ৩ এপ্রিল সকালে ফোনে মাকে
জানিয়েছিলেন, সেদিনই বাড়ি ফিরবেন। বাড়ি এসে মায়ের সঙ্গে খাবেন। সময় তাঁকে
সেই সুযোগ দেয়নি। দুপুরবেলায় খবর আসে, ফাত্তাহ আর নেই। বান্দরবানের রুমা
উপজেলার বগা লেকে গোসল করতে নেমে ডুবে গিয়েছিলেন। রুমার স্বাস্থ্য
কমপ্লেক্সে যখন নেওয়া হলো, তখন তিনি মৃত। গতকাল রাত আটটায় ফাত্তাহর লাশ এসে
পৌঁছায়। তাঁর চিকিৎসক বোন শাহলীনা লিনা যুক্তরাষ্ট্র থেকে ঢাকায় এলে
দাফনের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত হবে বলে জানা গেছে। ফাত্তাহ যেই ঘরটিতে থাকতেন,
গতকাল সেখানে বসেই কথা হয় তাঁর মা ও আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে। ফাত্তাহর পড়ার
টেবিলে এমবিবিএস কোর্সের বই, কোনোটি মেডিসিনের, কোনোটি শল্যচিকিৎসার,
বিছানায় প্রেশার মেশিন। কাচের আলমারিতে থরে থরে সাজানো বই—তিন গোয়েন্দা,
কাকাবাবু সমগ্র, ড্যান ব্রাউনের দ্য ভিঞ্চি কোড, বেশ কিছু বিজ্ঞান সাময়িকী,
শ খানেক সিনেমার সিডি। দেখে মনে হচ্ছিল, এ বাড়ির ছেলেটি একটু বাইরে
বেরিয়েছে, এক্ষুনি ফিরবে। ফাতেমা খাতুন বলছিলেন, দুটি মেয়ের পর তাঁর ওই
একটিই ছেলে। তাঁর পরম বন্ধু। মেধাবী বলে সুনাম ছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়,
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজ—যেখানেই পরীক্ষা দিয়েছে,
সেখানেই ভর্তির সুযোগ পেয়েছিল। নিজের পছন্দে ডাক্তারি পড়েছে। একটাই সমস্যা,
ছেলে বড় ছটফটে। কিছুতেই ঘরে রাখতে পারতেন না মা। দু-এক দিনের ছুটি মিললেই
ছেলে এদিক-সেদিক ছুট দিত। ফিরে এসে অবশ্য খুঁটিনাটি সব গল্প করত। মা-ঘেঁষা
ছেলে। টেবিলে বসে পড়ত, মাকে পাশেই বিছানায় শুয়ে থাকতে হতো। কথাবার্তার
ফাঁকে বললেন, ‘রোববার সকালে ফোন করেছিল। বলল আজই রওনা দিব। আমি রান্নাও
করেছি। দুপুরের দিকে শুনি...।’ এটুকু বলে কথা আটকে যায় ফাতেমা খাতুনের।
কনুইয়ে মাথা ঠেকিয়ে কাঁদতে শুরু করেন তিনি। ৩ এপ্রিল দুপুরে ফাত্তাহর বন্ধু
ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থী ফজলে রাব্বী শহীদ সোহরাওয়ার্দী
মেডিকেল কলেজ কর্তৃপক্ষকে মৃত্যুসংবাদ দেন। কলেজ কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে খবর
শুনে ছেলের জন্য বান্দরবানে রওনা দেন বাবা, সঙ্গে ছেলের দুই বন্ধু। এঁদের
একজন রমেশ পত্তনদার। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, ‘আঙ্কেল নিজের চোখে ফাত্তাহর
লাশ দেখার আগে বিশ্বাস করেননি ও নেই।’ ফাত্তাহ নিজের সম্পর্কে ফেসবুকে
লিখেছেন, তাঁর নামের অর্থ বিশ্বজয়ী। লিখেছেন, বিশ্বজয়ে কেউ সঙ্গী না হলে
একাই চলবেন। স্বজনেরা জানালেন, হয়তো তাই সে সবাইকে ছেড়ে একাই চলে গেল।

No comments:
Post a Comment