Thursday, April 28, 2016

উপেক্ষিত মেধা ও তারুণ্য by আলী ইমাম মজুমদার

অনেক ধরনের অসংগতি নিয়ে চলছে বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসের (বিসিএস) নিয়োগ পর্ব। ফলে ধাপে ধাপে নাকাল হচ্ছেন নিয়োগপ্রার্থীরা। মেধাবীদের এক পাশে ঠেলে প্রাধিকার কোটার আধিক্য দশকের পর দশক চলতে থাকা একই ব্যাচের কর্মকর্তাদের মাঝে মেধা ও বয়সের ব্যাপক পার্থক্য সৃষ্টি করেছে। অনিয়মিত নিয়োগ আর তা চূড়ান্তকরণে দীর্ঘ প্রক্রিয়াসহ অনেক কারণ রয়েছে এর পেছনে। সংবিধানে পশ্চাৎপদ জনগোষ্ঠী ও অঞ্চলের জন্য কোটা সংরক্ষণের বিধান রয়েছে। তবে এর আওতায় পড়ে না এমন কোটাও রয়েছে। আর তা রয়েছে মাত্রাতিরিক্ত হারেই। ফলে প্রাধিকার কোটার আওতায় চলে গেছে ৫৫ শতাংশ চাকরি। মেধা কোটায় রইল ৪৫ শতাংশ। ফলে প্রায় সব ক্যাডারেই একই ব্যাচের কর্মকর্তাদের মেধা অসম মানের হওয়াই স্বাভাবিক। এটা প্রত্যাশিত না হলেও তা-ই হচ্ছে। ফলে দেশে সিভিল সার্ভিসগুলোর মান ক্রমাগতভাবে হ্রাস পাওয়ার অভিযোগ আসছে। উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকেও এমন অভিযোগ আসছে। এর মানোন্নয়নের জন্য বিভিন্ন প্রশিক্ষণ কর্মসূচিও নেওয়া হচ্ছে। তবে এতে খুব একটা কাজ দিচ্ছে এমনটাও মনে হচ্ছে না। নিয়োগ পর্বেই কম মেধাবীদের সংরক্ষিত কোটায় প্রবেশের বড় ধরনের সুযোগ ব্যবস্থাটাকে পর্যুদস্ত করে ফেলছে। মেধাকে প্রাধান্য দিয়ে সরকার কোটা ব্যবস্থাকে যৌক্তিক করতে অঙ্গীকারবদ্ধ। এ অঙ্গীকার জাতীয় শুদ্ধাচার কৌশলেও প্রতিফলিত হয়েছে। তবে এর বাস্তবায়নের তেমন প্রচেষ্টা দৃশ্যমান নয়। উপমহাদেশের তিনটি দেশেই ক্যাডার সার্ভিসের একটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে একই ব্যাচের কর্মকর্তারা মোটামুটি কাছাকাছি বয়সের হয়ে থাকে। আমাদেরও ছিল। তবে এখন ক্রমান্বয়ে বয়সের ব্যবধান বেড়ে চলছে। এর কারণও অনেক। ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (আইজিএস) এ বিষয়ে ২০১০ সালের জানুয়ারি মাসে একটি জরিপ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এতে দেখা যায়, পাকিস্তান আমলে সিভিল সার্ভিসে নিয়োগকৃত ৫৭ শতাংশের বয়স ছিল ২১ থেকে ২৩-এর মধ্যে। আর ২৪ থেকে ২৫-এর মধ্যে ছিল অবশিষ্ট ৪৩ শতাংশ। কিন্তু বাংলাদেশ আমলে কয়েকটি বিসিএস (১৫, ১৭ ও ১৯তম) পরীক্ষার মাধ্যমে নিয়োগকৃতদের ওপর জরিপে দেখা গেছে, ২১ থেকে ২৩ বছর বয়সী কর্মকর্তার সংখ্যা ২ শতাংশ, ২৪ থেকে ২৭-এ আছে ৫৪ শতাংশ, ২৮ থেকে ৩০-এর ঘরে ৩৩ শতাংশ আর ৩০ ঊর্ধ্ব ১১ শতাংশ। তাহলে দেখা গেল, এখানে ২১ থেকে ৩০ ঊর্ধ্ব কর্মকর্তাদের সমাবেশ ঘটে চলছে। এতে ক্যাডার সার্ভিসের অত্যন্ত প্রয়োজনীয় একটি বৈশিষ্ট্য ‘এসপিরিট ডি কোর’ চেতনায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলার কথা। ফলে ঈপ্সিত ভূমিকা পালনে সিভিল সার্ভিসের সক্ষমতাও হ্রাস পাওয়া স্বাভাবিক।
এ অবস্থাটি কিন্তু এক দিনে সৃষ্টি হয়নি। স্বাধীনতার পর থেকে বিভিন্ন ব্যাচে নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি দেওয়া থেকে শুরু করে চাকরি পাওয়ার বিষয়টি কোনো সময়সূচি মেনে চলছে না। আগে চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা ছিল ২১ থেকে ২৫ বছর। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে বিশেষ পরিপ্রেক্ষিতে ঊর্ধ্বসীমা ২৭ বছর করা হয়। এরপর বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সেশনজটসহ আরও কিছু বিষয় বিবেচনায় নিয়ে ১৯৯০ সালে তা করা হয় ৩০ বছর। আর মুক্তিযোদ্ধাদের পোষ্যসহ অন্য কিছু প্রাধিকারধারী প্রার্থীর জন্য তা এখন ৩২ বছর। ফলে আবেদনের সময়েই প্রার্থীদের বয়সের পার্থক্য থাকছে। অন্য দিকটি হচ্ছে আবেদন করামাত্রই চাকরিতে নিয়োগ হয় না। হওয়ার কথাও নয়। মোটামুটি একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়া পার হতে হয় সব সময়ই। একই সিভিল সার্ভিসের উত্তরাধিকারী উপমহাদেশের অন্য দুটো দেশেও সে প্রক্রিয়া সহজ নয়। তা সত্ত্বেও আমাদের এখানে এটা হয়ে পড়েছে অস্বাভাবিক দীর্ঘ আর অনেকটা অনিশ্চিত। হাল আমলের কয়েকটি বিসিএস পরীক্ষার নিয়োগ প্রক্রিয়া পর্যালোচনা করলে বিষয়টি স্পষ্ট হবে। ২০১৩ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি বিজ্ঞাপিত ৩৪তম বিসিএসের ফল ২৯ আগস্ট ২০১৫ সালে প্রকাশ করে সরকারি কর্মকমিশন (পিএসসি)। প্রায় আড়াই বছর সময় নিয়েছে এ প্রক্রিয়া। এরপর পুলিশি প্রতিবেদন ও স্বাস্থ্য পরীক্ষার বিষয় থাকে। জোর প্রচেষ্টা নেওয়া হলে দু-তিন মাসে তা করা যায়। ২৭তম বিসিএসে তা-ই হয়েছিল। কিন্তু ফল প্রকাশের পরও ৩৪তম বিসিএসের সুপারিশকৃতরা আজ অবধি নিয়োগ পাননি। এঁদের সহসা চাকরি হলেও আবেদনের পর সাড়ে তিন বছর সময় লাগল। ৩৫তম ও ৩৬তম বিসিএস বিজ্ঞাপিত হয় যথাক্রমে ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৪ ও ৩১ মে ২০১৫-এ। ৩৫তম-এর মৌখিক পরীক্ষার পর্ব সমাপ্ত। পিএসসি সহসাই পরীক্ষার ফলাফল ঘোষণা করতে পারে বলে জানা যায়। এতেও তারা দুই বছর সময় নিল। আর ৩৬তম-এর এক বছর সময়কালে শুধু প্রিলিমিনারি পরীক্ষা হয়েছে। লিখিত পরীক্ষার প্রস্তুতি চলছে। ৩৭তম-এর জন্য জারি করা হয়েছে বিজ্ঞপ্তি। আবেদন গ্রহণ করার শেষ তারিখ ২ মে। পাশাপাশি ভারতের ইউনিয়ন পাবলিক সার্ভিস কমিশন পরিচালিত সিভিল সার্ভিস পরীক্ষা গ্রহণ ও চাকরিতে নিয়োগের সময় পর্যন্ত দেখা যায় তারা প্রতিবছর নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দেয় মে মাসে। কয়েক লাখ প্রার্থী আবেদন করেন। আগস্টে হয় প্রিলিমিনারি পরীক্ষা। ফলাফল ঘোষণা অক্টোবরে। আর লিখিত পরীক্ষার জন্য মনোনীত হন শূন্য পদের ১১ থেকে ১২ গুণ প্রার্থী। ডিসেম্বরে হয় লিখিত পরীক্ষা। যার ফল প্রকাশ পরবর্তী মার্চে। শূন্য পদের শুধু দ্বিগুণসংখ্যক পরীক্ষার্থী মৌখিক পরীক্ষায় অংশ নিতে পারেন। আর সে পরীক্ষা হয় এপ্রিলে। মে মাসে চূড়ান্ত ফল প্রকাশ। নিয়োগের অবশিষ্ট প্রক্রিয়াও শুরু হয় দ্রুত। নবনিযুক্ত ভারতীয় প্রশাসনিক সার্ভিস (আইএএস) কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ শুরু হয় প্রতিবছরের সেপ্টেম্বর মাসের প্রথম সোমবার।
পাকিস্তানে এসব বিষয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা অনেক হলেও গুণগত মান হ্রাস পায়নি। প্রিলিমিনারি পরীক্ষা সেখানে নেই। প্রতিবছর নিয়মিত পরীক্ষা হয়। লিখিত পরীক্ষা ফেব্রুয়ারিতে। সাধারণত ১০ শতাংশ প্রার্থীকে মৌখিক পরীক্ষার জন্য ডাকা হয়। অবশ্য সেখানে নিয়োগ পর্ব পর্যন্ত যেতে ক্ষেত্রবিশেষে দেড় বছর সময় লেগে যায়—এমনটা দেখা যাচ্ছে।
তারা পারলে আমরা পারছি না কেন, এ প্রশ্নের জবাব কি কেউ দেবেন? সবারই জানা। কিন্তু প্রতিকারের জোরালো কোনো উদ্যোগ নজরে আসছে না। আমরা ভেবে দেখছি না ৩৫তম বিসিএসে যাঁরা চাকরি পাবেন না, তাঁরা আবার বিসিএস দেওয়ার বয়স পাবেন কি না। কেউ হয়তো এ পরীক্ষার পাশাপাশি ৩৬ ও ৩৭তম পরীক্ষাতেও প্রচেষ্টা চালাচ্ছেন। তবে সে প্রচেষ্টাগুলো খুবই পরিশ্রম ও সময়সাধ্য। এ ধরনের ধৈর্য রাখাই বা কতটা সম্ভব। অথচ কোনো বছরের পরীক্ষার ওপর সে বছরে চাকরির নিষ্পত্তি হয়ে গেলে যাঁরা বাদ পড়বেন, তাঁদের আবার চেষ্টা করার সুযোগ থাকবে। এখানে তাঁদের ভাগ্যকে ঝুলিয়ে রেখে আমরা করছি অবিচার। অন্যদিকে রাষ্ট্র তার সিভিল সার্ভিসে তারুণ্যকে যথাসময়ে টেনে আনতে সক্ষম হচ্ছে না। তারুণ্যের এ অপচয়ের দায় আমাদের।
সিভিল সার্ভিসের ক্ষেত্রে উপমহাদেশের অন্য দুটো দেশের নজির তুলে ধরা হলো। আমাদের দেশেরই অপর একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান সেনাবাহিনীর বিষয়টিও এখানে আলোচনায় আসতে পারে। তাদের কমিশন্ড অফিসারদের ক্যাডেট হিসেবে নিয়োগকালে বয়স হবে ১৭ থেকে ২১। নিয়মিত সে নিয়োগ প্রক্রিয়া, প্রশিক্ষণসূচি ও কমিশন্ড লাভ পর্ব চলছে। নেই কোনো কোটা পদ্ধতি। মেধা আর যোগ্যতাই নির্বাচনের একমাত্র মাপকাঠি। কাউকে সংরক্ষণ দেওয়ার কোনো ব্যবস্থাও নেই। আর থাকবেই বা কেন? না থাকাই তো সংগত ও যৌক্তিক।
সিভিল সার্ভিসে উত্তরাধিকার সূত্রে আমরা কোটা পদ্ধতি পেয়েছি—এটা সত্য। তবে এ বিষয়ে সংবিধানের প্রণেতারা সচেতনভাবেই তা শুধু সমাজের অনগ্রসর জনগোষ্ঠী ও অঞ্চলের জন্য সীমাবদ্ধ রেখেছিলেন। অন্য কারও জন্য নয়। আর বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠা কিন্তু ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার উদ্দেশ্য নিয়েই। তবে এ বিষয়ে আবেগের বিষয়টিও আমাদের বিবেচনায় রাখতে হয়। আর সেটা কী পরিমাণে আর কতকাল—ভেবে দেখার সময় এসেছে। তা ছাড়া প্রতিবছর নিয়মিত নিয়োগ দেওয়ার ব্যবস্থাও তো চালু করা অসম্ভব হবে না। দুটো পিএসসি করার প্রস্তাবও কোথাও ঠেকে আছে। বিশেষায়িত ক্যাডারগুলোকে একটির আওতায় দিলে অপরটি সাধারণ ক্যাডারগুলোতে নিয়োগ ও অন্যান্য বিষয়াবলি দেখতে পারে। এতে পরিস্থিতির উন্নতি হওয়ার যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে। চাকরিপ্রার্থীরা আর কতকাল এভাবে নাকাল হবেন এবং জাতি বঞ্চিত হবে মেধাবী ও তারুণ্যের সেবা থেকে?
আলী ইমাম মজুমদার: সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব।
majumder234@yahoo.com

No comments:

Post a Comment