বাংলাদেশে
যেসব বিদেশি বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান ব্যবসা করতে আসে, তারা করহারের চেয়েও
হয়রানিকে বেশি ভয় পায়। কর দেওয়ার প্রক্রিয়াকে সহজ করা হলে বিদেশি
বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে সরকারের রাজস্ব প্রাপ্তি কয়েক গুণ বাড়বে। এমন
অভিমত উঠে এসেছে বহুজাতিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান প্রাইসওয়াটার হাউস কুপারস
(পিডব্লিউসি) বাংলাদেশের প্রাক্-বাজেট প্রস্তাবে। আগামী ২০১৬-১৭ অর্থবছরের
বাজেটে রাজস্ব আয় বাড়াতে সরকার কোন কোন বিষয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে পারে, সে
বিষয়ে বিভিন্ন পরামর্শ তুলে ধরে একটি প্রস্তাব তৈরি করেছে পিডব্লিউসি।
প্রস্তাবের বিভিন্ন দিক তুলে ধরতে গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর গুলশানে
প্রতিষ্ঠানটির কার্যালয়ে এক আলোচনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এতে বক্তব্য
দেন পিডব্লিউসি বাংলাদেশের ব্যবস্থাপনা অংশীদার মামুন রশিদ, পিডব্লিউসির
ট্যাক্স অ্যান্ড রেগুলেটরি সার্ভিসেসের পরিচালক সুস্মিতা বসু প্রমুখ। মামুন
রশিদ বলেন, বাংলাদেশে ব্যবসা করে বিদেশি বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানগুলো
মুনাফা করতে পারে। কিন্তু সে মুনাফা বাংলাদেশ থেকে নিয়ে যাওয়া খুব কঠিন।
এটা বিনিয়োগকারীদের ভবিষ্যৎ বিনিয়োগের ক্ষেত্রে নেতিবাচক বার্তা হিসেবে কাজ
করে। তিনি আরও বলেন, বিদেশি কোম্পানিগুলো উচ্চ করহারকে যত না ভয় পায়, তার
চেয়ে বেশি ভয় হয়রানিকে। করবিষয়ক আইন ও নীতিমালার বিভিন্ন ব্যাখ্যা ও প্রয়োগ
নিয়েও ভয়ে থাকেন বিনিয়োগকারীরা। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের গবেষণার
উদ্ধৃতি দিয়ে আলোচনায় বলা হয়, বাংলাদেশে বছরে ছয় হাজার ডলার বা প্রায় পাঁচ
লাখ টাকা আয় করেন এমন জনগোষ্ঠীর সংখ্যা দেড় কোটি।
আর
বছরে সাড়ে তিন হাজার ডলার বা আড়াই লাখ টাকার বেশি আয় করেন এমন জনগোষ্ঠী
আছে তিন কোটি। আর সে তুলনায় বছরে কর দেন গড়ে ১১ লাখ মানুষ। করসংক্রান্ত
আইনে ফাঁকফোকর থাকার কারণেই বিপুলসংখ্যক জনগোষ্ঠী আয়করের আওতার বাইরে আছেন।
রাজস্ব প্রাপ্তি বাড়াতে করের আওতা বাড়ানোর সুপারিশ করেছে পিডব্লিউসি।
যেকোনো পণ্য বা সেবার ক্ষেত্রে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের প্রস্তাবিত অভিন্ন
হারে মূল্য সংযোজন কর (মূসক) আদায়ের পরিকল্পনার সঙ্গে একমত পোষণ করেছে
পিডব্লিউসি। এই মূসক আইন বাস্তবায়িত হলে পণ্যসেবার মূল্যবৃদ্ধি পেয়ে
ভোক্তাপর্যায়ে চাপ তৈরি করতে পারে বলে মনে করে প্রতিষ্ঠানটি। তবে সামগ্রিক
রাজস্ব ব্যবস্থাপনার বিবেচনায় নতুন মূসক আইন বাস্তবায়নের কোনো বিকল্প
নেই—এমন মতামত তুলে ধরা হয় পিডব্লিউসির সুপারিশে। কর ও মূসক আদায়
প্রক্রিয়াকে ডিজিটাল বা অনলাইনভিত্তিক করার ওপর জোর দিয়েছে পিডব্লিউসি।
অনলাইনে মূসক আদায়ের ব্যবস্থা করা হলে তা সরকারের যথাযথ রাজস্ব প্রাপ্তি
বৃদ্ধি করবে ও রাজস্ব আদায়ের খরচ কমিয়ে আনবে।
একই
সঙ্গে করদাতাদের ভোগান্তিও অনেকটাই কমবে। বহুজাতিক বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোর
জন্য ‘ট্রান্সফার প্রাইসিং’ প্রক্রিয়া সহজ করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে
পিডব্লিউসির প্রস্তাবে। এ বিষয়ে বলা হয়, বিশ্বের অন্যান্য দেশের সঙ্গে
তুলনা করা যায় ট্রান্সফার প্রাইসিং-বিষয়ক এমন কোনো তথ্যভান্ডার বাংলাদেশে
নেই। এমন একটি তথ্যভান্ডার তৈরি করা হলে তা প্রযুক্তি আমদানির নামে অর্থ
পাচার প্রক্রিয়া প্রতিরোধে সহায়ক হতে পারে। কর দেওয়ার ক্ষেত্রে বিভিন্ন
প্রতিষ্ঠানের আয়বর্ষের হিসাবের জটিলতা এড়ানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে
পিডব্লিউসির প্রাক্-বাজেট সুপারিশে। ইতিমধ্যেই কর দিচ্ছেন এমন কোনো
ব্যক্তির আয় যদি এক অর্থবছরে নির্ধারিত ন্যূনতম কর সীমার কম হয়, সে
ক্ষেত্রে ওই ব্যক্তির আয়কর ফাইল জমা দেওয়ার ক্ষেত্রে করণীয় সম্পর্কে
পরিষ্কার নির্দেশনা থাকার সুপারিশ করা হয়েছে।

No comments:
Post a Comment