Sunday, April 17, 2016

পেট্রলবোমায় পুড়েছে শরীর থেমে গেছে জীবিকার চাকা by আনোয়ার পারভেজ

গোলাম মোস্তফা
একদিন ট্রাকের চাকা না ঘুরলে থমকে যেত জীবিকা। স্ত্রী-সন্তানের মুখে খাবার তুলে দিতেই ‘খ্যাপ’ নিয়ে বের হয়েছিলেন। সেটাই কাল হয়েছিল। সবজির ট্রাকে পেট্রলবোমা হামলায় দগ্ধ হন। পোড়া শরীর নিয়ে প্রায় সাড়ে পাঁচ মাস হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে কাটিয়েছেন। হারিয়েছেন কর্মক্ষম দুটি হাত। এখন শরীরজুড়ে পোড়ার ক্ষতচিহ্ন। দিনরাত অসহ্য যন্ত্রণায় ছটফট করেন। ঘুমাতে গেলে চোখের সামনে ভেসে ওঠে পেট্রলবোমা হামলার দৃশ্য। যন্ত্রণায় চিৎকার দেন। ১৪ মাস ধরে এমন যন্ত্রণায় জীবন কাটছে বগুড়ার ছোট কুমিড়া সরদারপাড়া গ্রামের ট্রাকচালক গোলাম মোস্তফার। ২০১৫ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি রাতে নাটোর-বগুড়া মহাসড়কের বগুড়ার রূপিহার এলাকায় সবজির ট্রাকে পেট্রলবোমা হামলার শিকার হন তিনি। দুই হাতে এখন আর কাজ করতে পারেন না। ঘরে স্ত্রী-চার সন্তান ছাড়াও বৃদ্ধ বাবা-মা। অন্যের বাসাবাড়িতে কাজ করেন স্ত্রী গোলাপী বেগম। কলম-খাতা ছেড়ে বড় ছেলে কাজ নিয়েছে ট্রাকচালকের সহকারীর। এত দিনেও জোটেনি সরকারি কোনো সহায়তা। ছোট কুমিড়া গ্রামে দুই শতকের একটা বসতভিটা সম্বল গোলাম মোস্তফার। সেখানেই কথা হয় তাঁর সঙ্গে। দুঃসহ সেই দিনের বর্ণনা দিতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘অবরোধে রোজগার বন্ধ। স্ত্রী, চার সন্তান, বৃদ্ধ বাবা-মাকে নিয়ে কঠিন অভাবে পড়লাম। বাড়িতে চুলা জ্বলে না। সপ্তাহ শেষে এনজিওর কিস্তির চাপ। শেষমেশ ঝুঁকি নিয়ে খ্যাপ মারতে বের হলাম। খ্যাপ মিলল বগুড়া থেকে নাটোরে। কিন্তু ট্রাকে সহকারী মিলে না। পেট্রলবোমার ভয়ে কেউ ট্রাকে উঠতে সাহস পায় না। বগুড়ার চারমাথা টার্মিনালে একজনকে সহকারী পেলাম। চিনি না। ময়দার খ্যাপ মেরে নাটোর থেকে ৭ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় বগুড়ায় ফিরছিলাম। মাঝপথে হঠাৎ পেট্রলবোমা এসে ট্রাকে পড়ল। দাউ দাউ করে আগুন জ্বলে উঠল। চোখের সামনে পুড়ে মরল সহকারী হাসিব নামের ছেলেটা। দুই সবজি ব্যবসায়ীসহ দগ্ধ হলাম। আড়াই মাস বগুড়ার শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বিছানায় অসহ্য যন্ত্রণায় ছটফট করলাম। আরও তিন মাস কাটালাম ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে। দুই হাত হারালাম। বীভৎস চেহারা নিয়ে বাড়ি ফিরলাম। এখনো শরীরজুড়ে অসহ্য যন্ত্রণা। ছটফট করি। রাতে দুই চোখে ঘুম আসে না। পোড়া গায়ের যন্ত্রণার সঙ্গে রয়েছে অভাবের যন্ত্রণা।’ গোলাপী বেগম বলেন, দেড় যুগ আগে পরিচয় গোলাম মোস্তফার সঙ্গে। তখন প্রাইভেট কার চালাতেন। এরপর ভালোবেসেই বিয়ে। পেট্রলবোমায় সেই সুন্দর মানুষটার শরীর-মুখ ঝলসে গেল। এখন পোড়া হাত অকেজো। কাজ করতে পারেন না। চিকিৎসকেরা বলেছেন, তাঁর আরও চিকিৎসা প্রয়োজন। প্রতিদিন ১০০ টাকার ওষুধ কিনতে হয়। বিভিন্ন এনজিও থেকে অনেক দেনা করতে হয়েছে। সংসারে দৈন্যের বর্ণনা দিয়ে গোলাপী বেগম বলেন, চার ছেলেমেয়ের মধ্যে বড় মেয়ে নুরজাহানের বিয়ে হয়েছে। বড় ছেলে লেখাপড়া বাদ দিয়ে ট্রাকের চালকের সহকারীর কাজ নিয়েছে। আট ও চার বছরের আরও দুটি ছেলেমেয়ের মুখে ভাত তুলে দিতে অন্যের বাসাবাড়িতে তিনি ঝিয়ের কাজ করছেন। তিনি আরও বলেন, পেট্রলবোমায় তরতাজা মানুষটার শুধু শরীর পোড়েনি, পুড়েছে ছেলেমেয়েকে নিয়ে তাঁর সুখের স্বপ্ন। হাসপাতালে থাকার সময় অনেকেই সহায়তার আশ্বাস দিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রী সাহায্য করবেন বলেও কেউ কেউ বলেছেন। কিন্তু ১৪ মাস ধরে পোড়া শরীর নিয়ে ধুঁকে ধুঁকে বেঁচে থাকলেও কেউ খোঁজ নেননি; চিকিৎসা সহায়তারও ব্যবস্থা করেননি।

No comments:

Post a Comment