Saturday, May 14, 2016

১২ বছরে গ্যালারি কায়া by জাহীদ রেজা নূর

প্রদর্শনীতে থাকবে শিল্পী মুর্তজা বশীরের
১৯৫৩ সালে জলরঙে আঁকা এই ছবিটিও
এক যুগ পূর্ণ হচ্ছে গ্যালারি কায়ার। আর সে উপলক্ষেই আজ শনিবার থেকে রাজধানীর উত্তরায় গ্যালারি কায়াতে শুরু হচ্ছে ১৫ দিনব্যাপী প্রদর্শনী। বিভিন্ন বয়সী ২৮ জন শিল্পীর মোট ৪৫টি কাজের স্থান হচ্ছে এই প্রদর্শনীতে। তেলরং, অ্যাক্রিলিক, প্যাস্টেল, চারকোল, জলরংসহ নানা মাধ্যমের ছবি থাকবে এখানে। ১৯৫৩ থেকে ২০১৬ পর্যন্ত আঁকা ছবিগুলোরই প্রদর্শনী এটি। গ্যালারির কর্ণধার গৌতম চক্রবর্তী জানালেন, শিল্প আন্দোলনের নানা বৈচিত্র্য আনার জন্যই এই বিশাল কালপর্ব বেছে নেওয়া হয়েছে।
১২ বছর বয়সী গ্যালারি কায়া তার বর্ষপূর্তির আয়োজন হিসেবে বেছে নিল গত শতাব্দীর তিপ্পান্ন সাল থেকে আঁকা ছবি—এটাই শিল্পরসিকদের জন্য এক আনন্দ সংবাদ। অর্ধশতকের বেশি সময়জুড়ে রং আর ক্যানভাসে তো কত ধরনের বিপ্লব হয়ে গেল, তারই সংস্পর্শে আসার এক দুর্লভ সুযোগ ঘটবে প্রদর্শনীর ছবিগুলো দেখলে। তিপ্পান্ন সাল মানে বায়ান্নর পরের বছর। অর্থাৎ বাঙালি তখন জাতীয়তাবাদ প্রশ্নে নতুন করে ভাবতে শুরু করেছে। শিল্পীরা এই আন্দোলনে সম্পৃক্ত হয়ে নিজের ঐতিহ্যের কাছে থাকার পথটি তৈরি করেছেন নিজের মতো করেই। রাজনৈতিক আন্দোলন আর সাংস্কৃতিক আন্দোলন একসঙ্গে চললেও তা সব সময় একই ভাষায় কথা বলে না। শিল্পীর আন্দোলন শৈল্পিক আন্দোলনই বটে। মাঝে মাঝে রাজনীতি-সংস্কৃতি গিয়ে মেলে একই মোহনায়। কিন্তু শিল্পীর অন্তর্দাহর স্বয়ংপ্রকাশ তো তাঁর শিল্পকর্মই। মোহাম্মদ কিবরিয়াই যেমন বলেছিলেন একবার, ‘জোর করে কোনো কিছু চাপিয়ে ছবি হয় না। রাজনৈতিক আদর্শ, সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা এবং নীতির প্রতি আপসহীনতা অবশ্যই একজন শিল্পীর কাজে থাকবে। কিন্তু এটা থাকবে আমি কীভাবে কাজ করি তার পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনায় এবং কাজের মধ্য দিয়ে তা বেরিয়ে আসবে। ‘রং ফর্ম সবই তো পরিচিত বস্তু, টেক্সচারও তাই। সেসবের মধ্যেই তো বসবাস। অদেখা বস্তু বলে তো কিছু নেই। কিছু সহজেই চিনে ফেলি আর কিছু অনুভব দিয়ে, অনুভূতি দিয়ে দেখতে হয়।’ মোহাম্মদ কিবরিয়ার ছবি দুটি দেখতে গেলে শিল্পপিপাসু মানুষ নিশ্চয়ই তাঁর বলা কথাটি স্মরণে রাখবেন। বলি কাইয়ুম চৌধুরীর কথা। ভর্তি হয়ে গেলেন তো আর্ট স্কুলে। জয়নুল আবেদিন বললেন, ‘তুমি কাগজ-পেনসিল, ব্রাশ, চায়নিজ ইঙ্ক কিনে নেবে।’ কাইয়ুম চৌধুরী সরলভাবেই বললেন, ‘স্যার, চায়নিজ ইঙ্ক কী?’ শিল্পাচার্য কিছুক্ষণ হাঁ করে কাইয়ুমের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর মুর্তজা বশীরকে ডাকলেন, বললেন, ‘বশীর, ও তো দেখি কিছুই চেনে না। ওকে নিয়ে যা যা প্রয়োজন কিনে দিয়ো।’
সেই কাইয়ুম চৌধুরী পরে হয়ে উঠলেন কিংবদন্তিতুল্য শিল্পী। এই প্রদর্শনীতে ২০১১ সালে আঁকা তাঁর ‘প্রকৃতি’ নামের ছবিটি দেখে কে না মুগ্ধ হবে? রশিদ চৌধুরী প্রায়ই শ্রীকান্ত থেকে একটি বাক্য আওড়াতেন, ‘যাহাকে কেন্দ্র করিয়া ঘুরি, না পাইলাম তাহার কাছে আসিবার অধিকার, না পাইলাম দূরে যাইবার অনুমতি।’ রশিদ চৌধুরীর ড্রয়িং, চিত্রকলা কিংবা ট্যাপিস্ট্রির বিশিষ্টতা, ঐতিহ্য ও লোকসংস্কৃতি সম্পর্কে তাঁর জিজ্ঞাসা নিয়ে উচ্ছ্বসিত তাঁর শিল্পীবন্ধুরা। কাগজে চারকোলে আঁকা তাঁরই ‘মিউজিশিয়ান’ ও তেলরঙে আঁকা ‘জড়জীবন’ দেখে কি শ্রীকান্ত উপন্যাসের বাক্যটির সঙ্গে তাঁর জীবনকে মিলিয়ে দেখবেন কোনো দর্শক? মুর্তজা বশীরের জলরং দেখার সৌভাগ্য কি সবার হয়? ১৯৮৮ সালে কাগজে কালি-কলমে আঁকা তিনটি ছবির সঙ্গে ১৯৫৩ সালে আঁকা জলরঙের যে ল্যান্ডস্কেপটি আছে, সেটিও দেবে অনির্বচনীয় শিল্পের স্বাদ। এ ছাড়া দর্শকেরা দেখতে পাবেন আমিনুল ইসলাম, দেবদাস চক্রবর্তী, সমরজিৎ রায়চৌধুরী, হাশেম খান, রফিকুন নবী, মনিরুল ইসলাম, মাহমুদুল হক, হামিদুজ্জামান খান, কালিদাস কর্মকার, আবদুর শাকুর শাহ, হাসি চক্রবর্তী, কে এম এ কাইয়ুম, চন্দ্রশেখর দে, রতন মজুমদার, শম্ভু আচার্য, কাজী রকিব, রণজিৎ দাশ, মাসুদা কাজী, শিশির ভট্টাচার্য্য, মোহম্মদ ইকবাল, নগরবাসী বর্মণ, আশরাফুল হোসেন ও কামালুদ্দীনের ছবি। আর হ্যাঁ, আরও আছেন এস এম সুলতান। ১৯২৩ সালে জন্ম নেওয়া এই শিল্পীর ল্যান্ডস্কেপটি হতে পারে এ প্রদর্শনীর অন্যতম আকর্ষণ। প্রদর্শনীর উদ্বোধন হবে সন্ধ্যা ছয়টায়। উদ্বোধন করবেন বিনিয়োগ বোর্ডের নির্বাহী চেয়ারম্যান এস এ সামাদ। উপস্থিত থাকবেন এডিএন গ্রুপের চেয়ারম্যান আসিফ মাহমুদ ও শিল্পসমালোচক মঈনুদ্দীন খালেদ। ২৮ মে পর্যন্ত প্রতিদিন বেলা ১১টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত যে কেউ ঘুরে আসতে পারেন প্রদর্শনীটি। এ দিনটিতেই পূর্ণ হচ্ছে গ্যালারি কায়ার ১২ বছর।

No comments:

Post a Comment