শীর্ষ
খেলাপিদের কাছে আটকা পড়ছে রাষ্ট্রমালিকানাধীন সোনালী, অগ্রণী, জনতা ও
রূপালী ব্যাংক। ঋণের অর্থও আদায় হচ্ছে না, আবার অর্থ আদায়ে দৃশ্যমান কোনো
ব্যবস্থাও নিতে দেখা যাচ্ছে না। পর্যাপ্ত জামানত না থাকায় এসব খেলাপি
গ্রাহকের কাছ থেকে অর্থ আদায়ের আশা নেই বললেই চলে। চার ব্যাংক থেকে পাওয়া
তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, শীর্ষ ১০ খেলাপির কাছে চার ব্যাংকের পাওনা ৫
হাজার ৮৬৭ কোটি টাকা। কোনোভাবেই অর্থ আদায় করতে পারছে না ব্যাংক চারটি। এসব
ব্যাংকে পর্যবেক্ষক নিয়োগ দিয়েও পরিস্থিতির কোনো উন্নয়ন ঘটাতে পারছে না
বাংলাদেশ ব্যাংক। এর মধ্যে শীর্ষ ১০ খেলাপির কাছে সোনালী ব্যাংকের পাওনা ২
হাজার ১৫৫ কোটি টাকা, আর গত ডিসেম্বর পর্যন্ত সব মিলিয়ে আদায় হয়েছে মাত্র
১৯ কোটি টাকা। শীর্ষ ১০ খেলাপির কাছে অগ্রণী ব্যাংকের পাওনা ২ হাজার ২৭৫
কোটি টাকা। ব্যাংকটি বাংলাদেশ ব্যাংকে দাখিল করা প্রতিবেদনে বলেছে, শীর্ষ
১০ খেলাপির কাছে পাওনা ৭৬৬ কোটি টাকা, যাতে গত ডিসেম্বর পর্যন্ত আদায় হয়েছে
মাত্র ৫ লাখ টাকা। শীর্ষ ১০ খেলাপির কাছে জনতা ব্যাংকের পাওনা ৭৫৯ কোটি
টাকা। গত ডিসেম্বর পর্যন্ত আদায় করতে পেরেছে মাত্র ৩২ কোটি টাকা। রূপালী
ব্যাংকের পাওনা ৬৭৮ কোটি টাকা থেকে আদায় হয়েছে মাত্র ৪ কোটি টাকা। খেলাপির
তালিকায় থাকা বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ, অনেকে পলাতক। জেলেও
রয়েছেন কয়েকজন। তাদের বিরুদ্ধে ব্যাংকের করা মামলা বছরের পর বছর ধরে চলছে।
মামলা চলছে এই অজুহাতে ব্যাংকগুলো কার্যকর কোনো ব্যবস্থাও নেয়নি। রূপালী
ব্যাংকের শীর্ষ খেলাপি এএইচজেড এগ্রোর ধানমন্ডি অফিসে গিয়ে দেখা যায়,
প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ। কথা বলার জন্য কাউকে পাওয়া যায়নি। সোনালী ব্যাংকের বহুল
আলোচিত শীর্ষ খেলাপি হল-মার্ক গ্রুপ ও টি অ্যান্ড ব্রাদার্সের মালিকেরা
জেলে। অগ্রণী ব্যাংকের শীর্ষ খেলাপি মুন বাংলাদেশ লিমিটেডের মালিকও জেলে।
এই ব্যাংকের আরেক খেলাপি মুহিব স্টিল ও ম্যাকশিপ বিল্ডার্সের মালিকেরা দেশ
ছেড়ে চলে গেছেন। চট্টগ্রামের ইলিয়াস ব্রাদার্স দেশের পুরোনো খেলাপিদের
একজন। তাদের কাছ থেকে অর্থ আদায় করতে পারছে না ব্যাংক। সাবেক তত্ত্বাবধায়ক
সরকারের অর্থ উপদেষ্টা এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম এ নিয়ে প্রথম আলোকে বলেন,
এসব খেলাপিদের বিরুদ্ধে অর্থ ঋণ আদালতে মামলা করে সম্পত্তি নিলামে তোলা
উচিত। এর মাধ্যমে অর্থ আদায় করা যেতে পারে। তারা আদালতের শরণাপন্ন হলে
নিষ্পত্তি করার জন্য ব্যাংকগুলোকে তৎপরতা চালাতে হবে। সমস্যা হচ্ছে যাচাই
বাছাই ছাড়াই ঋণ দেওয়া হচ্ছে, এসব ঋণই খেলাপি হয়ে পড়ছে। ভবিষ্যতে ঋণ দেওয়ার
ক্ষেত্রে সতর্কতার সঙ্গে যাচাই বাছাই করতে হবে। সোনালী ব্যাংক: সোনালী
ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, ২০১৫ সালের ডিসেম্বর শেষে সোনালী ব্যাংকের খেলাপি
ঋণগ্রহীতার তালিকায় শীর্ষে রয়েছে হল-মার্ক গ্রুপ। গ্রুপটির একটি অংশের
কাছে খেলাপি ৪৯৩ কোটি টাকা। এ ছাড়া হল-মার্কসংশ্লিষ্ট টি অ্যান্ড
ব্রাদার্সের কাছে খেলাপি ৪৭৯ কোটি টাকা। এরপরই রয়েছে হারুনুর রশিদ খানের
মুন্নু ফেব্রিকস। প্রতিষ্ঠানটির কাছে ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ২৩৪ কোটি টাকা।
অলটেক্স ইন্ডাস্ট্রিজের কাছে খেলাপি ২১৫ কোটি টাকা। বেক্সিমকো গ্রুপের কিনে
নেওয়া জিএমজি এয়ারলাইনসের কাছে ব্যাংকের খেলাপি ১৬৫ কোটি টাকা। এ ছাড়া
লীনা পেপার মিলসের কাছে বকেয়া ১৩৮ কোটি টাকা, এপেক্স ওয়েভিং অ্যান্ড
ফিনিশিংয়ের কাছে ১২৮ কোটি, রহিমা ফুড করপোরেশনের কাছে ১০৬ কোটি, মাগুরা
পেপার মিলের কাছে ১০৫ কোটি ও সোনালী জুট মিলের কাছে ৯২ কোটি টাকা। জানতে
চাইলে সোনালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রদীপ কুমার দত্ত প্রথম আলোকে
বলেন, ‘বেক্সিমকো গ্রুপের ঋণ পুনর্গঠন হলেও জিএমজি এয়ারলাইনসের ঋণ খেলাপি
রয়ে গেছে। আমরা প্রতিষ্ঠানটির কর্ণধারদের প্রতিনিয়ত চাপ দিয়ে যাচ্ছি ঋণ
নিয়মিত করার জন্য। তারা আমাদের আশ্বাস দিয়েছে, ঋণটি দ্রুত নিয়মিত করবে। এ
ছাড়া মুন্নু ফেব্রিকসের ঋণ নিয়মিত করার প্রক্রিয়া চলছে। অন্য খেলাপিদের কাছ
থেকে ঋণ আদায়ে ব্যাংকের উপব্যবস্থাপনা পরিচালকদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।’
অগ্রণী ব্যাংক: সংসদীয় কমিটিতে পাঠানো অগ্রণী ব্যাংকের নথিপত্র থেকে জানা
গেছে, ব্যাংকটির শীর্ষ খেলাপি মাররীন ভেজিটেবলের কাছে পাওনা ৪৪৬ কোটি টাকা।
এ ছাড়া ইলিয়াস ব্রাদার্সের কাছে খেলাপি ৩৭৪ কোটি টাকা, খালেক অ্যান্ড
সন্সের কাছে ৩৬৩ কোটি, সিদ্দিক ট্রেডার্সের কাছে ২৫০ কোটি ও ম্যাকশিপ
বিল্ডার্সের কাছে পাওনা ১৭১ কোটি টাকা। এ ছাড়া মুন বাংলাদেশ লিমিটেডের কাছে
খেলাপি ১৩১ কোটি টাকা, নুরজাহান গ্রুপের জাসমীর ভেজিটেবল ওয়েলের খেলাপি
১৩৮ কোটি, চিটাগাং ইস্পাতের কাছে ১৩০ কোটি, মুহিব স্টিল অ্যান্ড শিপের
খেলাপি ১৬১ কোটি টাকা ও সরদার অ্যাপারেলসের কাছে ব্যাংকটির পাওনা খেলাপি ঋণ
১১০ কোটি টাকা। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে ২০১৫ সালে ব্যাংকটি শীর্ষ ২০
খেলাপি ঋণগ্রহীতা থেকে আদায় করেছে ৫১ কোটি টাকা, যা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের
সমঝোতা স্মারকের লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় মাত্র ২২ দশমিক ৩৬ শতাংশ। জনতা
ব্যাংক: ব্যাংকটি সূত্রে জানা গেছে, ২০১৫ সালের ডিসেম্বরের হিসাবে এমবিএ
গার্মেন্টস অ্যান্ড টেক্সটাইল ব্যাংকটির শীর্ষ ঋণখেলাপি। প্রতিষ্ঠানটির
কাছে জনতা ব্যাংকের পাওনা ১৬৯ কোটি টাকা। আরেক প্রতিষ্ঠান ট্রাউজার
ওয়ার্ল্ডের কাছে পাওনা ৯৩ কোটি টাকা। এ ছাড়া আফিল জুট মিলের কাছে ৮৯ কোটি
টাকা, রেফকো ফার্মাসিউটিক্যালের কাছে ৮৮ কোটি, ড্রেজ বাংলার কাছে ৮৫ কোটি,
টেক্সটাইল ভাটুর্সোর কাছে ৬১ কোটি, ব্রডওয়ে স্পিনিংয়ের কাছে ৫২ কোটি, সিক্স
স্টার করপোরেশনের কাছে ৪৭ কোটি, বনলতা গার্মেন্টসের কাছে ৩৮ কোটি ও
আল-হেলাল স্পেশালাইজড হাসপাতালের কাছে জনতা ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ৩৬ কোটি
টাকা। রূপালী ব্যাংক: টাটকা ব্র্যান্ডের খাদ্যপণ্য উৎপাদনকারী মেসার্স
এএইচজেড এগ্রোর কাছে রূপালী ব্যাংকের খেলাপি ১৬৮ কোটি টাকা। চেক ছাপা
প্রতিষ্ঠান জাপান-বাংলাদেশ সিকিউরিটি প্রিন্টিং পেপারস লিমিটেডের কাছে
বকেয়া ১০৯ কোটি টাকা। মেসার্স মাহাবুব রোটস লিমিটেডের কাছে বকেয়া ৭৩ কোটি
টাকা, জে এন্ড জে ইন্টারন্যাশনালের কাছে ৬৬ কোটি, নিট খালি লিমিটেডের কাছে
৫১ কোটি টাকা। এ ছাড়া এসডি প্রিন্টিং এমব্রয়ডারি লিমিটেডের কাছে খেলাপি ৪৯
কোটি টাকা, প্রায়োগিক সি ফুড এক্সপোর্ট লিমিটেডের কাছে ৪৯ কোটি, বাগদাদ
ট্রেডিং করপোরেশনের কাছে ৪৬ কোটি, ইসলাম খান জুট মিলের কাছে ৩৩ কোটি ও
আক্তার ফার্টিলাইজারের খেলাপি ঋণ ৩২ কোটি টাকা। এ বিষয়ে রূপালী ব্যাংকের
ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম ফরিদ উদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, ‘শীর্ষ খেলাপিদের
থেকে অর্থ আদায়ে আমরা বিশেষ পদক্ষেপ নিয়েছি। এরপরও সেভাবে আদায় বাড়ছে না। এ
জন্য আমরা শীর্ষ খেলাপিদের নিয়ে সভাও আয়োজন করেছি। তাদের বিভিন্ন সুযোগ
দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছি।’
Subscribe to:
Post Comments (Atom)

No comments:
Post a Comment