দেশের
ব্যাংক খাতে গত ডিসেম্বর শেষে প্রকৃত খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায়
৯২ হাজার কোটি টাকা। নিয়মিত খেলাপি ও অবলোপন করা ঋণ মিলিয়ে প্রকৃত
খেলাপির বিপুল এ পরিমাণ দাঁড়িয়েছে। এর মধ্যে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৫১ হাজার
৩৭১ কোটি ও অবলোপন করা ঋণের পরিমাণ ৪০ হাজার ৩৬০ কোটি টাকা। ব্যাংক খাতে
সাধারণত খেলাপি ঋণের হিসেবে অবলোপন করা ঋণকে হিসাবে ধরা হয় না। এতে করে
সাধারণভাবে খেলাপি ঋণের পরিমাণ কিছুটা কম দেখানো হয়। অর্থনীতিবিদ ও
ব্যাংকারদের মতে, অবলোপন করা ঋণও প্রকৃত খেলাপি ঋণ। যেসব ঋণ আদায়ের
সম্ভাবনা একেবারে ক্ষীণ, সেসব ঋণকে আর্থিক হিসাবের সুবিধার্থে ব্যাংকের
স্থিতিপত্র বা ব্যালেন্স শিট থেকে বাদ দেওয়া হয়। এর ফলে ওই সব অনাদায়ি ঋণ
লোকচক্ষু ও খেলাপি হিসাবের আড়ালে চলে যায়। এদিকে, ২০১৫ সালে বিশেষ
রাজনৈতিক বিবেচনায় বাংলাদেশ ব্যাংক বিভিন্ন ব্যাংকের প্রায় ১৫ হাজার কোটি
টাকার ঋণ পুনর্গঠনের সুবিধা দেয়। সেসব ঋণ আদায়ও দীর্ঘদিন ধরে অনিয়মিত হয়ে
পড়েছিল। তাই বিশেষ বিবেচনায় সেসব ঋণকে বিশেষ সুবিধার আওতায় নিয়মিত করার
সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে। তাই সেই ১৫ হাজার কোটি টাকার অনিয়মিত ঋণকে হিসাবে
ধরলে ব্যাংক খাতে প্রকৃত খেলাপি ঋণের পরিমাণ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেত।
বাংলাদেশ ব্যাংকের গত ডিসেম্বরের সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, ব্যাংক খাতে বিতরণ
করা মোট ঋণের পরিমাণ প্রায় ৫ লাখ ৮৪ হাজার কোটি টাকা। চট্টগ্রাম
বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষক ও বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির সাবেক
সভাপতি মইনুল ইসলাম বলেন, ‘অবলোপন করা ঋণকে আড়ালে রেখে জনগণের সঙ্গে
প্রতারণা করা হচ্ছে। ঋণ অবলোপন করে ব্যাংকগুলো খেলাপি ঋণ কমিয়ে দেখাচ্ছে।
কারণ, অবলোপন করা ঋণকে আলাদাভাবে প্রদর্শন করা হয়। আমার হিসাবে বাংলাদেশে
খেলাপি ঋণ ২ লাখ কোটি টাকার বেশি।’ মইনুল ইসলাম আরও বলেন, ‘যাঁদের ঋণ
অবলোপন করা হয়েছে, তাঁদের অনেকে পরবর্তী সময়ে ব্যাংকের চেয়ারম্যান ও
পরিচালক হয়েছেন। অথচ আমাদের প্রতিবেশী দেশসহ বিশ্বের অনেক দেশে ঋণখেলাপিদের
জেল-জরিমানার নজির রয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশে এমন নজির দেখা যায় না।’
কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী,
অবলোপন করা ঋণ বেশির ভাগ রাষ্ট্রমালিকানাধীন চার ব্যাংকের। সোনালী,
অগ্রণী, জনতা ও রূপালী—এই চার ব্যাংকের অবলোপন করা মোট ঋণের পরিমাণ ১৮
হাজার ১৬২ কোটি টাকা। এ ছাড়া বেসরকারি বাণিজ্যিক, বিদেশি ও বিশেষায়িত
ব্যাংক মিলিয়ে অবলোপন করা ঋণের পরিমাণ ২২ হাজার ১৯৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে
এককভাবে সর্বাধিক ঋণ অবলোপন করেছে বেসরকারি ন্যাশনাল ব্যাংক। ব্যাংকটির
অবলোপন করা ঋণের পরিমাণ ২ হাজার ১৫৪ কোটি টাকা। এর বাইরে আইএফআইসি
ব্যাংকের ১ হাজার ৩৬২ কোটি টাকা, দ্য সিটি ব্যাংকের ১ হাজার ২৩৯ কোটি
টাকা, ব্র্যাক ব্যাংকের ১ হাজার ১৩৬ কোটি টাকা, উত্তরা ব্যাংকের ১ হাজার
১২৯ কোটি টাকা, প্রাইম ব্যাংকের ১ হাজার ১১০ কোটি টাকা, পূবালী ব্যাংকের ১
হাজার ৩২ কোটি টাকা, ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকের ১ হাজার ১১ কোটি টাকা,
এবি ব্যাংকের ৯০১ কোটি টাকা ও সাউথইস্ট ব্যাংকের ৮৯৩ কোটি টাকা ঋণ অবলোপন
করা হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিমালার আলোকে ২০০৩ সাল থেকে ব্যাংক ঋণ
অবলোপনের সুযোগ তৈরি হয়। এদিকে ৫১ হাজার ৩৭১ কোটি টাকার নিয়মিত খেলাপি
ঋণের মধ্যে রাষ্ট্রমালিকানাধীন চার ব্যাংকের খেলাপির পরিমাণ ১৬ হাজার ৭০২
কোটি টাকা। আর বেসরকারি ৩৯টি বাণিজ্যিক ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ ২০
হাজার ৭৬০ কোটি টাকা। বাকি খেলাপি ঋণ বিদেশিসহ অন্য ব্যাংকগুলোর। জানতে
চাইলে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সাবেক গবেষণা পরিচালক ও অগ্রণী
ব্যাংকের চেয়ারম্যান জায়েদ বখ্ত বলেন, খেলাপি ও অবলোপন করা ঋণ সব মিলিয়েই
খেলাপি ঋণ। বাংলাদেশে সুদের হার বেশি হওয়ার প্রধান কারণ এই খেলাপি ঋণ।
ব্যাংকগুলোর আয় খেয়ে ফেলছে এ ধরনের মন্দ ঋণ। আর্থিক ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার
কারণে এত খেলাপি ঋণ তৈরি হয়েছে।
ঋণ অবলোপনকারী শীর্ষ ১০ ব্যাংক (কোটি টাকায়)
ব্যাংক টাকা
ন্যাশনাল ব্যাংক ২,১৫৪
আইএফআইসি ১,৩৬২
সিটি ব্যাংক ১,২৩৯
ব্র্যাক ব্যাংক ১,১৩৬
উত্তরা ব্যাংক ১,১২৯
প্রাইম ব্যাংক ১,১১০
পূবালী ব্যাংক ১,০৩২
ইউসিবি ১,০১১
এবি ব্যাংক ৯০১
সাউথইস্ট ব্যাংক ৮৯৩
৫১ হাজার ৩৭১ কোটি টাকা খেলাপি
অবলোপন করা ঋণের পরিমাণ ৪০ হাজার ৩৬০ কোটি টাকা
অবলোপন করা ঋণকে আড়ালে রেখে জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করা হচ্ছে
মইনুল ইসলাম
সাবেক সভাপতি, অর্থনীতি সমিতি
ঋণ অবলোপনকারী শীর্ষ ১০ ব্যাংক (কোটি টাকায়)
ব্যাংক টাকা
ন্যাশনাল ব্যাংক ২,১৫৪
আইএফআইসি ১,৩৬২
সিটি ব্যাংক ১,২৩৯
ব্র্যাক ব্যাংক ১,১৩৬
উত্তরা ব্যাংক ১,১২৯
প্রাইম ব্যাংক ১,১১০
পূবালী ব্যাংক ১,০৩২
ইউসিবি ১,০১১
এবি ব্যাংক ৯০১
সাউথইস্ট ব্যাংক ৮৯৩
৫১ হাজার ৩৭১ কোটি টাকা খেলাপি
অবলোপন করা ঋণের পরিমাণ ৪০ হাজার ৩৬০ কোটি টাকা
অবলোপন করা ঋণকে আড়ালে রেখে জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করা হচ্ছে
মইনুল ইসলাম
সাবেক সভাপতি, অর্থনীতি সমিতি

No comments:
Post a Comment