Wednesday, May 25, 2016

মমতা ও জয়ললিতার দুই পৃথিবী by সৌম্য বন্দ্যোপাধ্যায়

মমতা ব্যনার্জি ,জয়ললিতা
দাতা কর্ণর দেশ ভারতের রাজ্য তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েই জয়ললিতা পাঁচ একর পর্যন্ত জমির কৃষকদের কৃষিঋণ মওকুফ করলেন। গরিবদের মাসে ১০০ ইউনিট বিদ্যুৎ বিনা পয়সায় দেওয়ারও ঘোষণা দিলেন। জানালেন, রাজ্যে যে ৫০০ সরকারি দোকান মারফত মদ বিক্রি হয়, তা বন্ধ করে দেওয়া হবে। মানে, রাজ্য আর মদের ব্যবসা করবে না। রাজ্যের রাজস্ব ঘাটতি এখন ৯ হাজার কোটি টাকা। এই দানছত্রের দরুন তা বেড়ে হবে ১৫ হাজার কোটি টাকা। আরেক রাজ্য পশ্চিমবঙ্গে দেশের আরেক ‘লৌহমানবী’ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আগামী শুক্রবার দ্বিতীয়বারের মতো মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিতে চলেছেন। দক্ষিণী নেত্রীর চরিত্র যদি দাতা কর্ণের মতো হয়,  রাজ্যে ‘দিদি’ হিসেবে এক ডাকে পরিচিত মমতা তাহলে রাজা হর্ষবর্ধনতুল্য। রাজ্যের ছয় কোটি মানুষকে দুই টাকা কেজিতে চাল ও তিন টাকা কেজি গম তিনি দুই বছর ধরে অকাতরে বিলিয়ে যাচ্ছেন।  তামিলনাড়ুর জনসাধারণের ‘আম্মা’ জয়ললিতার মতো তিনি সদ্য বিবাহিত নারীদের সোনার ‘মঙ্গলসূত্র’ হয়তো বিলি করেননি, কিন্তু ফি বছর রাজ্যের দরিদ্র পরিবারের মেয়েদের জন্য যা করে চলেছেন, দ্বিতীয়বার রাজ্য শাসনের মানদণ্ড হাতে তোলার পক্ষে হয়তো সেটাই যথেষ্ট। দারিদ্র্যের ছ্যাঁকাটা কী রকম, মমতার তা জানা বলেই হয়তো ‘সবুজ সাথি’ ও ‘কন্যাশ্রী’ প্রকল্পের কথা তিনি ভাবতে পেরেছেন। ১৭ বছর বয়সে বাবার মৃত্যু। চিকিৎসার খরচ জোগাড়ের উপায় পরিবারের ছিল না। কলকাতার যোগমায়া দেবী কলেজে পড়ার খরচ তিনি তুলতেন কাকভোরে হরিণঘাটা সরকারি দুধের ডিপো থেকে দুধ বিক্রি করে। এক গাদা ভাইবোনের সংসারে ওই সামান্য আয় ৪০ বছর আগে সচ্ছলতা আনতে না পারলেও মাথা তুলে স্বনির্ভর হওয়ার মতো শক্তি ও সাহস জুগিয়েছিল। ‘সবুজ সাথি’ অন্য কিছু নয়, গ্রামবাংলার দরিদ্র মানুষজনের একমাত্র বাহন, সাইকেল। প্রত্যন্ত গ্রামের মেয়েদের স্কুলে যাওয়ার কষ্টটা কী, তা তাঁর জানা। ঘরের কাজে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেওয়ার পাশাপাশি হেঁটে দূরের স্কুলে যাওয়ার ঝক্কি এড়াতে অনেকেই পড়াশোনার ধারেকাছে দিয়ে হাঁটতে চায় না। মমতা এই দরিদ্র পরিবারের মেয়েদের স্কুলে যাওয়ার জন্য সাইকেলকে ‘সবুজ সাথি’ করে তুলেছেন। প্রতিবছর গড়ে রাজ্যের ৩০ লাখ ছাত্রী এই সাইকেল পেয়ে আসছে।
বছরে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা (মাসে ১০ হাজার) যে পরিবারের রোজগার, সেই পরিবারের কন্যা ১৩ বছর বয়স হলে ‘কন্যাশ্রী’র আওতায় চলে আসবে। এর অর্থ, মাসে মাসে সেই পরিবার কন্যাপিছু ৭৫০ টাকা করে পাবে। ১৮ বছর বয়স হলে কন্যা পাবে এককালীন ২৫ হাজার টাকা। সেই অর্থে তার বিয়ের খরচ কিছু উঠতে যেমন পারে, তেমনই সেই অর্থ হতে পারে তার স্বনির্ভর হয়ে ওঠার উপায়। মমতার লক্ষ্য একাধিক। এক. কন্যা ভ্রূণ হত্যা ঠেকানো। দুই. মেয়েদের স্কুলে থেকে ঝরে পড়া বন্ধ করা। তিন. বাল্যবিবাহ রোধ। চার. কিশোরী পাচার বন্ধ করা। পাঁচ. নারী শিক্ষার প্রসার। জয়ললিতা সদ্য বিবাহিতকে ৮ গ্রাম সোনার ‘মঙ্গলসূত্র’ দিচ্ছেন সরকারি অর্থে। মমতা দিতে চান ক্ষমতা, যাতে শিক্ষিত ও স্বনির্ভর নারী নিজের টাকায় বিয়ের সময় সোনার হার গড়িয়ে নিতে পারে। দারিদ্র্য ও বৈভবের মানসিকতায় ফারাক এখানেই। ফারাক রয়েছে আরও এক জায়গায়। আয়বহির্ভূত সম্পত্তি অর্জনের দরুন জয়ললিতার বিরুদ্ধে মামলা চলছে। সেই মামলায় তাঁকে কারাবাসও করতে হয়েছে। জামিনে মুক্ত হয়ে ফের নির্বাচনে জিতলেও কলঙ্কের একটা ফিকে দাগ তাঁর ললাটে এখনো লেপ্টে আছে। মমতার সমর্থনও ভরা কটালের সমুদ্রের মতো ফুলে-ফেঁপে উঠেছে। আর ব্যক্তিগত অসাধুতা? এই প্রবল ‘সারদা-নারদা’ ঢক্কানিনাদ সত্ত্বেও মমতার ডুরে কাটা নীল-সাদা শাড়ি কালিমামুক্ত রয়েই গেছে। শুক্রবার কলকাতার রেড রোডের উন্মুক্ত প্রান্তরে সূর্যকে সাক্ষী করে মমতা যখন দ্বিতীয়বারের জন্য মুখ্যমন্ত্রিত্বের শপথ নেবেন, গ্রামবাংলার দরিদ্র মেয়েরা তখন নিশ্চয় উপলব্ধি করবে, একদিন তাদের মতোই দারিদ্র্যের বোঝা টেনে বড় হওয়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন এই নারী।

No comments:

Post a Comment