Monday, May 9, 2016

রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় উগ্রপন্থা বিস্তারের ফল by আলী রীয়াজ

লাল মসজিদের সামনে প্রতিবাদের সময় আটক হন খুররম জাকি l ছবি: দ্য ডন
মাত্র ৪০ বছর বয়সে তাঁর জীবনাবসান ঘটল। ৪০ বছর খুব বেশি সময় নয়, এমনকি যে দেশে গড় আয়ু ৬৭ বছরের কম, সেখানেও ৪০ বছর বয়স্ক একজন মানুষের মৃত্যুকে অকালমৃত্যু ছাড়া কিছুই বলার নেই। তদুপরি তাঁর মৃত্যু স্বাভাবিক কোনো ঘটনা নয়, তাঁকে হত্যা করা হয়েছে। পরিকল্পিতভাবে আক্রমণ চালিয়ে তাঁকে হত্যা করা হয়েছে, যেন তিনি আর কথা বলতে না পারেন, যেন তাঁর কণ্ঠস্বর নীরব হয়, যেন তাঁর প্রতিবাদী কার্যক্রম স্তব্ধ হয়। পাকিস্তানের মানবাধিকারকর্মী ও অনলাইন অ্যাকটিভিস্ট বা ব্লগার খুররম জাকিকে শনিবার করাচিতে পরিকল্পিতভাবে হামলা চালিয়ে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। একটি রেস্তোরাঁয় তাঁর বন্ধু সাংবাদিক খালিদ রাওয়ের সঙ্গে রাতের খাবার খাওয়ার সময় তাঁকে হত্যার লক্ষ্য নিয়েই আততায়ীরা আক্রমণ চালিয়েছিল এবং তাতে তারা সফলও হয়েছে। খালিদ রাও মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন। খুররম জাকিকে তাঁর দেশের বাইরে সবাই একবাক্যে চিনতেন এমন বলাটা ঠিক হবে না, কিন্তু যাঁরা পাকিস্তানে মানবাধিকারের লড়াইয়ের খোঁজখবর রাখেন, যাঁরা সে দেশের শিয়া সম্প্রদায়ের ওপরে রাষ্ট্র ও রাষ্ট্রবহির্ভূত বিভিন্ন সহিংস গোষ্ঠীর আক্রমণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী কণ্ঠগুলোকে শনাক্ত করতে পারেন, তাঁরা খুররম জাকির নামের সঙ্গে অল্পবিস্তর পরিচিত। তিনি এই কারণেও পরিচিত ছিলেন যে, তিনি ইসলামের একটি উদার ব্যাখ্যার চেষ্টা করছিলেন। সৈয়দ খুররম জাকি অতীতে টেলিভিশন সাংবাদিকতা করতেন এবং একাধিক গণমাধ্যমের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। কিন্তু তাঁর প্রাথমিক পরিচিতি তিনি গবেষক, মানবাধিকারকর্মী, অনলাইন অ্যাকটিভিস্ট এবং ইসলামবিষয়ক পণ্ডিত। বিভিন্ন সময়ে তিনি ইসলামের বিভিন্ন বিষয়ে দেশের অন্য পণ্ডিত ব্যক্তিদের সঙ্গে বিতর্কে প্রবৃত্ত হয়েছেন। পাকিস্তানের অন্যতম ইসলামি ধর্মতাত্ত্বিক বলে পরিচিত ডক্টর ইসরার আহমেদ (১৯৩২-২০১০)। তাঞ্জিম-উল-ইসলামের প্রতিষ্ঠাতা সুন্নি সম্প্রদায়ের ইসরার আহমেদের সঙ্গে ২০০৫ সালে খেলাফত বিষয়ে শিয়া সম্প্রদায়ভুক্ত খুররম জাকির বিতর্ক এই বিষয়ে একটি অন্যতম বিতর্ক বলে অনেকেই গণ্য করেন। এই বিতর্কের ভিডিও কীভাবে প্রকাশিত হয়েছিল তা এখনো রহস্যাবৃত; কিন্তু এই বিতর্কে তাঁদের উভয়ের অবস্থান, ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি ও বিতর্কের মুখ্য দিকগুলো অনেকেই অবহিত হওয়ার সুযোগ পাবেন। জাকি ‘লেট আস বিল্ড পাকিস্তান’ (এলইউবিপি) নামে একটি ওয়েবসাইট ও ফেসবুক পাতার সম্পাদক ছিলেন। এই ওয়েবসাইট ও ফেসবুকের উদ্দেশ্য হিসেবে বলা হয়েছে যে তারা ‘উদার ধর্মীয় মতামত প্রচার করে এবং যেকোনো ধরনের উগ্রপন্থার বিরোধী’। সম্প্রতি পাকিস্তান টেলিকমিউনিকেশন অথরিটি তাঁর এ ওয়েবসাইটটি পাকিস্তানে ব্লক করে দিয়েছে। খুররম জাকি দীর্ঘদিন ধরে পাকিস্তানে উগ্র ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে প্রচার চালাচ্ছিলেন। তিনি ও তাঁর বন্ধু জিবরান নাসির সম্প্রতি লাল মসজিদের মাওলানা আবদুল আজিজের বিরুদ্ধে একটি মামলা দায়েরের চেষ্টা করেন। তাঁরা অভিযোগ করেন যে মাওলানা আজিজ শিয়াদের বিরুদ্ধে উসকানিমূলক বক্তব্য দেন। এর সপক্ষে তাঁরা একটি ভিডিও দাখিল করেছিলেন। স্থানীয় পুলিশ এই মামলার এফআইআর করতে রাজি না হলে জাকি নিম্ন আদালতের শরণাপন্ন হন, আদালত এই বলে জাকির আবেদন খারিজ করে দেন যে জাকি ও তাঁর সঙ্গীদের এই মামলার এখতিয়ার (লোকাস স্ট্যান্ডাই) নেই। জাকি ও তাঁর সঙ্গীরা এরপর হাইকোর্টে আবেদন করেন। কিন্তু ২৯ মার্চ ইসলামাবাদ হাইকোর্ট একই যুক্তিতে তাঁদের আবেদন খারিজ করে দেন। অন্যদিকে, মাওলানা আজিজ জাকি ও তাঁর সহকর্মীদের বিরুদ্ধে পাল্টা মামলা করেছেন যে তাঁরা মাওলানা এবং লাল মসজিদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছেন। জাকি ২০১৫ সালের ১৬ ডিসেম্বর পেশোয়ারে স্কুলে হত্যাকাণ্ডের প্রথম বার্ষিকীতে লাল মসজিদের সামনে সরকারি বাধা উপেক্ষা করে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন। সেই সময়ে তিনি, তাঁর স্ত্রী এবং তাঁদের ষোলো বছর বয়সী কন্যাকে পুলিশ আটক করে। খুররম জাকি কেবল যে পাকিস্তানের উগ্রপন্থীদের সমালোচনা করেছেন তা-ই নয়, তাঁর ওয়েবসাইটে পাকিস্তানের উদারপন্থী বুদ্ধিজীবীদের কঠোর সমালোচনাও করা হয়েছে। তাঁর অবস্থানের সঙ্গে বা তাঁর সম্পাদিত ওয়েবসাইটে প্রকাশিত সব লেখার সঙ্গে একমত হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। অন্ততপক্ষে আমি নিজে কিছু বিষয়ে সুস্পষ্টভাবেই ভিন্নমত পোষণ করেছি। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, নারীদের বিয়ের বয়স-সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে আলোচনা। গত বছরের ২৬ জুলাই প্রকাশিত লেখায় জাকি স্বল্প বয়সে বিয়ের বিরুদ্ধে সমালোচনাকে পশ্চিমা ধ্যানধারণার অন্ধ অনুসরণ বলেই বর্ণনা করেন। তাঁর এই সমালোচনা আমার কাছে সর্বাংশে গ্রহণযোগ্য মনে হয়নি। খুররম জাকি গত কয়েক বছরে যে বিষয়টি সবার নজরে আনার চেষ্টা করেছেন তা হচ্ছে পাকিস্তানে শিয়া সম্প্রদায়ভুক্ত নাগরিকদের অবস্থা, বিশেষত তাঁদের বিরুদ্ধে পরিচালিত সহিংসতা। তিনি মনে করতেন যে পাকিস্তানে গত ৩০ বছরের বেশি সময় ধরে রাষ্ট্র ও রাষ্ট্র-সমর্থিত গোষ্ঠীগুলো শিয়া সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে গণহত্যা পরিচালনা করছে। এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, পাকিস্তানে ধর্মীয় সম্প্রদায়গত বিরোধের সম্প্রসারণ হয়েছে ১৯৭৯-৮৯ সালে, আফগান যুদ্ধকে কেন্দ্র করে; যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের প্রত্যক্ষ মদদে, আর্থিক সহায়তায় পাকিস্তানি সেনাশাসক জিয়াউল হকের পরিচালিত নীতির কারণে। কিন্তু এক অর্থে এর সূচনা ১৯৭৪ সালে পিপলস পার্টির নেতা জুলফিকার আলী ভুট্টোর সরকারের করা সংবিধানের দ্বিতীয় সংশোধনের মাধ্যমে আহমদিয়া সম্প্রদায়কে অমুসলিম ঘোষণার মধ্য দিয়ে, সেটাও বিস্মৃত হওয়ার সুযোগ নেই। আফগান যুদ্ধের অবসান সত্ত্বেও এই বিভক্তি যে অব্যাহত থেকেছে এবং আরও সহিংস রূপ নিয়েছে তার কারণ অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও পাকিস্তানের পররাষ্ট্রনীতি, বিশেষ করে কাশ্মীরবিষয়ক নীতি। আফগানিস্তানে পাকিস্তানের প্রভাব পুনঃপ্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে তালেবানের প্রতি অব্যাহত সমর্থন সেই নীতিরই প্রলম্বিত দিক। নব্বইয়ের দশক থেকে পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বিভিন্ন দল ও গোষ্ঠী ইসলামের একটি নির্দিষ্ট ব্যাখ্যাকেই ইসলাম বলে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছে। এই প্রচেষ্টার জনক সেনাশাসক জিয়াউল হক। কিন্তু বেসামরিক ও নির্বাচিত নেতারা তা থেকে সরে আসেননি, বরং তাকে আরও শক্তিশালী করেছেন। সেই ব্যাখ্যা যে কেবল সুন্নি ইসলামকেই অগ্রাধিকার দিয়েছে তা-ই নয়, তার মধ্যে দেওবন্দী ব্যাখ্যা ও মতবাদকে রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। অন্য মতগুলো, এমনকি সুন্নি বে​েরলভি মতকেও যতটা সম্ভব প্রান্তিক অবস্থানে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। একটি রাষ্ট্র যখন ইসলামের একটি সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যাকে গ্রহণ করে ও তার পৃষ্ঠপোষকতা করে, তখন তার দুটি পরিণতি সহজেই লক্ষণীয়। প্রথমত, ধর্মবিষয়ক যেকোনো রকমের খোলামেলা আলোচনার সুযোগ বন্ধ হয়। এতে করে প্রচলিত অর্থে যাদের আমরা সেক্যুলারপন্থী বলি, তারা কেবল যে দুর্বলই হয় তা নয়, তাদের আলোচনার জায়গাও সীমিত হয়ে আসে এবং ইসলামের নামে একাধারে রাষ্ট্র এবং রাষ্ট্রবহির্ভূত গোষ্ঠীগুলো সমাজ ও রাজনীতির আলোচনাকে নিয়ন্ত্রণ করে। সেই পরিস্থিতি সহিংস গোষ্ঠী তৈরির অনুকূল অবস্থার সৃষ্টি করে। কেননা, এসব গোষ্ঠী রাষ্ট্র-পরিপোষিত একটি ব্যাখ্যা বাস্তবায়নের পথে যেকোনো বাধাকে অপসারিত করতে চেষ্টা করে, বিপরীতক্রমে তার বিরুদ্ধেও সহিংসতার অবকাশ তৈরি হয়। ইসলামের প্রতি আনুগত্য তাদের এই আচরণের কারণ না-ও হতে পারে। তারা রাষ্ট্রের আনুকূল্যের জন্য, ক্ষমতা প্রয়োগের জন্যও তা করে থাকে।
দ্বিতীয়ত, ইসলামে ধর্মতাত্ত্বিকভাবেই ভিন্ন ভিন্ন মতের উপস্থিতি ও সহাবস্থানের যে ঐতিহ্য রয়েছে তাকে অস্বীকার করা হয়। ইসলামের ইতিহাস ও ধর্মতত্ত্ব দুই-ই সাক্ষ্য দেয় যে, ইসলাম কোনো এককেন্দ্রিক বা মনোলিথিক বিষয় নয়। উগ্রপন্থী চিন্তা সব সময়ই এই বৈচিত্র্যকে অস্বীকার করতে চায় এবং তাদেরই আক্রমণের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করে। পাকিস্তানের ইতিহাস এই পরিণতির সাক্ষ্য বহন করে।
খুররম জাকির ধর্মতাত্ত্বিক ব্যাখ্যা ইসলামের সেই বৈচিত্র্যের উদাহরণ। কিন্তু পাকিস্তান রাষ্ট্র যেহেতু ইসলামের একটি নির্দিষ্ট ব্যাখ্যাকেই গ্রহণ করেছে, সেহেতু রাষ্ট্র তাঁর পাশে দাঁড়ায়নি, উপরন্তু তাঁকে বিবেচনা করেছে শত্রু হিসেবে। তাঁর ওয়েবসাইট যে পাকিস্তান সরকার ব্লক করেছে, তাতেই স্পষ্ট যে রাষ্ট্র ও সরকার চায় এই কণ্ঠস্বর দুর্বল হোক। জাকি যখন উগ্রপন্থীদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছেন, তখন রাষ্ট্রের ভূমিকা উগ্রবাদের অনুকূলেই গেছে। পাকিস্তানে উগ্রপন্থার বিরুদ্ধে ও মানবাধিকারের পক্ষে লড়াই যে কত দুরূহ ও বিপজ্জনক, খুররম জাকির হত্যাকাণ্ড আবার তা স্মরণ করিয়ে দিয়েছে।
রাষ্ট্রের পৃষ্ঠপোষকতায় উগ্রপন্থার বিস্তার ঘটলে, রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে তার প্রতি পক্ষপাত দেখালে এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে উগ্রপন্থা ও সহিংসতাকে ব্যবহার করলে তাঁর পরিণতি কী হয়, পাকিস্তানের দিকে তাকালেই তা বোঝা যায়। সমাজে যদি সুস্থ বিতর্কের অবকাশ না থাকে, ভিন্নমত যদি অগ্রহণযোগ্য বলে পরিগণিত হয়, রাষ্ট্র যদি ধর্মের একটি বিশেষ ব্যাখ্যাকেই চূড়ান্ত বলে হাজির করে, সহিংস গোষ্ঠীগুলো যদি বিচারের মুখোমুখি না হয়, তবে যে পরিণতি হয় তার দৃষ্টান্ত পাকিস্তান। গত প্রায় চার দশকের বেশি সময় ধরে অনেক রক্তপাত ও প্রাণসংহারের পরও এই বৃত্তচক্র থেকে পাকিস্তান বেরোতে পারেনি। নিহত ব্যক্তিদের এক দীর্ঘ তালিকায় সর্বশেষ যুক্ত হলেন খুররম জাকি।

No comments:

Post a Comment