![]() |
| মতিউর রহমান নিজামীকে গত রোববার রাতে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে নেওয়া হয় l ছবি: জিয়া ইসলাম |
একাত্তরে
মুক্তিযুদ্ধকালে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে ফাঁসির আদেশপ্রাপ্ত জামায়াতে
ইসলামীর আমির মতিউর রহমান নিজামীকে রিভিউ (রায় পুনর্বিবেচনা) খারিজের
পূর্ণাঙ্গ রায় পড়ে শোনানো হয়েছে। গতকাল সোমবার রাতে ঢাকা কেন্দ্রীয়
কারাগারের ফাঁসির (কনডেমড) সেলে থাকা নিজামীকে এ রায় পড়ে শোনায় কারা
কর্তৃপক্ষ। ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের সূত্র বলেছে, পূর্ণাঙ্গ রায়
পৌঁছানোর পর রাত সাড়ে আটটার দিকে তা নিজামীকে পড়ে শোনানো হয়। এরপর
চিকিৎসকেরা তাঁর স্বাস্থ্য পরীক্ষা করেন। এর আগে গতকাল নিজামীর রিভিউ
খারিজের পূর্ণাঙ্গ রায় সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের সংশ্লিষ্ট শাখা থেকে
প্রকাশিত হয়। ২২ পৃষ্ঠার এই রায় লিখেছেন প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার
সিনহা, এতে বেঞ্চের অপর তিন বিচারপতি একমত হয়ে সই করেছেন। বিকেল পাঁচটার
দিকে এই রায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রেজিস্ট্রারের কার্যালয়ে
পৌঁছায়। ট্রাইব্যুনাল থেকে পূর্ণাঙ্গ রায় সন্ধ্যায় ঢাকা কেন্দ্রীয়
কারাগারে পৌঁছায়। নিজামীকে গত রোববার রাতে গাজীপুরের কাশিমপুর কারাগার
থেকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে আনা হয়। এর আগে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে
মৃত্যুদণ্ডাদেশ পাওয়া চারজনের দণ্ড এই কারাগারে কার্যকর হয়েছে। তাঁরা হলেন
জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মাদ মুজাহিদ, দুই সহকারী
সেক্রেটারি জেনারেল মুহাম্মদ কামারুজ্জামান ও আবদুল কাদের মোল্লা এবং
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাউদ্দিন কাদের (সাকা) চৌধুরী। আপিল
বিভাগের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হওয়ার পর অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম
নিজ কার্যালয়ে সাংবাদিকদের বলেন, রিভিউ খারিজ হওয়ায় এখন মৃত্যুদণ্ড
কার্যকরের প্রক্রিয়া শুরু হবে। তবে তিনি যদি রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষার
আবেদন করতে চান, তাহলে তাঁকে সেই সুযোগ দেওয়া হবে। রাষ্ট্রপতির কাছে
ক্ষমাপ্রার্থনার বিষয়টির নিষ্পত্তি হলেই সরকার দণ্ড কার্যকর করবে। রিভিউয়ের
রায়ের প্রসঙ্গে মাহবুবে আলম বলেন, আপিল বিভাগ নিজামীর ফাঁসির রায়
পুনর্বিবেচনা করার মতো কোনো যুক্তি পাননি। বিশেষ করে, তাঁর মৃত্যুদণ্ড
পরিবর্তন করে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়ার যে প্রার্থনা ছিল, তা মঞ্জুর করার
কোনো কারণ ছিল না। আদালত বলেছেন, নিজামীর অপরাধ এত জঘন্য ছিল যে, তা
মওকুফের কোনো কারণ নেই। যেহেতু তাঁর আইনজীবীরা দণ্ড মওকুফের কথা বলেছেন,
কাজেই তিনি অপরাধের সঙ্গে যুক্ত নন, তা বলা যাবে না। ৫ মে নিজামীর রিভিউ
আবেদন খারিজ করেন আপিল বিভাগের বেঞ্চ। প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন আপিল
বিভাগের চার সদস্যের এই বেঞ্চের অন্য সদস্যরা হলেন বিচারপতি নাজমুন আরা
সুলতানা, বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন ও বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী।
গতকাল রিভিউ খারিজের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হলো। আপিল বিভাগ ও
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায়ে নিজামীকে বলা হয়েছে একাত্তরের
বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের নকশাকার। ২০০০ সালে সেই নিজামীই হন মুক্তিযুদ্ধের
বিরোধিতাকারী দল জামায়াতে ইসলামীর আমির। বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট
সরকারের আমলে (২০০১-২০০৬) তিনি প্রথমে কৃষি ও পরে শিল্পমন্ত্রী ছিলেন। এ
নিয়ে ট্রাইব্যুনাল রায়ে বলেছিলেন, নিজামীকে এ দেশের মন্ত্রী করার মধ্য দিয়ে
মুক্তিযুদ্ধের ৩০ লাখ শহীদ ও সম্ভ্রমহারা ২ লাখ নারীর গালে চড় মারা হয়েছে।
এটা জাতির জন্য লজ্জা, অবমাননা। তিন অভিযোগে ফাঁসি: ২০১৪ সালের ২৯ অক্টোবর
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল নিজামীর বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের
মামলার রায় ঘোষণা করেন। তাঁর বিরুদ্ধে ১৬টি অভিযোগের মধ্যে আটটি প্রমাণিত
হয়। এর মধ্যে চারটি অভিযোগে তাঁকে ফাঁসির আদেশ দেন ট্রাইব্যুনাল। এই রায়ের
বিরুদ্ধে নিজামীর আপিলের রায় ঘোষণা করা হয় চলতি বছরের ৬ জানুয়ারি। আপিলে
আরও তিনটি অভিযোগ থেকে নিজামী খালাস পান। বাকি পাঁচটি অভিযোগে তাঁকে
ট্রাইব্যুনালের দেওয়া দণ্ড বহাল রাখেন আপিল বিভাগ, এর মধ্যে তিনটিতে
মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। এগুলো হলো পাবনার সাঁথিয়া উপজেলার রূপসী, বাউসগাড়ি ও
ডেমরা গ্রামের ৪৫০ জনকে নির্বিচার হত্যা ও ধর্ষণ, ধুলাউড়ি গ্রামে ৫২ জনকে
হত্যা এবং বুদ্ধিজীবী হত্যার পরিকল্পনা। বাকি দুটি অভিযোগে তাঁকে যাবজ্জীবন
কারাদণ্ড দেন সর্বোচ্চ আদালত।

No comments:
Post a Comment