Tuesday, April 19, 2016

বিনিয়োগ এখনো স্থবির, বাড়ছে না কর্মসংস্থান by জাহাঙ্গীর শাহ ও সানাউল্লাহ সাকিব

গাজীপুরের মাওনায় অবস্থিত একটি বড় শিল্পগোষ্ঠীর সিরামিকস কারখানার উৎপাদন সক্ষমতা দ্বিগুণ করে ২০১৪ সালে মেশিনপত্র বসানো হয়েছিল। এরপর প্রায় দুই বছর হলো গ্যাস-সংযোগ পাচ্ছেন না ওই উদ্যোক্তা। আবার দিনে চার ঘণ্টার বেশি নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহও মেলে না, যা দিয়ে পুরোনো উৎপাদন সক্ষমতার পুরোপুরি ব্যবহারই করা যাচ্ছে না। বিনিয়োগের জন্য পর্যাপ্ত অর্থ থাকলেও কারখানা তৈরির জন্য জমি পাচ্ছেন না বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তারা। আবার জমি পেলেও গ্যাসের সংযোগ পাচ্ছেন না অনেকে। যন্ত্রপাতি বসানোর পর গ্যাস–সংযোগের অভাবে বসে আছে বহু কারখানা। গ্যাস ও জমির সংকট দূর করতে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি না হওয়ায় কয়েক বছর ধরেই বেসরকারি বিনিয়োগে মন্দাবস্থা চলছে। অথচ ব্যাংকগুলো প্রায় পৌনে দুই লাখ কোটি টাকা নিয়ে বসে আছে। নতুন বিনিয়োগে এগিয়ে আসছেন না বেসরকারি উদ্যোক্তারা। ফলে উদ্যোক্তা না পেয়ে এ বিপুল অর্থ নামমাত্র সুদে বিভিন্ন বন্ডে বিনিয়োগ করে রেখেছে ব্যাংকগুলো।
* পৌনে দুই লাখ কোটি টাকা নিয়ে বসে আছে ব্যাংক
* জিডিপির প্রবৃদ্ধি বাড়লেও কমেছে ব্যক্তি বিনিয়োগের হার
সরকারের প্রাক্কলন হচ্ছে চলতি অর্থবছরে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি হবে ৭ দশমিক ০৫ শতাংশ। আর অর্থনীতিবিদেরা বলছেন, প্রবৃদ্ধি ৭ শতাংশ ছাড়ালেও বিনিয়োগ বাড়িয়ে তা হয়নি। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন বাড়ানোর কারণে জিডিপি বেড়েছে। ফলে বেসরকারি বিনিয়োগের স্থবিরতা রয়েই গেছে। ফলে জিডিপির প্রবৃদ্ধি বাড়লেও কমেছে বেসরকারি বিনিয়োগের হার। গত প্রায় এক দশক ধরে জিডিপির ২১-২২ শতাংশের মধ্যেই ঘোরাফেরা করছে ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগ। বেড়েছে কেবল সরকারি বিনিয়োগ। আবার এই বিনিয়োগের গুণ ও মান নিয়েও রয়েছে নানা সমালোচনা। বিনিয়োগ না হওয়ায় আশানুরূপ কর্মসংস্থানের সুযোগও তৈরি হচ্ছে না। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সদ্য প্রকাশিত শ্রমশক্তি জরিপ-২০১৫ অনুযায়ী, দুই বছরে মাত্র ৬ লাখ নতুন কর্মসংস্থান হয়েছে। অর্থাৎ বছরে গড়ে মাত্র তিন লাখ লোক চাকরি বা কাজ পেয়েছেন। এর ফলে বেড়েছে বেকারত্বের হার। অথচ এর আগের এক দশক ধরে বছরে গড়ে ১৩ লাখের বেশি কর্মসংস্থান হয়েছে। জমি না পাওয়া, পরিবহন খাতে দুর্বলতা ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা—এ তিনটি কারণকেই বিনিয়োগের প্রধান অন্তরায় বলে মনে করেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, বেসরকারি খাতের মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়লেও তা বেশ ব্যয়বহুল, যা নতুন বিনিয়োগকারীদের উৎসাহিত করছে না। তাঁর মতে, রাজনৈতিক অঙ্গন এখন কিছুটা শান্ত থাকলেও ব্যবসায়ীদের মধ্যে বেশ অনিশ্চয়তা রয়েছে। এর প্রতিফলন হিসেবে বিপুল পরিমাণ মূলধন দেশের বাইরে চলে গেছে। ছয় বছরে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক চার লেনে উন্নীত করার কথা ছিল, কিন্তু ১১ বছরেও শেষ হয়নি। জমির সংকট দূর করতে ১০০টি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গঠনের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। এ পর্যন্ত মাত্র ১০টি উদ্বোধন করা হয়েছে। প্রতিবার বাজেট বক্তৃতায় সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের (পিপিপি) বড় প্রকল্প বাস্তবায়নের স্বপ্ন দেখান অর্থমন্ত্রী। পিপিপিতে এখনো নতুন বড় প্রকল্প হয়নি। ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি মীর নাসির হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, গ্যাস-সংযোগের অভাবে বহু কারখানা চালু করা যাচ্ছে না। ১৪ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা থাকলেও শিল্প খাতে নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। তাঁর মতে, আগে অনেক কষ্ট করে উদ্যোক্তারা জমি জোগাড় করতেন। এ জন্য এখন অর্থনৈতিক অঞ্চল করলেও তাতে জ্বালানিসহ অন্য অবকাঠামো গড়ে ওঠেনি। তবে পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) সদস্য শামসুল আলম এ বিষয়ে বলেন, পানির দামে গ্যাস পান বলেই ব্যবসায়ীরা গ্যাসের দাবি করেন। দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশ বিদ্যুৎ দিয়েই শিল্পায়ন করেছে। তবে জমির সংকট দূর করতে ১০০টি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এগুলো দ্রুত করা উচিত। সুদহার: এক বছর ধরে ব্যাংক খাতের ঋণ ও আমানতের সুদহারের ব্যবধান ৫ শতাংশীয় পয়েন্টের মধ্যেই আছে। ২০১৫ সালের জানুয়ারিতে এ ব্যবধান ছিল ৫ দশমিক শূন্য ৬ শতাংশীয় পয়েন্ট। গত ফেব্রুয়ারি শেষে ব্যবধান কমে দাঁড়িয়েছে ৪ দশমিক ৮১ শতাংশীয় পয়েন্ট। এর ফলে ফেব্রুয়ারি শেষে ব্যাংক খাতের আমানতের সুদের হার ৬ দশমিক ১ শতাংশ ও ঋণের সুদের হার ১০ দশমিক ৯১ শতাংশে নেমেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিসংখ্যান বিভাগের হালনাগাদ তথ্য থেকে এ চিত্র পাওয়া গেছে। ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে দফায় দফায় সুদহার কমিয়ে আনার দাবির পরিপ্রেক্ষিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ঋণ ও আমানতের সুদহারের পার্থক্য কমানোর জন্য ব্যাংকগুলোকে নির্দেশ দিয়েছিল। এর ফলে পার্থক্য খানিকটা কমেছে। তবে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেনের মতে, সুদের হার বিনিয়োগের স্থবিরতার বড় কারণ নয়। জ্বালানি সংকট, অবকাঠামো ও আমলাতান্ত্রিক সমস্যার মতো বিনিয়োগের মৌলিক সমস্যার সমাধান হলে বিনিয়োগকারীরা উচ্চ সুদও পরিশোধ করতে পারবেন।  তারল্য পরিস্থিতি: ২০১৫ সালের জুন শেষে ব্যাংকগুলোর কাছে নগদ তারল্য ছিল ২ লাখ ৩৯ হাজার ৫৭৮ কোটি টাকা। আর চলতি বছরের জানুয়ারি শেষে নগদ তারল্য বেড়ে দাঁড়ায় ২ লাখ ৫৩ হাজার ৪৯৬ কোটি টাকা। নগদ জমা সংরক্ষণ হার (সিআরআর) হিসেবে ৫১ হাজার ২১০ কোটি টাকা, বিদেশি মুদ্রায় ৬ হাজার ৭৪২ কোটি টাকা রাখা রয়েছে। বাকি অর্থের মধ্যে উৎপাদন খাতে বিনিয়োগ না করতে পেরে ব্যাংকগুলো বিভিন্ন বন্ডে বিনিয়োগ করে রেখেছে ১ লাখ ৭৭ হাজার ৪৪৬ কোটি টাকা। কম মুনাফার বন্ডে বিনিয়োগ করে রাখায় বাংলাদেশ ব্যাংক এই অর্থকে অলস টাকা বলতে রাজি নয়। প্রকৃতপক্ষে এই অর্থ অলস টাকাই। সব মিলিয়ে বলা যায়, বিনিয়োগের জন্য অর্থ প্রস্তুত থাকলেও নতুন প্রকল্পে খুব বেশি ঋণ যায়নি। ব্যাংক থেকে বেশি ঋণ গেছে বিদ্যমান কারখানা বা ব্যবসা সম্প্রসারণে। জানতে চাইলে অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) ভাইস চেয়ারম্যান, ঢাকা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, অনেকে ঋণ নিলেও গ্যাস ও বিদ্যুৎ-সংযোগ না পেয়ে প্রকল্পের কাজ শুরু করতে পারেননি।  বিনিয়োগ: বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সাময়িক হিসাবে, চলতি অর্থবছরে জিডিপির ২১ দশমিক ৭৮ শতাংশ হবে বেসরকারি বিনিয়োগ। গত অর্থবছরে এর অংশ ছিল ২২ দশমিক ০৭ শতাংশ। জিডিপির আকার যে হারে বাড়ছে, বেসরকারি বিনিয়োগ সে হারে বাড়ছে না। অর্থবছর শেষে বেসরকারি বিনিয়োগের পরিমাণ দাঁড়াবে চলতি মূল্যে ৩ লাখ ৭৬ হাজার ৭৫৪ কোটি টাকা। আর চলতি অর্থবছরে সরকারি বিনিয়োগের পরিমাণ চলতি মূল্যে ১ লাখ ৩১ হাজার ৩৮৩ কোটি টাকা। জিডিপিতে সরকারি বিনিয়োগ অংশীদারত্ব পাঁচ বছরে ৫ দশমিক ৭৬ শতাংশ থেকে বেড়ে ৭ দশমিক ৬ শতাংশ হয়েছে। পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য শামসুল আলমের মতে, বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে পুঁজির নিরাপত্তা দিতে হবে। নিয়মকানুনের মধ্যে থেকে বিদেশি বিনিয়োগকারী যেভাবে চান, সেভাবে মুনাফা নিয়ে যাওয়ার সুযোগ দিতে হবে। তাঁরা মুনাফা করতেই এখানে আসেন। এ ছাড়া উচ্চ করপোরেট করহারও বিনিয়োগে বড় বাধা বলে মনে করেন তিনি।

No comments:

Post a Comment