Tuesday, April 19, 2016

গমের শত্রু শনাক্ত by ইফতেখার মাহমুদ

তোফাজ্জল ইসলাম
ব্লাস্ট অনেক বছর ধরে ধানের ক্ষতিকর রোগ হিসেবে বিবেচিত হলেও গমের ক্ষেত্রে তা দেখা দেয় ১৯৮৫ সালে। এবার প্রথম বাংলাদেশে আক্রমণ করল
তোফাজ্জল ইসলাম
বাংলাদেশ দলের বিজ্ঞানী
বাংলাদেশে গমের শত্রু ‘ব্লাস্ট’ রোগের জন্য দায়ী ছত্রাকের জিনগত বৈশিষ্ট্য শনাক্ত করেছেন বিজ্ঞানীরা। বাংলাদেশ ও যুক্তরাজ্যের একদল কৃষি বিজ্ঞানীর যৌথ এক গবেষণায় এ সাফল্য এসেছে। এর মাধ্যমে এখন বাংলাদেশে ছত্রাকটির উৎস, সবলতা ও দুর্বলতা জানার সুযোগ তৈরি হলো। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক তোফাজ্জল ইসলাম ও যুক্তরাজ্যের বিজ্ঞানী অধ্যাপক সোফিয়েন কামাউনের নেতৃত্বে একদল বিজ্ঞানী এই গবেষণাটি করেছেন। গবেষকেরা মনে করছেন, এখন সামনের দিনগুলোতে গমে ছত্রাকটির আক্রমণ প্রতিরোধ করা যাবে, উদ্ভাবন করা যাবে ব্লাস্ট রোগ প্রতিরোধী গমের জাত। ১৯৮৫ সালে ব্রাজিলে ম্যাগনাপরথি ওরাইজি ট্রিটিকাম নামে ব্লাস্ট রোগের এই মারাত্মক ছত্রাকটি প্রথম আক্রমণ শুরু করে। পরে দক্ষিণ আমেরিকার বেশির ভাগ দেশে রোগটি বিভিন্ন সময়ে মারাত্মক দুর্যোগ হিসেবে আবির্ভূত হয়। ওই সব দেশে বছরে ২০ থেকে ৩০ শতাংশ গম নষ্ট হয়ে যায়। এশিয়ায় এত দিন এই রোগটি আক্রমণ করেনি। এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে প্রথম বাংলাদেশের চুয়াডাঙ্গা ও মেহেরপুরে রোগটি দেখা যায়। বিশ্বের অন্যতম প্রধান বৃহত্তম গম উৎপাদনকারী দেশ ভারত, পাকিস্তান, চীনসহ এশিয়ার বিভিন্ন দেশের বিজ্ঞানীরা এই ছত্রাকটির আক্রমণের ব্যাপারে আগ্রহী হয়ে ওঠেন। এ পরিস্থিতির মধ্যে গত দুই মাসের মধ্যে বাংলাদেশ ও যুক্তরাজ্যের বিজ্ঞানীদের একটি দল ছত্রাকটির জীনগত বৈশিষ্ট্য বের করল। গতকাল বাংলাদেশ সময় রাত ১২টা ১ মিনিটে গবেষক দলটি প্রাথমিকভাবে পাওয়া রোগটির জীবাণুর জিনগত তথ্যগুলো
ব্লাস্ট রোগ দেখা দেওয়ায় গত ২৪ মার্চ সরকারি উদ্যোগে
পুড়িয়ে দেওয়া হয় চুয়াডাঙ্গার শহরতলি নুরনগরে অবস্থিত
বিএডিসির বীজ উৎপাদনে ব্যবহৃত একটি গমখেত
www.wheatblast.net
 ওয়েবসাইটে সবার জন্য উন্মুক্ত করেছে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, খাদ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নতুন রোগ-সম্পর্কিত যেকোনো প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় সমন্বিত অংশগ্রহণ জরুরি। এ ছাড়া গবেষণা নিবন্ধটি বৈজ্ঞানিক সাময়িকীতে প্রকাশের বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন। বাংলাদেশ দলের নেতৃত্বদানকারী বিজ্ঞানী তোফাজ্জল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ব্লাস্ট রোগ অনেক বছর ধরে ধানের একটি ক্ষতিকর রোগ বিবেচিত হলেও গমের ক্ষেত্রে তা দেখা দেয় ১৯৮৫ সালে। আর এশিয়ার মধ্যে এবারই প্রথম বাংলাদেশে আক্রমণ করল। এশিয়ার অনেক দেশের বিজ্ঞানীরা আশঙ্কা করছিলেন, আগামী বছর থেকে এই রোগ পুরো এশিয়ায় ছড়িয়ে পড়তে পারে। তোফাজ্জল ইসলাম বলেন, ‘আমরা ছত্রাকটির স্বাতন্ত্র্য বৈশিষ্ট্য, জীবাণুর উৎপত্তিস্থল এবং রোগ ব্যবস্থাপনার পন্থা উদ্ভাবনে অনেক দূর এগিয়েছি। এর মধ্য দিয়ে আমরা বাংলাদেশে গমের শত্রুটি সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করেছি, এখন সারা পৃথিবীর গম বিজ্ঞানীদের আহ্বান জানিয়েছি, তাঁরা যাতে এই শত্রুকে দমনের জন্য আমাদের এই গবেষণার লড়াইয়ে যোগ দেন। এ জন্য ওয়েবসাইটটি উন্মুক্ত করা হয়েছে।’ যুক্তরাজ্যভিত্তিক সংস্থা দ্য বায়োটেকনোলজিক্যাল সায়েন্স রিসার্চ কাউন্সিলের সহায়তায় এই গবেষণায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, দ্য সেইনসবারি ল্যাবরেটরি, দ্য জেনোমিক এনালাইসিস সেন্টার ও জন ইনেস সেন্টারের বিজ্ঞানীরা যুক্ত ছিলেন। গত ফেব্রুয়ারিতে দেশের সাতটি জেলায় গমের ব্লাস্ট রোগ ছড়িয়ে পড়ে। এই রোগে আক্রান্ত গমের দানা পরিণত হওয়ার আগেই সাদা হয়ে নষ্ট হয়ে যায়। ফলে ফসলের প্রায় ৯০ শতাংশই নষ্ট হয়ে যায়। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর থেকে এই রোগে আক্রান্ত হওয়া গমের খেত পুড়িয়ে দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। বারির হিসেবে দেশের অন্যতম গম উৎপাদনকারী এলাকা মেহেরপুর, ঝিনাইদহ, যশোর, কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা, বরিশাল ও ভোলার প্রায় ১৫ হাজার হেক্টর জমির গম মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই রোগের কারণে এবার দেশে ২০ শতাংশ গম কম উৎপাদিত হবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এ ব্যাপারে সরকারের গম গবেষণা কেন্দ্রের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা পরিতোষ মালাকার প্রথম আলোকে বলেন, ‘বাংলাদেশে এর আগে ছত্রাকটির আক্রমণ না হওয়ায় শুরুতে আমরা বিষয়টি বুঝতেই পারিনি। পরে আন্তর্জাতিক গম ও ভুট্টা গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিমিটসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার সহায়তায় আমরা এই নতুন রোগটি নিয়ে গবেষণা শুরু করি। কেউ যদি এর জিনগত বৈশিষ্ট্য উন্মোচন করে থাকেন, তাহলে তা আমাদের এই রোগটিকে দমন করার কাজে লাগবে।’ সাধারণভাবে ব্লাস্ট ছত্রাক ধানসহ ৫০ প্রকারের ঘাসজাতীয় উদ্ভিদকে আক্রমণ করে থাকে। মাঝেমধ্যে ছত্রাকটি কোনো একটি ফসল থেকে অন্য ফসলে স্থানান্তরিত হয়ে রোগ সৃষ্টি করে।

No comments:

Post a Comment