Tuesday, April 12, 2016

জড়িত ব্যক্তিরা গ্রেপ্তার হয়নি এক বছরেও by নজরুল ইসলাম

বর্ষবরণের অনুষ্ঠানের নিরাপত্তার জন্য রমনা পার্কে
ক্লোজড সার্কিট ক্যামেরা স্থাপন করা হচ্ছে
গত বছর পয়লা বৈশাখে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসির কাছে নারী লাঞ্ছনার ঘটনায় জড়িত হিসেবে একজনকে গ্রেপ্তারের দাবি করলেও বাকি সাতজনকে এক বছরেও খুঁজে পায়নি পুলিশ। গ্রেপ্তার হওয়া মো. কামাল (৩৫) নামের ওই ব্যক্তিও নারী লাঞ্ছনার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে অস্বীকার করেছেন। ওই নারী লাঞ্ছনায় জড়িত হিসেবে আটজনের ছবি গত বছরের মে মাসে প্রকাশ করেছিল পুলিশ। তাঁদের ধরিয়ে দিতে এক লাখ টাকা করে পুরস্কার ঘোষণাও করেছিল। কিন্তু তাঁদের গ্রেপ্তার করতে না পারায় তদন্ত শেষে ডিবি পুলিশ মামলার চূড়ান্ত প্রতিবেদন দিয়েছিল। তবে কামালকে গ্রেপ্তারের পর আদালতে আবেদন করে মামলাটি পুনরুজ্জীবিত করা হয়েছে। আগামী বৃহস্পতিবার ওই ঘটনার এক বছর পূর্ণ হচ্ছে। বর্তমানে মামলাটির তদন্তকারী সংস্থা পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) বলেছে, ওই ঘটনায় জড়িত দুই ছাত্রকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। এবার বর্ষবরণের দিনে অপ্রীতিকর ঘটনা ও যেকোনো ধরনের নাশকতা এড়াতে কয়েকটি পদক্ষেপ নিয়েছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। এর মধ্যে রয়েছে রমনা পার্ক ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের প্রবেশপথ বন্ধ করা হবে বিকেল চারটায়। এই দুটি স্থানে বিকেল পাঁচটার মধ্যে অনুষ্ঠান শেষ করে সবাইকে বেরিয়ে যেতে হবে। এসব স্থানে থাকবে ক্লোজড সার্কিট (সিসি) ক্যামেরা ও ওয়াচ টাওয়ার। এ ছাড়া রাজধানীতে গত রোববার থেকে শুরু হয়েছে বিশেষ অভিযান। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ আয়োজিত মঙ্গল শোভাযাত্রায় নিষিদ্ধ করা হয়েছে ভুভুজেলা বাঁশি ও মুখোশ পরা। ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার মো. মনিরুল ইসলাম বলেন, পয়লা বৈশাখ নিয়ে কোনো নাশকতার হুমকি নেই। তবে অতীত অভিজ্ঞতা ও সার্বিক নিরাপত্তার স্বার্থে যেকোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটতে পারে—এমন সাধারণ সম্ভাব্য ঝুঁকিগুলো মাথায় রেখে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে কিছু নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, চারুকলা অনুষদের মঙ্গল শোভাযাত্রায় মুখোশ পরা কাউকে অংশ নিতে দেওয়া হবে না। তবে মুখোশ হাতে রাখা যাবে। রোববার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ১৪ এপ্রিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ভুভুজেলা বাজানো ও বিক্রি, লাউড স্পিকারে গান বাজানো ও ব্যান্ড সংগীত সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। মামলা সূত্রে জানা যায়, গত বছর বর্ষবরণের দিন বিকেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিসংলগ্ন সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের ফটকে কয়েকজন নারী লাঞ্ছনার শিকার হন। ঘটনাটি গণমাধ্যমে প্রকাশিত হলে নিন্দা-প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। বিষয়টি সিসি ক্যামেরায় ধরা পড়ে। এরপর এ ঘটনায় পুলিশ শাহবাগ থানায় মামলা করে। এ ঘটনায় জড়িত হিসেবে আটজনের ছবি মে মাসে প্রকাশ করার পাশাপাশি পুলিশের মহাপরিদর্শক এ কে এম শহীদুল হক তাঁদের ধরিয়ে দিতে এক লাখ টাকা করে পুরস্কার ঘোষণা করেন। মামলাটি তদন্তের দায়িত্ব পায় ডিএমপির গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি)। ডিবি পুলিশ গত ২২ ডিসেম্বর এই মামলায় আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেয়। ওই সময় অভিযোগ ওঠে, ডিবি আন্তরিকভাবে তদন্ত না করে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দিয়েছে। এর এক মাস পর ডিবি ২৭ জানুয়ারি পুরান ঢাকার খাজে দেওয়ান লেনের বাসার সামনে থেকে সন্দেহভাজন হিসেবে মো. কামালকে গ্রেপ্তার করে বর্ষবরণের দিনে নারী লাঞ্ছনার মামলায় গ্রেপ্তার দেখায়। আদালত সূত্র বলেছে, কামালকে গ্রেপ্তারের পর মামলাটি পুনরুজ্জীবিত করা হয়। ২৩ ফেব্রুয়ারি আদালত পিবিআইকে মামলাটি অধিকতর তদন্তের নির্দেশ দেন। পিবিআই কামালকে দুই দফায় ১০ দিনের রিমান্ডে নেয়। তিনি জবানবন্দি দিতে রাজি না হওয়ায় তাঁকে কারাগারে পাঠানো হয়। ২৩ মার্চ আদালতে অধিকতর তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের দিন ধার্য ছিল। সেদিন প্রতিবেদন না দেওয়ায় ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম ১৭ এপ্রিল নতুন তারিখ ধার্য করেন। পিবিআইয়ের উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) বনজ কুমার মজুমদার প্রথম আলোকে বলেন, জিজ্ঞাসাবাদে কামাল পয়লা বৈশাখে টিএসসির কাছে যাওয়ার কথা জানিয়েছেন। তবে নারী লাঞ্ছনায় জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করেন এবং আদালতে জবানবন্দি দিতে রাজি হননি। তিনি বলেন, নারী লাঞ্ছনায় জড়িত আরও দুজনের অবস্থান জানা গেছে। তাঁরা ছাত্র। তাঁদের গ্রেপ্তারে চেষ্টা চলছে। পুলিশের ভিডিও ফুটেজে গত পয়লা বৈশাখে সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টা থেকে সাতটা সাত মিনিট পর্যন্ত সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের ফটকের সামনে ধাক্কাধাক্কি, হাতাহাতি ও নারী লাঞ্ছনার অস্পষ্ট ছবি দেখা গেলেও ওই সময়ে কামালকে দেখা যায়নি। পুলিশকে একাধিকবার লাঠি দিয়ে জড়ো হওয়া লোকজনকে সরিয়ে দিতে দেখা যায়। তবে ধাক্কাধাক্কির আগে ও পরে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের ফটকের সামনে কামালকে সাতবারের মতো ঘোরাঘুরি করতে দেখা গেছে। পুলিশের প্রকাশ করা কামালের ছবির সঙ্গে ভিডিও ফুটেজের ঘোরাঘুরি করা ওই ব্যক্তির চেহারার মিল আছে। কামালের বড় ভাই মো. বাদল বলেন, ‘প্রথম দিন থেকে আমরা বলছি, কামাল নারী লাঞ্ছনায় জড়িত নয়। সে নারী লাঞ্ছনা করেছে—এমন কোনো ছবি পুলিশের কাছেও নেই। কামাল জড়িত ছিল না বলেই আদালতে জবানবন্দি দেয়নি।’ মামলার আগের তদন্ত কর্মকর্তা ডিবির উপপরিদর্শক (এসআই) দীপক কুমার দাস বলেন, রিমান্ডে কামাল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় যাওয়ার কথা স্বীকার করলেও ঘটনার বিষয়ে কিছুই জানেন না বলেছেন। কামালের স্ত্রী ও স্বজনদের দাবি, কামাল স্ত্রী ও দুই শিশুসন্তানকে নিয়ে প্রতিবছরের মতো গত পয়লা বৈশাখেও টিএসসি মোড়ের কাছে গিয়েছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় যাওয়ায় অনেকের মতো হয়তো কামালের ছবি সিসি ক্যামেরায় ধরা পড়েছে।

No comments:

Post a Comment