Wednesday, April 6, 2016

মাথার ওপরের উন্নয়ন by ফারুক ওয়াসিফ

সম্পদ হলো গতির লুকানো দিক, আর গতি হলো সম্পদের প্রকাশ: পল ভিরিলো সিনেমার জনপ্রিয় গান, ‘ঢাকা শহর আইসা আমার আশা পুরাইছে’। যোগাযোগের দিক থেকে ঢাকা আশার সমাধিস্থল। এ শহরের রাস্তায় চলেন তিন পদের মানুষ: রাজা, আমির আর প্রজা। রাজকীয়দের কথা বাদ। আমির আর প্রজাগণ তথা ব্যক্তিগত কার বনাম বাস-রিকশা-লেগুনা একই রাস্তায় চলে থতমত গতিতে। ঢাকার প্রজাকুল বাস-লেগুনায় গাদাগাদি করে চলেন। অবশ্য একটা অংশ সিটে বসে যেতে পারেন। রিকশাগুলোকে মূল সড়ক থেকে হঠানো হয়েছে। বাদবাকিদের জন্য সড়ক এক কঠিন যুদ্ধক্ষেত্র। এই যুদ্ধটা সবার সঙ্গে সবার; কে কাকে চিল্লিয়ে, গুঁতিয়ে, পাশ কাটিয়ে পেরোতে পারে, তার সংগ্রাম। এই হলো রাস্তার শ্রেণিসংগ্রাম। এই সংগ্রামের আওয়াজ যান্ত্রিক ও পাশবিক। একটানা বিকট শব্দে হর্ন বাজানো, গালিবাজি, ধাক্কাধাক্কি, মারামারি এই যুদ্ধের রোজনামচা। এখানে কেউই শেষ পর্যন্ত জয়ী হয় না, যানজটে আটকে থাকার নিয়তি কেউই এড়াতে পারে না। এই শহরে কারণে-অকারণে গাড়ি ভাঙচুরের সামাজিক মনস্তত্ত্বটা এই তীব্র শ্রেণিবৈষম্য ও অসহায় নিয়তিবাদ থেকেও তৈরি। এখন সরকার একটি পক্ষকে জিতিয়ে দিতে নেমেছে। শহরময় উড়ালসড়ক নির্মাণ করা হলো সেই ‘দৈব’ হস্তক্ষেপ। যানজট দূর করার কথা বলা হলেও এর মাধ্যমে আসলে ব্যক্তিগত গাড়িগুলো প্রজাকুলের মাথার ওপর দিয়ে যাওয়ার সুযোগ পাবে। উড়ালসড়কগুলোর সব কটা চালু হলেও গতিসুবিধা গরিব ও মধ্যবিত্ত মানুষের আওতার বাইরেই থেকে যাবে। যাঁদের ব্যক্তিগত গাড়ি নেই, উড়ালসড়ক তাঁদের তেমন উপকারে আসবে না। উড়ালসড়কের ফল ভোগ করবে ব্যক্তিগত কার, ব্যয়বহুল অটো-ট্যাক্সি এবং বাণিজ্যিক পরিবহন ও শহরের ভেতরকার দূরপাল্লার যাত্রী বাস। ঢাকার এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে যেতে উড়ালসড়ক কাজে দিলেও স্বল্পদূরত্বে তা কাজে আসবে কম। অথচ গবেষণা বলছে, স্বল্পদূরত্বের যাত্রীই বেশি এখন। বেশির ভাগ মানুষ সন্তানদের স্কুল ও কাজের এলাকার পাশেই আবাসন খুঁজে নিতে চেষ্টা করে যেহেতু, সেহেতু তাদের চাই স্বল্পদূরত্বে সাবলীল গতি। তাহলে হাজার হাজার কোটি টাকায় নির্মিত উড়ালসড়ক কত শতাংশ মানুষের জন্য বানানো হচ্ছে? ঢাকার মোট চলাচলের মাত্র সাড়ে ৩ শতাংশের হয় কার দিয়ে, যদিও তা দখল করে রাখে সড়কের ৪০ শতাংশ জায়গা। বাস আর রিকশা যথাক্রমে ৭ ও ৪১ শতাংশ জায়গা নিয়ে ঘটায় ২৮ ও ৫৩ শতাংশ চলাচল (ডিইউটিপি ২০০৫)। উড়ালসড়কের সম্পূর্ণ সুবিধা পাবে এসব ব্যক্তিগত কার, যা আসলে ঢাকার যানজটের জন্য দায়ী। রিকশা ও লোকাল বাস যাত্রীদের বড় অংশকে বহন করলেও তাদের অবস্থা হবে আরও করুণ। উড়ালসড়কের থামগুলোর জন্য জায়গা দিতে, ওঠা-নামার জায়গা ছেড়ে দিতে নিচের রাস্তাগুলো হয়ে পড়ছে আরও সরু, বাধাযুক্ত। ঢাকার সিংহভাগ মানুষেরই ব্যক্তিগত গাড়ি নেই। ভগ্নাংশের চলাচল সমস্যার সমাধানকে সবার সমাধান হিসেবে গিলিয়ে দেওয়াই কি উন্নয়ন? যে সুবিধা প্রায় নব্বই ভাগ মানুষের মাথার ওপরের সড়ক দিয়ে চলে যাবে, তা কেমন উন্নয়ন, কার উন্নয়ন? রাস্তার নৈরাজ্য কারিগরি নয়, রাজনৈতিক। কোটি মানুষ রাজনীতি আর অসাধু ব্যবসায়ীদের লোভের কাছে জিম্মি। এই উন্নয়ন সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষকে বাইপাস করে চলে যাচ্ছে আরও ওপরের দিকে পরিহাস হচ্ছে, উড়ালসড়কের গাড়িগুলোকেও জায়গায় জায়গায় মাটিতে নামতে হবে। যখন নিচের রাস্তা আরও সরু, অন্ধকার ও ধূলিময় হয়ে নারকীয় যানজট বাধাবে এবং গাড়িগুলো উড়ালসড়কে সাঁই সাঁই করে ছোটার পর যখন সেই যানজটে এসে নাক ডুবাবে, তখন আমরা ফিরে যাব আগের থেকেও আরও খারাপ দশায়। ইতিমধ্যে দেখা গেছে বিজয় সরণি, রামপুরা, মগবাজার, যাত্রাবাড়ীতে উড়ালসড়কের কারণে যানজট এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় গিয়ে আরও জোরদার হয়েছে। মানুষ টাকা দিয়ে সুখ কেনে, গতি কেনে। আর জনগণের টাকায় আমাদের সরকার যে যুগান্তকারী উন্নয়ন চালাচ্ছে, তার খরচ অবিশ্বাস্য। সময়ের কথা নাহয় বাদই দিলাম। দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী কেজরিওয়ালের তত্ত্বাবধানে গত নভেম্বরে নির্ধারিত সময়ের আগে এবং প্রাক্কলিত ব্যয়ের চেয়ে ১০০ কোটি রুপি কম খরচে একটা উড়ালসড়ক উদ্বোধন হয়। অথচ মগবাজার উড়ালসড়ক নির্মাণের ব্যয় প্রাক্কলিত ব্যয়ের চেয়ে তিন গুণ বেড়েছে। এগুলো হয়ে দাঁড়িয়েছে রাষ্ট্রীয় তহবিলকে কায়েমি গোষ্ঠীর হস্তগত করার নিয়মতান্ত্রিক পদ্ধতি। ‘স্ট্র্যাটেজিক ট্রান্সপোর্ট প্ল্যান ফর ঢাকা’র তথ্য উড়ালসড়ক সমর্থন করে না (ডেইলি স্টার, ১৪–১১–০৯)। এভাবে অবিশ্বাস্য বেশি ব্যয় ধরার মাধ্যমে সেই শ্রেণির হাতেই রাষ্ট্রীয় তহবিল চালান দেওয়ার বন্দোবস্ত হলো সেই উন্নয়নের আরেক দিক। চীনের দুঃখ নাকি হোয়াংহো নদী, ঢাকার দুঃখ এর রাজপথ। আমাদের পৃথিবীতে গতি নেই; দুর্গতি আছে। যানজটের যে অবস্থা তাতে দোলনা থেকে কবর পর্যন্ত ঢাকার মানুষকে মোটমাট সাড়ে সাত বছর রাস্তায় আটকে থাকতে হয়। অস্ট্রেলিয়ার যাত্রীরা যাতায়াতে সাপ্তাহিক ব্যয় করেন তিন ঘণ্টা ৩৭ মিনিট। ঢাকায় প্রতিদিনই লাগে কমপক্ষে তিন ঘণ্টা। বাংলাদেশের মানুষের গড় আয়ু এখন ৬৮ বছর। এ হিসাবে দোলনা থেকে কবর পর্যন্ত যাতায়াতের সময়ের আনুমানিক যোগফল হবে কমসে কম সাড়ে সাত বছর। এমন দেশ আর কোথায় পাব, যেখানে রাজধানীতে বসবাসের খেসারত হিসেবে আয়ুষ্কালের ৯ ভাগের ১ ভাগ গচ্চা দিতে হয়? কিন্তু এর জন্য দায়ী ব্যক্তিদের দিকে আঙুল উঁচিয়ে কি বলতে পারব, ফিরিয়ে দাও আমার জীবনের সাড়ে সাতটি বছর? যে দেশে যত গতি সে দেশ তত আধুনিক। ঢাকার চলাচলের ৬২ শতাংশ হয় হেঁটে। গরিব ও শ্রমজীবীদের আধুনিকতা এখনো হাঁটার স্তরেই পড়ে থাকল! চেক ঔপন্যাসিক মিলান কুন্ডেরা আধুনিক যুগের সঙ্গে মধ্যযুগের পার্থক্য করেছিলেন গতি দিয়ে। ঢাকার সড়কের গতি সেই অর্থে মধ্যযুগীয়। যে দেশে গতি বেশি, সে দেশে অর্থনৈতিক উন্নতি ও জীবনযাপনের স্বাধীনতা বেশি। এ দিক থেকে আমরা গতিদারিদ্র্যের কাতারভুক্ত দেশ। গতিই শক্তি। এই শক্তির অভাবে বাংলাদেশের তরুণেরা গতিশীল দুনিয়ার তরুণদের সঙ্গে পেরে ওঠেন না। মাথার ওপর দিয়ে যাওয়া উন্নয়ন মডেল তাদের মধ্যযুগেই আটকে রাখছে। ডিজিটাল বাংলাদেশে গতিযুদ্ধে পরাস্ত সৈনিকেরাই বাসের খুপরিমতো জানালায়, ফুটপাতে বিষণ্ন-বিধ্বস্ত মুখ নিয়ে হেঁটে যায়; গতি-অক্ষমতায় তাদের রিক্ত জীবন আরও তিক্ত হয়ে ওঠে। শহরের মানুষের চলাচলের জন্য দরকার গণপরিবহন। গাড়ি ব্যবসায়ী ও পরিবহন মালিকদের চাপে এর উন্নতি হচ্ছে না। রাস্তার নৈরাজ্য কারিগরি নয়, রাজনৈতিক। এই শহরের দেড় কোটি মানুষ রাজনীতি আর অসাধু ব্যবসায়ীদের লোভের কাছে জিম্মি। এই উন্নয়ন সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষকে বাইপাস করে চলে যাচ্ছে আরও ওপরের দিকে। বাকিদের জীবনের অন্ধকার কেবল আরও প্রগাঢ়ই হচ্ছে।

No comments:

Post a Comment