![]() |
| চট্টগ্রাম বিভাগে এবারের জয়িতা (সামনে বাঁ থেকে) কানিজ ফাতেমা আহমেদ, সাজেদা বেগম, আনোয়ারা বেগম, (পেছনে বাঁ থেকে) শার্লী মেশৈ প্রু মারমা ও উনুয়ী মারমা |
সমাজের
তৃণমূলে প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করে জয়ী হচ্ছেন অনেক নারী। ২০১৩ সাল থেকে
তৃণমূলে সফল নারীদের খুঁজে বের করে সম্মানিত করছে সরকার। তাঁদের নাম দেওয়া
হয়েছে ‘জয়িতা’। ১২ এপ্রিল চট্টগ্রাম থিয়েটার ইনস্টিটিউট মিলনায়তনে বিভাগীয়
পর্যায়ে এবারের পাঁচ শ্রেষ্ঠ জয়িতাকে সম্মাননা দেওয়া হয়েছে। পড়ুন তাঁদের
যুদ্ধজয়ের কাহিনি ২০০৩ সালের মাঝামাঝি সময়। এক যুগ আগের ঘটনা। কিন্তু চার
সন্তানের জননী আনোয়ারা বেগমের মনে ঘটনার ক্ষত এখনো দগদগে। পাঁচ মাসের
শিশুকন্যা ও সাত বছর বয়সী বড় ছেলেকে নিয়ে কুমিল্লার মুরাদনগরের এলাকার
বাড়িতে এক রাতে ঘুমিয়ে ছিলেন আনোয়ারা। হঠাৎ তলপেটে প্রচণ্ড জ্বলুনিতে
আর্তচিৎকার করে ওঠেন। চিৎকার করছিল পাশে শোয়া দুই সন্তানও। স্থানীয়
বাসিন্দাদের সহায়তায় হাসপাতালে যাওয়ার পর জানতে পারেন দুই সন্তানসহ
অ্যাসিডের শিকার হয়েছেন তিনি। অন্য ঘরে থাকায় রক্ষা পায় বাকি দুই সন্তান।
বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাকের সহায়তায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের
বার্ন ইউনিটে তিন মাস চিকিৎসা নেন আনোয়ারা। কিছুটা সুস্থ হয়ে ফিরে আসেন
গ্রামে। এর মধ্যেই জানতে পারেন, এক লাখ টাকা যৌতুকের দাবি মেটাতে না পারায়
স্বামী নিজেই এ কাজ করেছেন। আর স্বামীর সংসারে ফেরা হয়নি। স্বামীর
বিরুদ্ধে মামলা করলেও অর্থের অভাবে চালাতে পারেননি। একটি স্থানীয় ক্লিনিকে
আয়ার কাজ করে কোনোমতে দুেবলা খাবার জোটাচ্ছিলেন। অভাবের সংসার, ষষ্ঠ
শ্রেণিতে ওঠার পর বড় ছেলের পড়াশোনায় ইতি টেনে স্থানীয় একটি আসবাবপত্র
তৈরির দোকানে কাজে লাগিয়ে দেন। এক বছর পরে বাকি ছেলেরাও একই কাজ শুরু করে।
এরপর ২০১০ সালে এক লাখ টাকা ঋণ নিয়ে নিজেই আসবাবপত্রের দোকান শুরু করেন।
এখন আনোয়ারা বেগম আটটি দোকানের মালিক। সংসারে আর অভাব নেই। সাহসিকতা
দেখিয়ে নতুন জীবন শুরু করা আনোয়ারা এবার হয়েছেন নির্যাতনের বিভীষিকা মুছে
ফেলে নতুন উদ্যমে জীবন শুরু করা শ্রেষ্ঠ নারী। এবার আরও যাঁরা সেরার
সম্মাননা পেয়েছেন তাঁরা হলেন অর্থনৈতিক সাফল্যে বান্দরবান জেলার শার্লী
মেশৈ প্রু মারমা, শিক্ষা ও চাকরি ক্ষেত্রে বান্দরবান জেলার উনুয়ী মারমা,
সফল জননী চট্টগ্রামের সাতকানিয়ার সাজেদা বেগম ও সমাজ উন্নয়নে কক্সবাজার
জেলার কানিজ ফাতেমা আহমেদ। তাঁদের সবার রয়েছে সমাজের নানা প্রতিকূলতা
পেরোনোর দুঃসহ কাহিনি। হোঁচট খেয়েছেন, আবার উঠে দঁাড়িয়েছেন। দমে যাননি।
অবশেষে সফলদের কাতারে তাঁরা।শার্লী মেশৈ প্রু মারমার জন্ম বান্দরবান সদরের
উজানিপাড়ায়। আট ভাইবোনের মধ্যে তিনি পঞ্চম। শার্লীর বয়স যখন ১০, তখন তাঁর
বাবা মারা যান। সহায়–সম্বলহীন মা এতগুলো সন্তানকে নিয়ে অথই সাগরে পড়েন।
১৯৮৬ সালে এক প্রতিবেশীর সহায়তায় ১১ বছর বয়সের শার্লী ও তাঁর ছোট ভাইয়ের
জায়গা হয় ঢাকার সাভারে একটি দাতব্য সংস্থার বিদ্যালয়ে। এরপর তৎকালীন সাংসদ
মা ম্যা চিংসহ নানাজনের সহায়তায় ১৯৯৭ সালে স্নাতক (পাস) শেষ করেন শার্লী।
বান্দরবানে ফিরে একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থায় চাকরি নেন। ১৯৯৯ সালে বিয়ের
পর স্বামীর সহায়তায় বান্দরবানের কুহালং ইউনিয়নে দুই কানি জমি কেনেন শার্লী।
অল্প দামে পরের বছর ১০ একরের একটি পাহাড়ের কিছুটা কেনেন, কিছুটা বন্দোবস্ত
নেন। পাহাড়ে লাগান ১০ হাজার সেগুনগাছ। এখন এই গাছই শার্লীর মূল্যবান
সম্পদ। বর্তমানে শার্লী ২০ একর জমির মালিক। সেগুনগাছের পাশাপাশি তাঁর রয়েছে
ফলদ বাগান। রয়েছে একটি এক একর আয়তনের পুকুর। সেখানে মাছ চাষ করছেন। তবে
নিজের উন্নয়নেই শার্লী থেমে থাকেননি। এখন তিনি বান্দরবানের স্থানীয় নারীদের
হস্তশিল্প প্রসারে কাজ করছেন। কিছুদিন আগে দেশের নামী পোশাক ব্র্যান্ড
আড়ংয়ে গায়ের চাদর, কম্বল ও মাফলার সরবরাহ করেছেন তিনি। এখন তাঁর স্বপ্ন
নিজের একটি বিক্রয়কেন্দ্র করা। নগদ টাকা না থাকায় এ জন্য তিনি সরকারের
সহায়তা চান। বান্দরবান জেলার থানচি উপজেলার বড় মদক বাজার গ্রামে জন্ম উনুয়ী
মারমার। মিয়ানমার সীমান্তের কাছে অবস্থিত ওই গ্রাম থেকে থানচি আসার
একমাত্র মাধ্যম নদী পথ। দুর্গম ওই এলাকা থেকে থানচি আসতেই এক দিনের বেশি
সময় লাগে। উনুয়ীর মা-বাবা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা পাননি। কিন্তু পরিবারের বড়
সন্তান উনুয়ীকে শিক্ষিত করার স্বপ্ন দেখেছিলেন। সেই স্বপ্ন শৈশবে গেঁথে
গিয়েছিল উনুয়ীর মাথার ভেতরেও। সে কারণে নানা কষ্ট সয়ে কখনো বুলিবাজারে
নানাবাড়িতে থেকে, কখনো বান্দরবান সদরে মিশনারি আশ্রমে থেকে অষ্টম শ্রেণি
শেষ করেন। নবম শ্রেণিতে ভর্তি হন রাউজানের কুণ্ডেশ্বরী বালিকা
বিদ্যামন্দিরে। সেখানে এসএসসি ও ঢাকায় গিয়ে এইচএসসি পড়েন। কিন্তু আর্থিক
দুরবস্থার কারণে আবারও বান্দরবানে ফিরে আসতে হয় উনুয়ীকে। এরপর টিউশনি করে
স্নাতক (পাস) শেষ করেন। ২০১২ সালে থানচি সরকারি উচ্চবিদ্যালয়ে অফিস সহকারীর
পদে যোগ দেন। বর্তমানে তিনি ভাইবোনদের পড়াশোনা করাচ্ছেন, পরিবারের খরচ
জোগাচ্ছেন। ১৯৯০ সালে স্বামী মারা যান সাতকানিয়া উপজেলার পশ্চিম
গাঁটিয়াডেঙ্গা এলাকার সাজেদা বেগমের। ওই সময় তাঁর বড় ছেলে চট্টগ্রাম
বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতকোত্তর শ্রেণিতে পড়ছিলেন। স্বামী মারা যাওয়ার পর বড়
ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে ছোট আরও তিন সন্তানকে সমাজে প্রতিষ্ঠিত করেন। সফল জননী
সাজেদা বেগমের বড় ছেলে একটি কলেজের সহকারী অধ্যাপক। একজন পরিকল্পনা কমিশনের
উপসচিব। বাকি দুই সন্তানের একজন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা ও
আরেকজন উচ্চ আদালতে আইনজীবী হিসেবে নিয়োজিত আছেন। সমাজসেবার স্বীকৃতি
হিসেবে এবার শ্রেষ্ঠ নারী কক্সবাজার জেলার কানিজ ফাতেমা আহমেদ। গত দুই দশক
ধরে তিনি বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে কাজ করে যাচ্ছেন। গুণী এই নারী একজন সফল
উদ্যোক্তাও। তাঁর বুটিক ব্যবসায় কর্মসংস্থান হয়েছে অনেক নারীর। তিনি
একাধারে জাতীয় মহিলা সংস্থার সভাপতি, কক্সবাজার জেলা মহিলা আওয়ামী লীগের
সভাপতি, কক্সবাজার মহিলা সমিতির সভাপতি ও বাংলাদেশ মহিলা সমিতির সদস্য।

No comments:
Post a Comment