Wednesday, May 18, 2016

১ লাখ কোটি টাকা by সানাউল্লাহ সাকিব

বাংলাদেশে ব্যাংক খাতের প্রকৃত খেলাপি ঋণ ১ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। অবলোপন করা ঋণ ও নিয়মিত খেলাপি ঋণ মিলিয়ে দেশে প্রথমবারের মতো প্রকৃত খেলাপির পরিমাণ লাখ কোটি টাকা ছাড়াল। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত মার্চ পর্যন্ত খেলাপি হয়ে পড়েছে ৫৯ হাজার ৪১১ কোটি টাকা। শুধু জানুয়ারি-মার্চ সময়েই ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৮ হাজার কোটি টাকার বেশি। আর খেলাপি হওয়ার পর আদায়ের সম্ভাবনা না থাকায় এখন পর্যন্ত ৪১ হাজার ২৩৭ কোটি টাকার ঋণ অবলোপন করা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক ও বিভিন্ন ব্যাংক থেকে পাওয়া তথ্যে দেখা গেছে, গত মার্চ পর্যন্ত ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণ ৫৯ হাজার ৪১১ কোটি টাকা। এ সময় পর্যন্ত ব্যাংকগুলো অবলোপন করেছে ৪১ হাজার ২৩৭ কোটি টাকা। অর্থাৎ মোট খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৬৪৮ কোটি টাকা। সরকারি খাতের ব্যাংকগুলোর পাশাপাশি বেসরকারি খাতের ব্যাংকগুলোও খেলাপি ও অবলোপনে রয়েছে একই কাতারে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ব্যাংক খাতে গত মার্চ পর্যন্ত বিতরণ করা মোট ঋণের পরিমাণ ৫ লাখ ৯৮ হাজার ৬৪৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে প্রায় ১০ শতাংশ ঋণ খেলাপি হয়ে গেছে। অবলোপন হওয়া ঋণকে হিসাবে ধরলে এর হার আরও বেশি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব হিসাব, প্রকাশনার তথ্যের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল, বিশ্বব্যাংকসহ বিভিন্ন দেশি-বিদেশি প্রতিষ্ঠানে খেলাপি ঋণের যে তথ্য দেওয়া হয়, তাতে শুধু নিয়মিত খেলাপি ঋণকেই খেলাপি হিসেবে দেখানো হয়। অবলোপন করা ঋণকে আড়ালেই রাখা হয় সব সময়। মন্দ মানে শ্রেণীকৃত পুরোনো খেলাপি ঋণ ব্যাংকের স্থিতিপত্র (ব্যালান্স শিট) থেকে বাদ দেওয়াকে ‘ঋণ অবলোপন’ বলা হয়। আর ঋণ দেওয়ার পর আদায় না হলে তা খেলাপি হয়ে পড়ে। যার বিপরীতে ব্যাংকগুলোকে নিরাপত্তা সঞ্চিতি রাখতে হয়। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার সময় ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ২২ হাজার ৪৮১ কোটি টাকা। আর ওই সময় পর্যন্ত অবলোপন করা ঋণ ছিল আরও ১৫ হাজার ৬৬৭ কোটি টাকা। সব মিলিয়ে প্রকৃত খেলাপি ছিল ৩৮ হাজার ১৪৮ কোটি টাকা। এই হিসাবে গত প্রায় ৮ বছরে প্রকৃত খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৬২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। বৃদ্ধির হার প্রায় ১৬৪ শতাংশ। এর বাইরে রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে আরও ১৫ হাজার কোটি টাকার খেলাপি ঋণ পুনর্গঠন করা হয়েছে। এই সুবিধা পেয়েছে মূলত বড় খেলাপিরা। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ প্রথম আলোকে বলেন, বিপুল পরিমাণ এ খেলাপি ঋণ দেশের জন্য অশনিসংকেত। তবে খেলাপি ঋণ যে ১ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে, তা স্বাভাবিক।
কারণ, গত কয়েক বছরে যে ঋণ দেওয়া হয়েছে, তা কখনোই আদায় হবে না। সরকারি খাতের ব্যাংকগুলোর চেয়ারম্যান-এমডিরা মিলে দুর্নীতি করেছেন। বেসরকারি ব্যাংক আগ্রাসী ব্যাংকিং করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের ভূমিকাও যুগোপযোগী নয়। আরও কঠোর হতে হবে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও ব্যাংকগুলোর নিজস্ব তথ্যমতে, গত বছরের ডিসেম্বর শেষে ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণ ছিল ৫১ হাজার ৩৭১ কোটি টাকা। আর গত মার্চ শেষে তা বেড়ে হয়েছে ৫৯ হাজার ৪১১ কোটি টাকা। অর্থাৎ এ তিন মাসেই খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৮ হাজার ৪০ কোটি টাকা। বাংলাদেশ ব্যাংক তিন মাস পরপর খেলাপি ঋণের তথ্য-উপাত্ত তৈরি করে। ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের সভাপতি আবদুল মাতলুব আহমাদ প্রথম আলোকে বলেন, এক ব্যাংকের মালিক অন্য ব্যাংকের মালিককে ঋণ নেওয়ার সুযোগ করে দিচ্ছেন। আবার ছোট ঋণের চেয়ে ধনীদের বড় ঋণই বেশি খেলাপি হচ্ছে। তাই ব্যাংকগুলোকে নিজেদের স্বার্থেই বড় ঋণের পরিবর্তে ছোট ঋণের দিকে ঝুঁকতে হবে। জানুয়ারি-মার্চ সময়ে সরকারি খাতের সোনালী, অগ্রণী, জনতা, রূপালী, বেসিক ও বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ২৩ হাজার ৭৪৪ কোটি টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ২৭ হাজার ২৮৯ কোটি টাকা। বেসরকারি খাতের ৩৯ ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ২০ হাজার ৭৬০ কোটি টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ২৫ হাজার ৩৩১ কোটি টাকা। তবে বিদেশি খাতের ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ ১ হাজার ৮৯৭ কোটি টাকা থেকে কমে হয়েছে ১ হাজার ৮২২ কোটি টাকা। বাকি খেলাপি সরকারি খাতের বিশেষায়িত বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক ও রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র শুভঙ্কর সাহা প্রথম আলোকে বলেন, খেলাপি ঋণ জুন ও ডিসেম্বরে কমে আসে, অন্য সময়ে বেড়ে যায়, এটাই স্বাভাবিক। হিসাব করার জন্য ডিসেম্বরে ও জুনে ব্যাংকগুলো ঋণ আদায় জোরদার করে। জানুয়ারি-মার্চ সময়ে শুধু রাষ্ট্রমালিকানাধীন জনতা ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ২ হাজার ৫২৯ কোটি থেকে বেড়ে হয়েছে ৫ হাজার ৪১০ কোটি টাকা। ব্যাংকটির খেলাপি ঋণ ছিল ৮ দশমিক ৯৬ শতাংশ, এখন হয়েছে ১৫ দশমিক ৪৫ শতাংশ। জনতা ব্যাংকের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক আবদুস সালাম আজাদ প্রথম আলোকে বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক কিছু ঋণকে গুণগত মানের ভিত্তিতে খেলাপি করে দেওয়ায় এই অবস্থা হয়েছে। তবে ব্যাংকের পক্ষ থেকে ঋণ আদায়-প্রক্রিয়া জোরদার রয়েছে। একই সময়ে বেসিক ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ৬ হাজার ৩৯২ কোটি টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ৬ হাজার ৮২৪ কোটি টাকা। এতে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণ ৫০ শতাংশ থেকে বেড়ে হয়েছে ৫৩ দশমিক ৭৩ শতাংশ। এ প্রসঙ্গে বেসিক ব্যাংকের চেয়ারম্যান আলাউদ্দিন এ. মজিদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘আড়াই হাজার কোটি টাকা ঋণ পুনঃ তফসিল করা হয়েছে, এর মধ্যে হয়তো কেউ কেউ খেলাপি হয়ে পড়ছে। তবে ব্যাসেল-৩-এর সুপারভাইজারি রিভিউ প্রসেস মানতে গিয়ে বিভিন্ন সূচকে অবনতি ঘটায় আমাদের খেলাপি ঋণ বেড়েছে।
তবে আমাদের ব্যাংকে ঋণ দেওয়ার জন্য অর্থের কোনো ঘাটতি নেই।’ তিন মাসে অগ্রণী ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ৪ হাজার ২২৪ কোটি টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ৪ হাজার ৮১৫ কোটি টাকা। শতকরা হিসাবে তা ১৯ দশমিক ৫৮ শতাংশ থেকে বেড়ে হয়েছে ২২ দশমিক ১৩ শতাংশ। সোনালী ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ৮ হাজার ১০০ কোটি টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ৮ হাজার ২৭১ কোটি টাকা। ফলে খেলাপি ঋণ ২৭ দশমিক ৫৩ শতাংশ থেকে বেড়ে হয়েছে ২৮ দশমিক ১৩ শতাংশ। গবেষণা সংস্থা পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের ভাইস চেয়ারম্যান ও বিশ্বব্যাংকের সাবেক অর্থনীতিবিদ সাদিক আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, দীর্ঘ মেয়াদে এত খেলাপি ঋণের নেতিবাচক প্রভাব রয়েছে। কারণ, এটা তো আমানতকারীদের অর্থ। এটা পূরণ করতে হলে ব্যাংকের মূলধন ও রিজার্ভে টান পড়বে। আর সরকার মূলধন জোগান দিয়ে সরকারি ব্যাংক টিকিয়ে রাখবে। এটা তো চলতে পারে না। সরকারি ব্যাংকগুলোর ঋণ প্রদান বন্ধ করে শুধু আমানত সংগ্রহ চালু রাখা যেতে পারে। সাদিক আহমেদ আরও বলেন, এত খেলাপির ফলে সুদের হার বাড়বে, না হয় আমানতের হার কমিয়ে দেওয়া হবে। যেভাবেই হোক, বিপুল খেলাপির দায় শেষ পর্যন্ত ভোক্তার ওপরই এসে পড়ে।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) হিসাবে বাংলাদেশে খেলাপি ঋণের কারণে ঋণের সুদ হার প্রায় দশমিক ৪ শতাংশ বেড়ে যায়। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর সালেহউদ্দিন আহমেদ এ বিষয়ে প্রথম আলোকে বলেন, খেলাপি ঋণ বেশি হলে ব্যাংকের ঋণ দেওয়ার ক্ষমতা কমে যায়। ফলে সুদের হারও বাড়ে। বাংলাদেশে আমানতের সুদের হার কমিয়ে এসব সমন্বয় করা হচ্ছে। খেলাপিদের বিভিন্ন সুবিধা দেওয়ার ফলে ভালো গ্রাহকদের কাছে খারাপ সংকেত যাচ্ছে। আর অবলোপন করা হচ্ছে জনগণের আমানতের অর্থ দিয়ে। এর প্রভাব পড়ছে গ্রাহকদের ওপর। এতে ভালো গ্রাহক, সৃজনশীল উদ্যোক্তারা ঋণ পেতে সমস্যায় ভোগেন। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিমালার আলোকে ২০০৩ সাল থেকে ব্যাংকগুলো ঋণ অবলোপন করার সুযোগ পেয়েছে। নীতিমালার আওতায় পাঁচ বছর বা তার বেশি সময় ধরে থাকা খেলাপি ঋণের বিপরীতে শতভাগ প্রভিশন বা নিরাপত্তা সঞ্চিতি রেখে এবং মামলা দায়ের করে তা অবলোপন করতে হয়। আগে মামলা দায়ের না করে কোনো ঋণ অবলোপন করার সুযোগ ছিল না। তবে মামলার ব্যয়ের চেয়ে অনেকাংশে বকেয়া ঋণের পরিমাণ কম হওয়ায় মামলা না করেই ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত ঋণ অবলোপনের সুযোগ দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। অবলোপনের পর ঋণ আদায়ে জোরদার ব্যবস্থা নেওয়ার নিয়ম থাকলেও ঋণ আদায়ে ব্যাংকগুলোর তৎপরতা নেই। আবার অনিয়মের ঋণগুলো অবলোপন করে দোষীদের আড়ালও করা হয়।

No comments:

Post a Comment