Sunday, April 17, 2016

ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের সঠিক সংখ্যা নেই by সুজন ঘোষ

২০০৭ সালে করা ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের তালিকায় রয়েছে নগরের নন্দনকানন
এলাকার এই দোতলা ভবনটি। আট বছর পেরিয়ে গেলেও ভবনটি এখনো
ভাঙা হয়নি। ওই ভবনে রয়েছে একটি সংগঠনের কার্যালয়। ঝুঁকি নিয়ে
বসবাস করছে দুটি পরিবার। ছবিটি গতকাল সকালে তোলা
গত বুধবার রাতের ভূকম্পনে চট্টগ্রাম নগরের চান্দগাঁও আবাসিক এলাকার বি-ব্লকের ৮ নম্বর সড়কে হেলে পড়ে শিরিন নিকেতন নামের ছয়তলা একটি ভবন। এটি পাশের আরেকটি ভবনের ছাদের অংশের দিকে লেগে গেছে। এতে আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়েন উভয় ভবনের বাসিন্দারা। এর জের ধরে ইতিমধ্যে খালি হতে শুরু করেছে শিরিন নিকেতন। আটটি ফ্ল্যাটের সাতটির ভাড়াটেরা চলে গেছেন। অথচ ভূমিকম্পে হেলে পড়লেও ভবনটি ঝুঁকিপূর্ণ তালিকায় ছিল না। শুধু শিরিন নিকেতন নয়, ভূমিকম্পে হেলে পড়া নগরের অন্য আটটি ভবনও চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) করা ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের তালিকায় ছিল না। বর্তমানে নগরে ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের সঠিক সংখ্যা কত জানে না প্রশাসনও। সর্বশেষ ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের তালিকা করা হয় ২০০৭ সালে। ওই তালিকায় ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের সংখ্যা ছিল ৫৭। এরপর আর তালিকা হালনাগাদ করা হয়নি। বিশেষজ্ঞরা দ্রুত ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলোর তালিকা হালনাগাদ করার ওপর জোর দিয়েছেন। চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) সদ্য বিদায়ী উপাচার্য ও ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক জাহাঙ্গীর আলম প্রথম আলোকে বলেন, নগরের ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের সংখ্যা ৫৭–র চেয়ে অনেক বেশি হবে। এই তালিকা অতি দ্রুত হালনাগাদ করা প্রয়োজন। কারণ, মিয়ানমার সীমান্তে বেশি মাত্রার ভূমিকম্প হলে চট্টগ্রাম নগর ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাই জরিপ চালিয়ে ভবনগুলোর প্রকৃত অবস্থা নিরূপণ করা প্রয়োজন। তিনি বলেন, যেসব ভবনের কাঠামো দুর্বল, সেগুলো যেন ভূমিকম্প সহনীয় করা হয়। আর নতুন যেসব ভবন নির্মিত হচ্ছে, সেগুলোতে ভূমিকম্প প্রতিরোধী ব্যবস্থা থাকা নিশ্চিত করতে হবে। সিডিএ সূত্র জানায়, ২০০৭ সালে করা তালিকা অনুযায়ী ঝুঁকিপূর্ণ ভবন অপসারণ করার জন্য তখনই সিটি করপোরেশনকে অনুরোধ জানিয়েছিল সিডিএ। কিন্তু আট বছর পার হয়ে গেলেও এ ব্যাপারে তেমন কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। শুধু ২০১৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসে নগরের লালদীঘি এলাকায় তিনটি ঝুঁকিপূর্ণ ভবন ভাঙা হয়। তিনটি ভবনই বাণিজ্যিক কাজে ব্যবহার করা হতো। বাকি ৫৪টি ভবনে ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করছে প্রায় আড়াই হাজার মানুষ। সিডিএর তালিকা অনুযায়ী, ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের মধ্যে আবাসিক ৩৫টি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ১টি, আবাসিক ও বাণিজ্যিক হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে এমন ভবন ১২টি এবং শুধু বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে এমন ঝুঁকিপূর্ণ ভবন রয়েছে ৯টি। সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা কাজী মোহাম্মদ শফিউল আলম দীর্ঘদিন ধরে নগরের ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের তালিকা হালনাগাদ না হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, সরকারি বিধান অনুযায়ী ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের তালিকা তৈরি করতে পারে জেলা প্রশাসকের নেতৃত্বে গঠিত একটি কমিটি। অন্য কোনো সংস্থার এই সুযোগ নেই। তিনি বলেন, ‘এই তালিকাটি হালনাগাদ করার জন্য জেলা প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করতে মেয়র মহোদয় নির্দেশনা দিয়েছেন। আমরা সে নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ করে যাচ্ছি।’ এ ব্যাপারে জেলা প্রশাসক মেজবাহ উদ্দিন গতকাল সকালে মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, ‘সাভারে রানা প্লাজা ধসের পর ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের তালিকা হালনাগাদ করতে তোড়জোড় শুরু হয়। কিন্তু কিছুদিন না যেতেই সব থেমে যায়। আর কোনো সভা হয়নি। তবে ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের তালিকা তৈরির জন্য আবার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ইতিমধ্যে এ ব্যাপারে সিটি মেয়রের সঙ্গে কথা বলেছি। সিডিএ, সিটি করপোরেশন ও জেলা প্রশাসন যৌথভাবে শিগগির নতুন তালিকা তৈরি করবে। এরপর যাচাই-বাছাই করে ভাঙা হবে ঝুঁকিপূর্ণ ভবন।’ গতকাল শনিবার সকালে সরেজমিনে দেখা যায়, নগরের নন্দনকানন এলাকার ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলোতে লোকজন বসবাস করছেন। কক্সবাজার সমিতি ভবনে গিয়ে দেখা যায়, দ্বিতল ভবনের ছাদের পলেস্তারা খসে পড়েছে। লোহার রডগুলোও বের হয়ে এসেছে। ভবনের বিভিন্ন পিলারে ফাটল ধরেছে। কিন্তু ঝুঁকিপূর্ণ ভবনটিতে দুটি পরিবার বসবাস করছে। তাঁদের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করা হলে কেউ কথা বলতে রাজি হননি। িসডিএর প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ (ভারপ্রাপ্ত) শাহীন উল ইসলাম খান প্রথম আলোকে বলেন, নগরের ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের তালিকা করার দায়িত্ব গণপূর্ত বিভাগের। তারা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখবে ভবনটি ঝুঁকিপূর্ণ কি না। এরপর সিটি করপোরেশন এই ঝুঁকিপূর্ণ ভবন অপসারণে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথা। এসব ব্যাপারে সিডিএর অর্ডিন্যান্সে কিছু বলা হয়নি। তারপরও ২০০৭ সালে সিডিএ তার অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে নগরের ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলোর তালিকা করে সিটি করপোরেশনকে দিয়েছিল অপসারণ করার জন্য। তিনি বলেন, ‘এরপর আশা ছিল, সিটি করপোরেশন বিষয়টি (ঝুঁকিপূর্ণ ভবন নির্ধারণ ও অপসারণ) অব্যাহত রাখবে। কিন্তু তারা তা চালু রাখেনি।’

No comments:

Post a Comment