Thursday, April 7, 2016

দূরত্ব কমাবে শঙ্খচিল? by রাসেল মাহমুদ

শঙ্খচিল ছবিতে প্রসেনজিৎ ও কুসুম সিকদার
‘ইদানীং বাংলাদেশ-ভারত খেলা হলে, ফেসবুক খুলে ভাবতে বসি, মানুষ এত ঘৃণা পায় কোথা থেকে?’ সম্প্রতি ভারতের একটি বাংলা দৈনিকের সম্পাদকীয়তে এমনটা লিখেছেন টালিউড অভিনেতা পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়। ৩ এপ্রিল প্রকাশিত ‘বাড়ির পাশেই আরশিনগর’ নামের ওই সম্পাদকীয় এখন বাংলাদেশের ফেসবুকের ওয়ালে ওয়ালে উড়ছে। সেখানে এসেছে পদ্মা নিয়ে ঠাকুরমা-দিদিমাদের সুখস্মৃতি, হেমাঙ্গ-সলিল-আব্বাসউদ্দীনের গান শিখে বড় হওয়া দুই বাংলার মানুষের কথা। ‘দেশ ভাগ না হলে কত বড় একটা অঞ্চলের বাসিন্দা থাকতাম আমরা’—কথাটা বলতে শোনা যায় অনেক বয়স্ক নাগরিককে। দেশভাগ আর কিছু না দিক ‘একঘর পড়শি’ দিয়েছে আমাদের। যাঁদের সঙ্গে আমাদের ভাষা, সংস্কৃতি একদম মিলে যায়। তবু এক বিভেদ, দ্বন্দ্ব কোথায় যেন মাথা তুলে রাখে। মাঝে মাঝে বুকের ভেতর মুচড়ে ওঠে সেই সাতচল্লিশের স্মৃতি! সেসব স্মৃতি নিয়ে সম্প্রতি চলচ্চিত্র শঙ্খচিল নির্মাণ করেছেন ওপার বাংলার পরিচালক গৌতম ঘোষ। দেশভাগের আগে তাঁর পরিবার ছিল ফরিদপুরে। দেশভাগের পরের যাতনার স্মৃতি তিনি দেখেছেন তাঁর বাবা-মায়ের চোখে। সেই দেশভাগ কী দিয়েছে, কী কেড়ে নিয়েছে—সেসব নিয়ে এক আড্ডায় তিনি বলেছিলেন, ‘বাঙালি জাতি একটা ঐতিহাসিক সময় পার করেছিল। মাত্র ৬৮ বছর আগের কথা। পৃথিবীর ঐতিহাসিক সময়ের কাছে এই ৬৮ বছর কোনো সময়ই নয়। নানা কারণে ভাগ হয়ে গিয়েছিলাম আমরা। সেসব নিয়ে এখনো নানা বিশ্লেষণ চলছে। কেন পাকিস্তান হয়েছিল, কেন দ্বিজাতি তত্ত্ব। পরে বাংলাদেশের উৎপত্তির সঙ্গে সঙ্গে দ্বিজাতি তত্ত্ব ভুল প্রমাণিত হলো। এসব নিয়ে আমাদের ভেতরে একটা সংশয় ও বেদনা রয়েছে। এই দেশ বিভাগের যন্ত্রণার ছাপ ছোটবেলা থেকেই আমাদের পিতা-মাতার ভেতরে ছিল। ফলে সেগুলো তাড়িত করত আমাদেরও। এ নিয়ে অনেক চলচ্চিত্রকার ছবি বানিয়েছেন। ঋত্বিক ঘটকের ছবিতেও সেসব বেদনার অনুভূতির দেখা মেলে।’ তবে শঙ্খচিল ছবিতে বলা হয়েছে এখনকার সময়ের গল্প। সীমান্ত অঞ্চলের গল্প। মানুষের একই ভাষা, একই চেহারা—অথচ মধ্যে কাঁটাতার। গল্পটার ভেতরে কিছু স্মৃতি রয়েছে। সেই স্মৃতিই তাঁদের নিয়ে যায় সাতচল্লিশে। শঙ্খচিল-এর মূল চরিত্র বাদল চৌধুরীর নানা হুগলি প্রদেশ থেকে এদিকে চলে এসেছিলেন। আবার এদিককার অনেক মানুষ চলে গিয়েছিলেন পশ্চিমে। সেই স্মৃতিগুলো যেমন আমাকে তাড়িত করে, তেমনি করেছে বাদলকেও। সে জন্য বলা যায়, ছবিটা দেশভাগের না, দেশভাগের স্মৃতি নিয়ে সীমান্ত অঞ্চলে বাস করা একদল মানুষের। সমস্ত গল্পে দেশভাগের একটা আভা গিয়ে পড়ে। এ নিয়েই গল্প শঙ্খচিল। ছবিতে বাঙালির ভাবনা দেখানো হয়েছে। একেক জনের ভাবনা সেখানে একেক রকম। মানুষগুলো ভাবে, কেন হলো এমন। দেশভাগ কি শুধুই এক ভৌগোলিক ভাগ, নাকি মনের দিক থেকেও ভাগ। বাঙালির ভাষা, সংস্কৃতি তো ভাগ হয় না। গৌতম ঘোষ মনে করেন, সাতচল্লিশের প্রেক্ষাপটে একটা দূরত্ব তৈরি হয়েছিল। তিনি বলেন, ‘সম্প্রতি সাংস্কৃতিক আদান-প্রদানের মধ্য দিয়ে এই দূরত্ব খানিকটা কমে গেছে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে আরও কমবে।’ দুই বাংলার জন্যই আনন্দের সংবাদ হচ্ছে মুক্তির আগেই পুরস্কার জিতেছে শঙ্খচিল। ভারতের ৬৩তম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারপ্রাপ্ত বাংলাদেশ-ভারত যৌথ প্রযোজনার এ ছবিটি মুক্তি পাবে আসছে পয়লা বৈশাখে। ‘শঙ্খচিল’ ছবিটি বাংলাদেশ থেকে প্রযোজনা করছে ইমপ্রেস টেলিফিল্ম ও আশীর্বাদ চলচ্চিত্র আর ভারতে প্রসেনজিতের প্রযোজনা সংস্থা এন আইডিয়াস লি.। ছবিতে অভিনয় করেছেন কলকাতার প্রসেনজিৎ, বাংলাদেশের কুসুম সিকদার, সাঁঝবাতি প্রমুখ।

No comments:

Post a Comment