Sunday, May 15, 2016

দাদা-দাদি, নানা-নানির কাছে ফিরছে শিশুরা

মা–বাবা দুজনেই কর্মজীবী। বড় একটা সময় পেশাগত কাজে
ঘরের বাইরে ব্যস্ত। তাই শিশু ওয়াসীত জাওয়াদকে
থাকতে হয় নানি রফিকা আলমের কাছে। নানির
সঙ্গেই তার বেশি সখ্য। ছবিটি রাজধানীর
মোহাম্মদপুর থেকে তোলা l প্রথম আলো
নব্বইয়ের দশকে আফ্রিকার দেশগুলোয় মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়ে এইচআইভি/এইডস। অল্পবয়স্ক নারী-পুরুষদের একটা অংশ প্রাণ হারায়। বেড়ে যায় শিশু আর বৃদ্ধদের সংখ্যা। শিশুদের ভবিষ্যৎ নিয়ে যখন গোটা বিশ্ব চিন্তিত, তখন এগিয়ে আসেন বৃদ্ধরা। শিশু আর বৃদ্ধ পরস্পরের ওপর ভর করে বাঁচল। শিল্পায়নের প্রভাবে একদিন দাদা-দাদি, নানা-নানির সঙ্গে বিচ্ছেদ ঘটেছিল নাতি-নাতনিদের। এক মহামারি এসে সেই সম্পর্ক পুনরুদ্ধার করল। জাতিসংঘ বলল, ‘বার্ধক্য উন্নয়নের নতুন শক্তি।’ আজ ১৫ মে আন্তর্জাতিক পরিবার দিবস। এ বছরের প্রতিপাদ্য ‘স্বাস্থ্যকর জীবন, টেকসই ভবিষ্যৎ’। এ উপলক্ষে জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি মুন বাণী দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, পরিবারের সবার জন্য অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করাই দিবসটি পালনের উদ্দেশ্য, যেন বিশ্বের মঙ্গলের জন্য প্রত্যেকে যার যার জায়গা থেকে কাজ করতে পারে। দিবসটি পালনে বাংলাদেশে কোনো কর্মসূচির কথা জানা না গেলেও সমাজবিজ্ঞানীরা পরিবারকাঠামোয় একটা পরিবর্তন দেখছেন। প্রতিবেদন তৈরির সময় সরকারি-বেসরকারি খাতে কর্মরত উচ্চবিত্ত, উচ্চমধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারের সঙ্গে কথা হয়। উচ্চবিত্ত-উচ্চমধ্যবিত্ত পরিবারগুলোয় গ্রামের বয়স্করা তাঁদের নাতি-নাতনিদের লালন-পালনের জন্য গ্রামের বাড়ি ছাড়ছেন। আবার সন্তানদের গ্রামের বাড়িতে দাদা-দাদি, নানা-নানির কাছে রেখে শহরে কাজ করছেন নিম্নবিত্ত পরিবারের বাবা-মা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ বিভাগের অধ্যাপক এএসএম আতীকুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, বাংলাদেশের পরিবারকাঠামোটা একটা পুলিশি কাঠামো। এখানে বাবা-মায়েরা পুলিশের ভূমিকায় অবতীর্ণ। শিশুরা তাদের আদর-আহ্লাদ মেটায় দাদা-দাদি, নানা-নানির কাছে। আর দৈনন্দিন আদর-ভালোবাসা, মান-অভিমানের মধ্যেই দাদা-দাদি, নানা-নানি তাঁদের নাতি-নাতনিদের সামাজিক মূল্যবোধগুলো শিখিয়ে দেন। একটা সময় বৃদ্ধদের বলা হতো ক্ষয়ে যাওয়া মানবাংশ।
দেরিতে হলেও সমাজ বুঝতে পারছে, তাঁরা অপরিহার্য। অবস্থার কারণে যেমন পরিবারের কাঠামোয় ইতিবাচক পরিবর্তন আসছে, তেমনি সরকারের পদক্ষেপ ও পরিকল্পনাতেও পড়ছে এটার ছাপ। সরকারি চাকুরেদের বেতনকাঠামো নির্ধারণে গঠিত ‘বেতন ও চাকরি কমিশন’ তাদের প্রতিবেদনে এবারই প্রথম ছয় সদস্যের পরিবারের কথা বলেছে। বেতন ও চাকরি কমিশনের প্রধান ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন এ বিষয়ে প্রথম আলোকে বলেন, ‘সরকারের সুপারিশে স্বামী-স্ত্রী, দুই সন্তানের সঙ্গে এবারই প্রথম বাবা-মাকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। প্রথম দিকে এ নিয়ে একটু দ্বিধাদ্বন্দ্ব থাকলেও আমরা সবাই এই সুপারিশকে সম্মান জানাই।’ জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক হেলাল উদ্দীন আহমেদ বলেন, বাবা-মায়ের ব্যস্ততার কারণে সন্তানেরা অনেক সময় যথেষ্ট মনোযোগ পায় না। এতে পারিবারিক বন্ধন আলগা হয়ে যায়। যেসব পরিবারে দাদা-দাদি, নানা-নানি থাকেন, সেসব পরিবারে বন্ধনটা থাকে। শিশুদের মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগের সমস্যা থাকে না। শিশুরা মানবিকতার চর্চা শেখে। শিশুটি যখন বড় হয়ে পরিবার গঠন করে, সেও একটি ভালো পরিবার গড়ে। আবেগ-অনুভূতিকে সম্মান দিতে শেখে। কোথায় ঘটছে পরিবর্তন এবং কেন: মোহাম্মদপুরে সাত বছরের ওয়াসীত জাওয়াদ নানির হাতে খায়, গোসল করে, নানির কাছেই গল্প শুনতে শুনতে ঘুমায়। বয়স সত্তর ছাড়ালেও কলাবাগানের মাফিদা আক্তার নাতি-নাতনির সঙ্গেই নানা পদের খাওয়ার বায়না মেটান। কথা হচ্ছিল শুল্ক কর্মকর্তা রুকবা ইফফাতের সঙ্গে। স্বামী নাবিল আহমেদ ব্যাংক কর্মকর্তা।
প্রথম আলোকে তিনি বলেন, ‘চাকরিতে ঢোকার পরই প্রথম চার মাস আমাকে চট্টগ্রামে থাকতে হলো। ছেলেটা ছোট। তারপর বদলি হলাম ধামরাইতে। এখন আমি ঢাকায়। এর মধ্যে আমার একটা মেয়েও হয়েছে। বাচ্চাদের দেখাশোনা করেন আমার মা রওশন আরা বেগম। তিনি ময়মনসিংহ থেকে ঢাকায় এসে থাকেন। ছুটিছাটায় আমার বাচ্চাদের নিয়েই ময়মনসিংহে যান।’ আবার উল্টো প্রবণতাও দেখা যায়। তৈরি পোশাক খাতে বাংলাদেশের যে নারীরা কাজ করছেন, তাঁদের অর্ধেকের বেশি সন্তানকে গ্রামে বাবা-মায়ের কাছে রেখে এসেছেন। লালমনিরহাটের মুসা মিয়া ও বৃষ্টি বেগম এমন এক দম্পতি। মুসা নারায়ণগঞ্জে ভ্যানগাড়ি চালান, আর বৃষ্টি পোশাক কারখানায় চাকরি করেন। পুরো পরিবার নিয়ে নারায়ণগঞ্জে থাকার সামর্থ্য তাঁদের নেই। তাঁদের তিন বছর বয়সী মেয়ে মুসলিমা গ্রামের বাড়িতে দাদির কাছে বড় হচ্ছে। সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, দাদা-দাদি, নানা-নানির সঙ্গে নাতি-নাতনির ভালোবাসার সম্পর্ক চিরন্তন। শুধু বাস্তবতা এককে অন্যের কাছ থেকে দূরে সরিয়ে রেখেছিল। এর শুরু শিল্পায়নের যুগে। এ সময় মানুষ তার বর্ধিত পরিবারকে গ্রামে রেখে শহরে চলে আসে। স্বামী-স্ত্রী ও সন্তানেরা মিলে একক পরিবারে বাস করতে শুরু করে। পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতি গ্রহণ পরিবারে আরেকটু পরিবর্তন আনে। একক বড় পরিবারগুলোর জায়গা নেয় ছোট একক পরিবার।
নতুন করে যে ধারাটি তৈরি হচ্ছে, তা তিন প্রজন্মকে কাছাকাছি নিয়ে আসছে। মূলত যেসব পরিবারে স্বামী-স্ত্রী দুজনেই কাজ করেন, সেখানেই এই পরিবর্তন চোখে পড়ছে। পরিবারের কাঠামোয় পরিবর্তন আসা নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ইনস্টিটিউটে আলাদাভাবে কোনো গবেষণা নেই। তবে প্রবীণ, শহুরে জীবনযাপন নিয়ে করা একাধিক গবেষণায় বিষয়টি উঠে এসেছে। গবেষণা বলছে, শিশুদের নিরাপত্তার স্বার্থে শহরে কর্মজীবী স্বামী-স্ত্রীর পক্ষে যদি তাঁদের বাবা-মায়ের সঙ্গে থাকা সম্ভব না হয়, তখন তাঁরা চেষ্টা করেন একই ভবনে বা একই পাড়ায় যতটা কাছাকাছি সম্ভব থাকতে। বেসরকারি সংস্থা অ্যাকশনএইড গাইবান্ধা ও লালমনিরহাটে এক নতুন ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। গাইবান্ধার দুটি ও লালমনিরহাটে দুটি মোট চারটি ইউনিয়নে দিবাযত্ন কেন্দ্র পরিচালনা করছে তারা। এই কেন্দ্রগুলোর অবস্থান গ্রামেই। অন্যান্য কেন্দ্রের সঙ্গে পার্থক্য হলো, এখানে বৃদ্ধ ও শিশুরা সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত একসঙ্গে থাকে। বৃদ্ধরা এলাকার অন্যান্য বৃদ্ধ-বৃদ্ধার সঙ্গে গল্প-গুজব করেন। ফাঁকে ফাঁকে নাতি-নাতনিদের খাওয়া-দাওয়া, দেখা-শোনার কাজটাও করেন। ইতিবাচক না নেতিবাচক: দাদা-দাদি, নানা-নানির কোলে ফিরে যাওয়ার এই ধারার সমালোচনা নেই। উন্নত দেশগুলোতেও এই পরিবর্তন ঘটছে।
২০১৩ সালে পিউ রিসার্চ সেন্টারের এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ২০০০ সাল থেকে দাদা-দাদি, নানা-নানিদের সঙ্গে নাতি-নাতনিদের এক ছাদের নিচে থাকার সংখ্যা বাড়তে শুরু করেছে। ২০১২ সাল পর্যন্ত এই ধারা অব্যাহত ছিল। এখন প্রতি ১০টি শিশুর একটি দাদা-দাদি, নানা-নানির সঙ্গে থাকে। সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, শিশুদের প্রয়োজনে স্বামী-স্ত্রী বৃদ্ধ বাবা-মাকে সঙ্গে রাখছেন। কিন্তু অনেক সময়ই তাঁদের প্রয়োজনের কথা ভাবছেন না। প্রবীণদের আয়-রোজগার নেই, কিন্তু খরচ আছে। তাঁদের পুষ্টি চাহিদা আছে। অনেক বৃদ্ধ-বৃদ্ধাই গ্রামের বা মফস্বলের খোলামেলা বাড়ি ছেড়ে আসতে চান না। কাজেই তাঁদের থাকার জায়গাটাও ভালো হওয়া চাই।
আশার কথা হলো, বাংলাদেশ এরই মধ্যে জাতীয় প্রবীণ নীতিমালায় বাড়িতে আলাদাভাবে ‘প্যারেন্টস রুম’ করার কথা বলা হয়েছে। বৃদ্ধ বাবা-মায়ের সুরক্ষা নিশ্চিত করেছে পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইন। (প্রতিবেদনটি তৈরিতে তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করেছেন প্রথম আলোর গাইবান্ধা ও লালমনিরহাট প্রতিনিধি)

No comments:

Post a Comment