Thursday, May 26, 2016

ভালো-মন্দে মোদির দুই বছর

নরেন্দ্র মোদি
ভালো-মন্দে দুটি বছর কাবার করে কাল থেকে তৃতীয় বছরের যাত্রা শুরু করছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী বিজেপির নেতা নরেন্দ্র মোদি। দ্বিতীয় বর্ষপূর্তির মাহেন্দ্রক্ষণে ‘টিম মোদিকে’ আপাতত পরম স্বস্তি এনে দিয়েছে পাঁচ রাজ্যের বিধানসভার ফল। প্রথমবারের মতো আসামের নিরঙ্কুশ কবজা যদি সেই স্বস্তির প্রথম কারণ হয়ে থাকে, দ্বিতীয় কারণ তা হলে তাঁরই তোলা ‘কংগ্রেসমুক্ত ভারত’ গড়ার স্লোগানের ক্রমশ সার্থকতার দিকে এগিয়ে চলা। মোদির কাছে আরও আনন্দের বিষয় এটাই যে পাঁচ রাজ্যে তারা নিজের নাক না কেটেই কংগ্রেসের যাত্রা ভঙ্গ করতে পেরেছে। আসামকে কংগ্রেসমুক্ত করেছে, কেরালা বিধানসভায় নিজেদের উপস্থিতি এই প্রথমবারের মতো জানান দেওয়ার পাশাপাশি প্রাপ্ত ভোটের হারও বাড়িয়ে নিয়েছে। তামিলনাড়ুতে অপ্রত্যাশিতভাবে ক্ষমতা দখল করে জয়ললিতা আরও পাঁচ বছরের মতো ডিএমকে-কংগ্রেস জোটকে সমুদ্রতটে আটকে রেখে একদা মিত্র বিজেপিকে আশ্বস্ত করেছেন। এমনকি পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভায়ও বিজেপি তার শক্তি ও উপস্থিতি কিছুটা বাড়িয়ে দুঃস্বপ্নের নগরীতে নির্বাসিত করেছে কংগ্রেস ও বামপন্থীদের। কাশ্মীর থেকে কেরালা ও গুজরাট থেকে অরুণাচল পর্যন্ত বিজেপির ব্যাপ্তি এই প্রথমবারের মতো সম্ভব হতে পারল মোদি-জমানাতেই। দ্বিতীয় বর্ষপূর্তিতে এই তৃপ্তি মোদিকে মোহিত রাখার পক্ষে যথেষ্ট। এই দুই বছরে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি একটিবারের জন্যও সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধিদের এক জোট করে প্রশ্ন তোলার সুযোগ দেননি। দলীয় মহলে তিনি বলেছিলেন, ‘আমার কাজই হবে আমার সরকারের উত্তর।’ সেই উত্তর মোদি যেমন দিয়েছেন মধ্যপ্রাচ্যের দুর্যোগপূর্ণ দিনগুলোতে দেশের মানুষকে নির্বিঘ্নে ফিরিয়ে এনে, তেমনই দিলেন ইরান সফরে সার্থক চাবাহার চুক্তির মধ্য দিয়ে। পররাষ্ট্রনীতিতে মোদির সবচেয়ে বড় সাফল্য প্রতিবেশী বাংলাদেশের সঙ্গে মৈত্রী দিন দিন দৃঢ় করে বন্ধুত্ব ও সহযোগিতার এক নতুন আবহের সৃষ্টি করায়। পররাষ্ট্রনীতিতে অস্বস্তির কাঁটা যদি কিছু থেকে থাকে, তাহলে তা চিরবৈরী পাকিস্তান। মোদির আমলেই এই দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক তৈলাক্ত বাঁশ বেয়ে বানরের ওঠা-নামার মতো এগিয়েছে-পিছিয়েছে। অসাফল্যের এটা যদি হয় প্রথম উদাহরণ, দ্বিতীয়টি তাহলে নেপাল। সামাজিক দিক থেকে মোদির সবচেয়ে বড় সাফল্য দরিদ্রের ক্ষমতায়ন।
এ জন্য অবশ্যই ধন্যবাদ প্রাপ্য তাঁর পূর্বসূরি মনমোহন সিংয়ের। কংগ্রেস আমলে শুরু হওয়া আধার কার্ড প্রকল্পকে তিনি অন্য এক মাত্রা দিতে পেরেছেন ‘জন ধন’ ও ‘গিভ ইট আপ’ প্রকল্পের মধ্য দিয়ে। জন ধন প্রকল্পে এ পর্যন্ত প্রায় ২২ কোটি দরিদ্র মানুষ রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোতে হিসাব খুলতে পেরেছেন। ‘উজ্জ্বলা’ প্রকল্পে চলতি আর্থিক বছরে দারিদ্র্যসীমার নিচে থাকা দেড় কোটি মানুষকে বিনা পয়সায় রান্নার গ্যাস সরবরাহ শুরু করেছে মোদি সরকার। সংসদের উচ্চকক্ষ রাজ্যসভায় সংখ্যাধিক্য না থাকাটা মোদির সংস্কারের পথের বড় অন্তরায়। অভিন্ন পণ্য মাশুল ও পরিষেবা কর (জিএসটি) প্রচলন তাই বারবার পিছিয়ে যাচ্ছে। আলোচনা প্রায় বন্ধ গুরুত্বপূর্ণ জমি বিল নিয়েও। ভোটে বিপুল সাফল্য সত্ত্বেও ‘নারী বিল’ নিয়ে মোদি এক পাও এগোতে পারেননি। এটা অবশ্যই তাঁর সরকারের বড় ব্যর্থতা। গত দুই বছরে কাশ্মীরসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সন্ত্রাসী হানা অব্যাহত। প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে রয়েছে কালোটাকা দেশে ফেরানো নিয়ে সরকারি উদ্যোগ। নির্বাচনী ভাষণ ও বাস্তবের মিল-অমিল কতটা, কালোটাকা নিয়ে মোদির ভাষণ তার জ্বলন্ত উদাহরণ। দুই বছরের সাফল্য-ব্যর্থতার এই খতিয়ানের মধ্যেই উঠে এসেছে ভারতের বহুত্ববাদী চরিত্রের অস্তিত্ব ঘিরে সেই মোক্ষম প্রশ্ন। ক্রমবর্ধমান সামাজিক ও ধর্মীয় অশান্তি এযাবৎ লালিত ধর্মনিরপেক্ষতাকে শেষ পর্যন্ত অটুট রাখতে পারবে কি? মোদি জমানায় বছর বছর এই প্রশ্ন ঘুরেফিরে উঠবেই; কারণ, এই প্রসঙ্গে নরেন্দ্র মোদি গত দুই বছরে একবারের জন্যও মুখ খোলেননি। এমনকি খোলামেলা কথা বলার ‘মন কি বাত’ অনুষ্ঠানেও নয়।

No comments:

Post a Comment