![]() |
| আজ থেকে ২২ বছর আগে এই দিনেই গ্যারি সোবার্সের রেকর্ড ভেঙেছিলেন লারা |
‘স্লামডগ
মিলিয়নিয়ার’ চলচ্চিত্রের প্রথম দৃশ্যে একটি প্রশ্ন করা হয়েছিল, ‘জামাল
মালিক কীভাবে দুই কোটি রুপি জিতলেন?’ একদম শেষ দৃশ্যে উত্তর দেওয়া হয়েছিল,
‘কারণ, এটিই লেখা ছিল ভাগ্যে।’ বাস্তব জীবন ও চলচ্চিত্রে অনেক ফারাক।
কিন্তু বাস্তব জীবনের কিছু গল্প মাঝেমধ্যেই রূপকথার গল্পগুলোকেও হার মানায়।
৪০০ ছোঁয়া ইনিংসটি অ্যান্টিগার রিক্রিয়েশন গ্রাউন্ডেই খেলার কথা ছিল
ব্রায়ান লারার; কারণ, ভাগ্যের যদি কিছু লিখে রাখার ইচ্ছে থাকে তবে সবার আগে
এরই নাম থাকার কথা! টেস্ট ক্রিকেটের কোনো গল্প করতে গেলেই ‘ইতিহাস’ কথাটি
বারবার আসে। সাদা পোশাকের এই ক্রিকেটে ঘটনা তো আর কম ঘটেনি। সে নিয়ে
কাব্যও হয়েছে ভূরি ভূরি। এত সব ঘটনা আর কাব্যের মাঝেও একটি গল্প লেখার কথা
মাথায় আসেনি কারও। সে এমনই এক অবিশ্বাস্য কীর্তি, যার কল্পনা করাটাও
দুঃসাধ্য কিছু বলেই ভাবা হতো। প্রথম ট্রিপল সেঞ্চুরির দেখা পেতেই যেখানে
অপেক্ষা করতে হয়েছে অর্ধশত বছরেরও বেশি সময়, সেখানে কোয়াড্রপল সেঞ্চুরি?!
কিন্তু ক্রিকেটের সৌভাগ্য, একজন ব্রায়ান চার্লস লারার জন্ম হয়েছিল। যিনি
উইকেটে থাকলে একজন কবিও নিজের কাব্য ভুলে যেতেন, একজন শিল্পীও তাঁর
রং–তুলিকে পাশে ফেলে রাখতেন। কারণ, লারার ব্যাটিং তো শুধু ব্যাটিং নয়, এ যে
শিল্প; যে শিল্পের দেখা যে খুব কদাচ মেলে, অজস্র পুণ্যের পরই যা দেখার
সৌভাগ্য হয় মানুষের। এ এমন এক ব্যাটসম্যান, যাঁর প্রথম শতকের ইনিংস এতটাই
মোহাচ্ছন্ন করে রেখেছিল প্রতিপক্ষকে যে শেষ পর্যন্ত রানআউট না হলে হয়তো
এখনো ব্যাট করেই যেতেন তিনি! না কোনো পাড় ভক্ত কিংবা ক্যারিবীয় মূর্ছনায়
খাবি খাওয়া কোনো ক্রীড়া লেখকের কথা নয়, এটি শেন ওয়ার্নের কথা। সেদিন লারার
মোহনীয় কিন্তু নির্দয় ব্যাটিংয়ের শিকার হয়েছিলেন তিনিও। ২০০৪ সালের ১২
এপ্রিলে দিনটিতে লারা নতুন করে ইতিহাস লিখবেন এ যেন ভবিতব্যই ছিল। ইতিহাসের
প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে টেস্টে কোয়াড্রপল সেঞ্চুরি? সেটিও লারারই করার কথা।
৩-০–তে পিছিয়ে থাকা সিরিজের শেষ টেস্ট। ধবল ধোলাই এড়ানোর লড়াই, সেই সঙ্গে
নিজের অধিনায়কত্ব টিকিয়ে রাখার শেষ চেষ্টা সব এক বিন্দুতে মিলে গিয়েছিল।
৩১৩ রান নিয়ে ব্যাট করতে নেমে লাঞ্চের আগেই মাত্র ছয় মাস আগে হারানো রাজত্ব
ফিরে পেলেন। ম্যাথু হেইডেনকে পেরিয়ে আবারও টেস্টের সর্বোচ্চ রানের ইনিংসের
মালিক লারা। বিরতির পর ফিরে আসতেই সেই অবিশ্বাস্য ক্ষণের দেখা মিলল।
আরেকটি চূড়ার উন্মোচন, ক্রিকেট অবশেষে পেল সেই মুহূর্ত, ৪০০! তবে এ হতে
পারত আরও অনেক আগেই, ঠিক ১০ বছর আগে, আজকের দিনেই! সেটিও ছিল সিরিজের শেষ
টেস্ট, সে দিনটিও ছিল টেস্টের তৃতীয় দিন। ১৯৯৪ সালের ১৮ এপ্রিল সকালেও
অ্যান্টিগার বাতাসে বিশ্ব রেকর্ড কথাটি ঘুরে বেড়াচ্ছিল। ৩২০ রান নিয়ে সেদিন
মাঠে নেমেছিলেন লারা। চোখে তাঁর ৩৬ বছর পুরোনো গ্যারি সোবার্সের বিশ্ব
রেকর্ড ভাঙার স্বপ্ন। ক্রিস লুইসের বলে চার মেরে যখন ৩৬৫ রানের সেই রেকর্ড
ভাঙলেন লারা, পুরো মাঠে ভেঙে পরল দর্শক। সোবার্স নিজে সেদিন মাঠে নেমেছিলেন
নিজের উত্তরসূরিকে অভিনন্দন জানানোর জন্য। রেকর্ড ভেঙেই ৪০০ ছোঁয়ার স্বপ্ন
দেখতে শুরু করেন লারা। কিন্তু ৩৭৫ রানে অ্যান্ড্রু ক্যাডিকের বলে আউট হয়ে
যাওয়ায় সেদিন তা আর হয়নি। এ নিয়ে সেদিন প্রতিপক্ষ অধিনায়ক মাইক আথারটনকে
প্রশ্নও করেছিলেন, একটু চাপ কমিয়ে তাঁর জন্য কাজটি একটু সহজ করে দেওয়া যেত
না? ৪০০ করার সুযোগ কি রোজ রোজ আসে! আথারটনের উত্তর ছিল, ‘এটি যদি সহজ
করে দিতাম, তবে আর উপভোগ করতে পারতে না। এর জন্য তোমাকে কষ্ট করতেই হবে।’
লারা কষ্ট করেছেন পরবর্তী ১০ বছর ধরে। সে জন্যই তো মাত্র সাত দিনের
ব্যবধানে দুবার বিশ্ব রেকর্ড ভাঙা, সেই অ্যান্টিগা মাঠ, সেই একই প্রতিপক্ষ,
সিরিজের শেষ টেস্ট কিংবা টেস্টের তৃতীয় দিনে ঠিক ৭ রানের ব্যবধানে ব্যাট
করতে নামা—এত কিছু মিলে যাওয়াকেও আর কাকতাল মনে হয় না। এ যেন হতোই, এ যে
ভবিতব্য। এমনটাই হওয়ার কথা ছিল। লারা যে একদিন ৪০০ রান করবেন—এ গল্প তো
আসলে লেখা হয়ে গিয়েছিল ১৮ এপ্রিল দিনটিতেই, গল্পটি সৃষ্টির ১০ বছর আগেই!

No comments:
Post a Comment