২২০
জন চলচ্চিত্রকারের নির্বাচিত ১২৮টি চলচ্চিত্র, এই চলচ্চিত্রকারদের শতকরা
৯৫ ভাগেরই বয়স ৩৫ বছরের নিচে। নির্বাচিত চলচ্চিত্রগুলোর বিষয়বস্তু, দৈর্ঘ্য
ও ধরন বিচিত্র। দুই মিনিটের নিরীক্ষাধর্মী স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র থেকে
দুই ঘণ্টার শিল্পপ্রয়াসী পূর্ণদৈর্ঘ্য কাহিনিচিত্র, অ্যানিমেশন থেকে
প্রামাণ্যচিত্র—কী নেই এখানে? আর কাহিনির বৈচিত্র্য বলাই বাহুল্য!
মুক্তিযুদ্ধ, নারী নির্যাতন, শিশু-কিশোর, শাশ্বত গ্রামীণ জীবন, মনোবিকলন,
প্রেম-অপ্রেম, থ্রিলার, নাগরিক সম্পর্ক, পরিবেশ—বিচিত্র বিষয়ের চলচ্চিত্র।
ঢাকার দাপটকে উপেক্ষা করে চট্টগ্রাম, রাজশাহী, সিলেট কিংবা নানা শহরের
নির্মাতারা হাজির তাঁদের সৃষ্টিকর্ম নিয়ে। এই চালচ্চিত্রিক বিচিত্রতায় ভর
করে শেষ হলো স্বল্পদৈর্ঘ্য, পূর্ণদৈর্ঘ্য ও প্রামাণ্য চলচ্চিত্রের
বছরব্যাপী প্রতিযোগিতামূলক উৎসব ‘নতুন চলচ্চিত্র নতুন নির্মাতা’ কর্মসূচি।
মুভিয়ানা ফিল্ম সোসাইটির উদ্যোগে ও বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির সমর্থনে
আয়োজিত কর্মসূচিটি অনেকটা নীরবেই তার ভূমিকা রেখে গেল বাংলাদেশের চলচ্চিত্র
সংস্কৃতিতে। গত বছরের এপ্রিল মাসে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির প্রাঙ্গণে
শুরু হয় এই কর্মসূচি। এ বছরের এপ্রিল মাসে ‘জহির রায়হান শ্রেষ্ঠ
কাহিনিচিত্র পুরস্কার’, ‘আলমগীর কবির শ্রেষ্ঠ প্রামাণ্যচিত্র পুরস্কার’ ও
‘বাদল রহমান শ্রেষ্ঠ স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র পুরস্কার’ প্রদানের মাধ্যমে
শেষ হবে কর্মসূচিটি। বিচারক প্যানেলের একজন হয়ে প্রতি মাসে চলচ্চিত্র
নির্বাচন করতে গিয়ে দেখেছি, এখানে যেমন প্রতিষ্ঠিত পরিচালকেরা চলচ্চিত্র
জমা দিয়েছেন, তেমনি উঠতি বা ইতিমধ্যে পরিচিত নির্মাতারাও অংশ নিয়েছেন। তবে
এই কর্মসূচির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো অনেক নতুন নির্মাতার আত্মপ্রকাশ।
নিয়মিত প্রতিযোগিতামূলক উৎসব হওয়ার কারণে, আমি জানি, অনেক নতুন নির্মাতা
কেবল এই প্ল্যাটফর্মকে মাথায় রেখে নতুন নতুন চলচ্চিত্র নির্মাণ করছেন।
আমাদের দেশে নতুন নির্মাতাদের জন্য কোনো নির্দিষ্ট স্থান নেই বললেই চলে,
যেখানে নির্মাতা তাঁর চলচ্চিত্র প্রদর্শন করবেন। এই উৎসবটি সে রকম
ব্যতিক্রমী একটি পরিসর হয়ে উঠেছে। অবাক ব্যাপার, প্রতি মাসে যে
চলচ্চিত্রগুলো প্রদর্শন করা হতো, দর্শকের দর্শনী থেকে প্রাপ্ত অর্থ
প্রদর্শন শেষে সেসব চলচ্চিত্রের নির্মাতাদের হাতে তুলে দেওয়া হতো। যত
সামান্য অর্থই হোক, নতুন নির্মাতারা এর মধ্য দিয়ে সম্মানিতও হচ্ছেন। দুই
বছর অন্তর বড় করে আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব আয়োজনের চেয়েও কেবল দেশি
চলচ্চিত্রের এই নিয়মিত উৎসব আমার বিবেচনায় বেশি গুরুত্বপূর্ণ। বিচারক
হিসেবে আমাকে সবগুলো চলচ্চিত্র দেখতে হয়েছে। জমা করা চলচ্চিত্রগুলো
মানেগুণে সবই ভালো, তা নয়। কিছু চলচ্চিত্র বেশ চমকপ্রদ—বিষয় নির্বাচনে এবং
চলচ্চিত্র ভাষার প্রয়োগে। তবে কিছু আছে সাধারণ মানের। তাঁদের কাজে
আন্তরিকতা ও আগ্রহ স্পষ্ট। নানাভাবে গাইড করা গেলে, কিংবা তাঁদের চলচ্চিত্র
বিষয়ে পঠনপাঠন বৃদ্ধি পেলে, সমাজ-ইতিহাস-রাজনীতি সচেতনতায় আরও সচেষ্ট হলে
তাঁরাও একদিন হয়ে উঠতে পারবেন গুরুত্বপূর্ণ চলচ্চিত্রকার হিসেবে। আমি এই
কর্মসূচিতে বিচারপ্রক্রিয়ায় যুক্ত হয়ে অনেক সম্ভাবনার স্ফুরণ লক্ষ করেছি। এ
রকম একটি উদ্যোগ নেওয়ার জন্য মুভিয়ানা ফিল্ম সোসাইটি ও বাংলাদেশ শিল্পকলা
একাডেমি অবশ্যই কৃতিত্বের দাবিদার। বাংলাদেশের চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলনের
অনেক অর্জন রয়েছে, আবার পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে সেই আন্দোলন ঝিমিয়েও পড়েছে।
সে রকম একটি প্রেক্ষাপটে চলচ্চিত্র সংস্কৃতি বিকাশের জন্য একটি চলচ্চিত্র
সংসদ প্রথমবারের মতো এই উদ্ভাবনী কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। আর বাংলাদেশ
শিল্পকলা একাডেমির থিয়েটার ও চলচ্চিত্র বিভাগটি গত পাঁচ-ছয় বছরে চলচ্চিত্র
নিয়ে অনেক কর্মসূচি সম্পন্ন করেছে। এখন এক বছরের সফল কর্মসূচির পর, এই
প্রতিযোগিতামূলক উৎসবটি চালু রাখা দরকার। এ ক্ষেত্রে আয়োজক দুই
প্রতিষ্ঠানের একটিকে যেমন নিজেদের দেখিয়ে দেওয়া পথ ধরেই তাদের এগিয়ে যেতে
হবে, তেমনি অন্য প্রতিষ্ঠানকে তাদের সমর্থন অব্যাহত রাখতে হবে। আবার এই
কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত প্রায় দুই শ নতুন নির্মাতাকেও নিজেদের স্বার্থেই
গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে হবে। তাঁরা এই প্ল্যাটফর্মকে ব্যবহার করে
নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ রক্ষা করতে পারবেন, চলচ্চিত্রবিষয়ক যাবতীয় উদ্দীপনা
প্রকাশের স্থান হিসেবে এটিকে ব্যবহার করতে পারবেন এবং এভাবে গুরুত্বপূর্ণ
চলচ্চিত্রকার হয়ে ওঠার পুরো প্রক্রিয়ায় নিজেদের পরিপক্ব করে তুলতে পারবেন।
Subscribe to:
Post Comments (Atom)

No comments:
Post a Comment