![]() |
| আনাতোলে কালেৎস্কি |
ইউরোপীয়
ইউনিয়ন ভেঙে পড়তে শুরু করেছে, এখন তার নেতৃত্ব দেবে কে? জার্মান
চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা ম্যার্কেলকে সবাই কৃতিত্ব দেন এ কারণে যে তিনি
পশ্চিমা মিত্রদের নিয়ে হেনরি কিসিঞ্জারের এক বিখ্যাত প্রশ্নের উত্তর
দিয়েছিলেন, ‘ইউরোপের ফোন নম্বরটা কত?’ কিন্তু ইউরোপের ফোন নম্বরে যদি
জার্মান ডায়ালিং কোড থাকে, তাহলে ফোন করলেই সরাসরি এক স্বয়ংক্রিয় উত্তর
শোনা যায়, ‘নিয়েন জু আলেম’। এই শব্দবন্ধের অর্থ হলো ‘সবকিছুতেই না’। কথা
হচ্ছে, ইউরোপিয়ান সেন্ট্রাল ব্যাংকের (ইসিবি) প্রেসিডেন্ট সম্প্রতি বলেছেন,
ইউরোপের ঐক্য সংহত করার জন্য উদ্যোগ নেওয়া হলেই জার্মানি ইদানীং এভাবে
উত্তর দেয়। এর একটি ধ্রুপদি উদাহরণ দেওয়া যাক। ইতালীয় প্রধানমন্ত্রী মাতেও
রেনজি ইউরোপ, উত্তর আফ্রিকা ও তুরস্কের শরণার্থী কর্মসূচিতে তহবিল দেওয়ার
প্রস্তাব দিলে ম্যার্কেল তাতে ভেটো দেন। প্রস্তাবটি ছিল ইইউ বন্ড ছেড়ে এই
সহায়তা দেওয়া হোক, জর্জ সরোসের মতো প্রধান সারির অর্থদাতারা এই সাশ্রয়ী
প্রস্তাব দিয়েছিলেন। ম্যার্কেল যে এভাবে কারও তোয়াক্কা না করে ইউরোপের
স্বার্থ বিবেচনা করতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছেন, তাতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের অন্য
নেতারা দুঃস্বপ্ন দেখা শুরু করেছেন। এমনকি এতে ম্যার্কেলের অভ্যন্তরীণ
জনপ্রিয়তা ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কা থাকলেও তিনি তা গায়ে মাখাচ্ছেন না। এই
প্রত্যাখ্যানের মধ্য দিয়ে শুধু তাঁর অর্থনৈতিক ও অভিবাসন নীতিই জোরালো
হচ্ছে না, একই সঙ্গে তাঁর গ্রিসকে চাপ প্রয়োগের কৌশলও শক্তিশালী হচ্ছে।
কয়লায় ভর্তুকি ও ডিজেলে গাড়ি চালানোর ব্যাপারে জার্মান গাড়িনির্মাতাদের
অবস্থানের প্রতি সমর্থন, তুর্কি গণমাধ্যমের স্বাধীনতার ব্যাপারে তাঁর
নতজানু অবস্থান— এসবও শক্তিশালী হচ্ছে। এতে তাঁর ইউক্রেনের মিনস্ক চুক্তির
ভুল ব্যবস্থাপনার বিষয়টিও উঠে এসেছে। অন্য যেকোনো জীবিত রাজনীতিকের চেয়ে
ম্যার্কেল ইউরোপীয় ইউনিয়নের বেশি ক্ষতি করেছেন, যদিও তিনি সব সময়ই ‘ইউরোপীয়
প্রকল্পের’ ব্যাপারে নিজের আবেগের কথা বলে আসছেন। কিন্তু এখন কথা হচ্ছে,
জার্মান নেতাদের ব্যাপারে ইউরোপের মোহভঙ্গ হলে তারা কোথায় যাবে? দৃশ্যত
যাঁদের সম্ভাব্য নেতা ভাবা হচ্ছে, তাঁরা কেউই এ ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে পারছেন
না: ব্রিটেন তো বেরিয়ে যাচ্ছে, ফ্রান্স আগামী বছরের প্রেসিডেন্ট
নির্বাচনের আগ পর্যন্ত পক্ষাঘাতগ্রস্ত থাকবে, এমনকি তারপরও, আর স্পেন তো
সরকারই গঠন করতে পারছে না। ফলে ইতালির সামনে সুযোগ চলে এসেছে, যে দেশটি
নিজের ইতিহাসের বেশির ভাগ সময় ইউরোপের রাজনীতি ও সংস্কৃতিকে প্রভাবিত
করেছে। অথচ এখন তারাই ‘প্রান্তিক’ হয়ে পড়েছে। কিন্তু ইউরোপের সেরা চিন্তা,
রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও সবচেয়ে বিস্ময়করভাবে অর্থনীতিরও সূতিকাগার হিসেবে ইতালি
নিজের ঐতিহাসিক স্থান ফিরে পাচ্ছে। দ্রাঘি যে ইসিবিকে পৃথিবীর সবচেয়ে
সৃজনশীল ও উদ্যোগী ব্যাংকে পরিণত করেছেন, সেটাই এর উজ্জ্বল উদাহরণ। দ্রাঘি
জার্মানির বিরোধিতা সত্ত্বেও কোয়ান্টিটেটিভ ইজিং চালু করেছেন, ফলে ইউরো
বেঁচে গেছে। গত মাসে প্রথম কেন্দ্রীয় ব্যাংকার হিসেবে দ্রাঘি হেলিকপ্টার
মানির ধারণা গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করেছেন, যেটা হচ্ছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে
নবসৃষ্ট টাকা ইউরোজোনের বাসিন্দাদের মধ্যে সরাসরি বিতরণ করবে। জার্মান
নেতারা এর তীব্র বিরোধিতা করেছেন। তাঁরা এখন দ্রাঘির বিরুদ্ধে জাতীয়তাবাদী
আক্রমণ শুরু করেছেন। ওদিকে ইতালি অনেকটা অলক্ষ্যেই জার্মান সরকার ও ইউরোপীয়
কমিশনের প্রাক্-কেইনসীয় অর্থনীতির বিরুদ্ধে নীরব লড়াই শুরু করেছে। ইইউ
কাউন্সিল ও পরবর্তীকালে আন্তর্জাতিক মুদ্রা সংস্থার বৈঠকে ইতালির
অর্থমন্ত্রী পিয়ের কারলো পাদোয়ান আর্থিক প্রণোদনার ব্যাপারটা আরও জোরালো ও
সমন্বিতভাবে উপস্থাপন করেছে, অন্য যেকোনো ইউরোপীয় নেতার চেয়ে। আরও
গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হলো পাদোয়ান কর হ্রাস ও সরকারি ব্যয়ের পরিকল্পনা করে
আর্থিক প্রণোদনার নীতি বাস্তবায়ন শুরু করেছেন। সেটা করতে গিয়ে তিনি জার্মান
ও ইইউ কমিশনের আঁটসাঁট বাজেটের দাবি অগ্রাহ্য করছেন। ফলে দেখা যাচ্ছে, ১৫
বছরের মধ্যে ইতালিতে এবারই প্রথম ভোক্তা ও ব্যবসায়ীরা আত্মবিশ্বাস ফিরে
পেয়েছে, একই সঙ্গে সেখানকার ঋণের পরিস্থিতি ভালো হয়েছে। আরও আছে, আইএমএফ
আশা করছে জি-৭-এর দেশ হিসেবে শুধু ইতালির প্রবৃদ্ধি ২০১৫ সালের তুলনায় বেশি
হবে (যদিও সেটার হার হবে খুবই কম, ১ শতাংশ)।
সম্প্রতি পাদোয়ান এক কাল্পনিক সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের পরিকল্পনা করেছেন, যার লক্ষ্য হচ্ছে ইতালির ব্যাংকগুলোর বহু প্রতীক্ষিত নতুন পুঁজির চাহিদা মেটানো। আর সেটা করার জন্য তিনি ইসিবি ও ইইউর কর্মকর্তাদের অনুমোদনের জন্য অপেক্ষা করেননি, যারা এর আগে জার্মানির চাপে ‘ব্যাড ব্যাংক’ পরিকল্পনা নস্যাৎ করে দিয়েছিল। ওদিকে বিরুদ্ধাচরণের জন্য আর্থিক বাজার ইতালিকে তাৎক্ষণিকভাবে পুরস্কৃত করেছে, তিন দিনের মধ্যে দেশটির বৃহত্তম ব্যাংক ইউনিক্রেডিটের শেয়ারের মূল্য ২৫ শতাংশ বেড়ে গেছে।
এই যে ইতালি ক্রমাগতভাবে জার্মানির অর্থনৈতিক অন্ধত্বকে জোরালোভাবে প্রতিহত করে যাচ্ছে, তাতে বিস্মিত হওয়ার কিছু নেই। দেশটি ইউরোতে যোগ দেওয়ার পর থেকেই ক্রমাগত মন্দার কবলে রয়েছে। আর পাদোয়ানই জি-৭-এর একমাত্র অর্থমন্ত্রী, যার পেশাদার অর্থনৈতিক প্রশিক্ষণ রয়েছে। তিনি বোঝেন, ভুল রাজস্ব ও মুদ্রানীতির কারণে ইউরোপের অর্থনীতি ঠিকঠাক কাজ করছে না। পররাষ্ট্রনীতিতেও ইতালি বেশ জোরালো অবস্থান নিয়েছে। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী পাওলো জেনতিলোনি সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে হাত মিলিয়ে লিবিয়া ও শরণার্থী সংকটের ব্যাপারে বাস্তবসম্মত ও কার্যকর ইউরোপীয় নীতি প্রণয়নের লক্ষ্যে কাজ করছেন। আরও তাৎপর্যপূর্ণ ব্যাপার হলো রাশিয়ার সঙ্গে ইউক্রেন নিয়ে লড়াই করার পর তাঁরা দেশটির সঙ্গে সম্পর্ক ঝালাই করার উদ্যোগ নিয়েছেন। আর সিরিয়ার ব্যাপারে দেশটি রাশিয়ার সঙ্গে সহযোগিতা জোরদার করতে চাচ্ছে। এই প্রচেষ্টার ফল মিলছে বলেই মনে হয়, রাশিয়ার ওপর থেকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের নিষেধাজ্ঞা ক্রমাগত উঠে যাচ্ছে, যেটা শুরু হয়েছে এ গ্রীষ্মে।
ইউরোপে জার্মান নেতৃত্বের ব্যর্থতা ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সব জায়গায় যে রাজনৈতিক শূন্যতা সৃষ্টি হয়েছে, সেই পরিপ্রেক্ষিতে ইতালি নিজের প্রোফাইল উন্নত করার যে চেষ্টা করছে, তা যথোচিত।
এখন এটা দেখার বিষয় যে ইতালি অর্থনৈতিকভাবে অগ্রসর ও রাজনৈতিকভাবে বাস্তবসম্মত দেশগুলোর সঙ্গে একতা গড়ে তুলে জার্মান রক্ষণশীলতা ও অন্ধত্ব কাটিয়ে উঠতে পারে কি না। কিন্তু যেভাবেই হোক, ইউরোপের রাজনৈতিক অর্থনীতিকে ২০০৮ সালের আর্থিক সংকট উদ্ভূত নতুন ধরনের বৈশ্বিক পুঁজিবাদের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে হবে। ভাগ্যের সহায়তা নিয়ে নতুন প্রজন্মের চতুর ও গতিশীল ইতালীয় নেতারা জার্মান দানবদের কৌশলে পরাস্ত করবে, যাদের সেকেলে নীতি ও মতবাদের কারণে ইউরোপীয় ইউনিয়ন বিলুপ্ত হতে বসেছে।
অনুবাদ: প্রতীক বর্ধন, স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট
আনাতোলে কালেৎস্কি: গ্যাভকেল ড্রাগোনমিক্সের প্রধান অর্থনীতিবিদ।
সম্প্রতি পাদোয়ান এক কাল্পনিক সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের পরিকল্পনা করেছেন, যার লক্ষ্য হচ্ছে ইতালির ব্যাংকগুলোর বহু প্রতীক্ষিত নতুন পুঁজির চাহিদা মেটানো। আর সেটা করার জন্য তিনি ইসিবি ও ইইউর কর্মকর্তাদের অনুমোদনের জন্য অপেক্ষা করেননি, যারা এর আগে জার্মানির চাপে ‘ব্যাড ব্যাংক’ পরিকল্পনা নস্যাৎ করে দিয়েছিল। ওদিকে বিরুদ্ধাচরণের জন্য আর্থিক বাজার ইতালিকে তাৎক্ষণিকভাবে পুরস্কৃত করেছে, তিন দিনের মধ্যে দেশটির বৃহত্তম ব্যাংক ইউনিক্রেডিটের শেয়ারের মূল্য ২৫ শতাংশ বেড়ে গেছে।
এই যে ইতালি ক্রমাগতভাবে জার্মানির অর্থনৈতিক অন্ধত্বকে জোরালোভাবে প্রতিহত করে যাচ্ছে, তাতে বিস্মিত হওয়ার কিছু নেই। দেশটি ইউরোতে যোগ দেওয়ার পর থেকেই ক্রমাগত মন্দার কবলে রয়েছে। আর পাদোয়ানই জি-৭-এর একমাত্র অর্থমন্ত্রী, যার পেশাদার অর্থনৈতিক প্রশিক্ষণ রয়েছে। তিনি বোঝেন, ভুল রাজস্ব ও মুদ্রানীতির কারণে ইউরোপের অর্থনীতি ঠিকঠাক কাজ করছে না। পররাষ্ট্রনীতিতেও ইতালি বেশ জোরালো অবস্থান নিয়েছে। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী পাওলো জেনতিলোনি সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে হাত মিলিয়ে লিবিয়া ও শরণার্থী সংকটের ব্যাপারে বাস্তবসম্মত ও কার্যকর ইউরোপীয় নীতি প্রণয়নের লক্ষ্যে কাজ করছেন। আরও তাৎপর্যপূর্ণ ব্যাপার হলো রাশিয়ার সঙ্গে ইউক্রেন নিয়ে লড়াই করার পর তাঁরা দেশটির সঙ্গে সম্পর্ক ঝালাই করার উদ্যোগ নিয়েছেন। আর সিরিয়ার ব্যাপারে দেশটি রাশিয়ার সঙ্গে সহযোগিতা জোরদার করতে চাচ্ছে। এই প্রচেষ্টার ফল মিলছে বলেই মনে হয়, রাশিয়ার ওপর থেকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের নিষেধাজ্ঞা ক্রমাগত উঠে যাচ্ছে, যেটা শুরু হয়েছে এ গ্রীষ্মে।
ইউরোপে জার্মান নেতৃত্বের ব্যর্থতা ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সব জায়গায় যে রাজনৈতিক শূন্যতা সৃষ্টি হয়েছে, সেই পরিপ্রেক্ষিতে ইতালি নিজের প্রোফাইল উন্নত করার যে চেষ্টা করছে, তা যথোচিত।
এখন এটা দেখার বিষয় যে ইতালি অর্থনৈতিকভাবে অগ্রসর ও রাজনৈতিকভাবে বাস্তবসম্মত দেশগুলোর সঙ্গে একতা গড়ে তুলে জার্মান রক্ষণশীলতা ও অন্ধত্ব কাটিয়ে উঠতে পারে কি না। কিন্তু যেভাবেই হোক, ইউরোপের রাজনৈতিক অর্থনীতিকে ২০০৮ সালের আর্থিক সংকট উদ্ভূত নতুন ধরনের বৈশ্বিক পুঁজিবাদের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে হবে। ভাগ্যের সহায়তা নিয়ে নতুন প্রজন্মের চতুর ও গতিশীল ইতালীয় নেতারা জার্মান দানবদের কৌশলে পরাস্ত করবে, যাদের সেকেলে নীতি ও মতবাদের কারণে ইউরোপীয় ইউনিয়ন বিলুপ্ত হতে বসেছে।
অনুবাদ: প্রতীক বর্ধন, স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট
আনাতোলে কালেৎস্কি: গ্যাভকেল ড্রাগোনমিক্সের প্রধান অর্থনীতিবিদ।

No comments:
Post a Comment