Saturday, June 18, 2016

থাইল্যান্ডে মুখোমুখি সরকার ও বৌদ্ধ মঠ

থাইল্যান্ডের একজন প্রভাবশালী মঠাধ্যক্ষকে গ্রেপ্তার করতে গিয়ে বাধার মুখোমুখি হয়েছে পুলিশ। পুলিশি অভিযানের সময় সড়কের সামনে অবস্থান নিয়ে বাধা সৃষ্টি করেন তার হাজার হাজার অনুসারী। বিবিসির খবরে বলা হয়, ফ্রা ধাম্মাজায়ো নামে ওই বৌদ্ধ অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে অর্থ পাচার ও ব্যাংককের ধনাঢ্য ধাম্মাকায়া মঠের তহবিল তছরুপের অভিযোগ রয়েছে। কিন্তু বিশাল এই মঠের বিভিন্ন অংশে তল্লাশি চালাতে গেলে পুলিশ কর্মকর্তাদের আটকে দেন অধ্যক্ষের সমর্থকরা। ৭২ বছর বয়সী ধাম্মাজায়ো কয়েক মাস ধরে মঠের ভেতর অবস্থান করছেন। তার বক্তব্য, জিজ্ঞাসাবাদের জন্য কর্মকর্তাদের সঙ্গে দেখা করার মতো অবস্থায় তিনি নেই। তিনি খুবই অসুস্থ। অভিযোগ অস্বীকার করে তার দাবি, এসব রাজনৈতিকভাবে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। এক বিবৃতিতে, মঠের ভিক্ষুরা এক বিবৃতিতে জানান, ফ্রা ধাম্মাজায়ো খুবই অসুস্থ। দেশ গণতন্ত্রে ফিরলেই কেবল তিনি বিচারিক ব্যবস্থার মুখোমুখি হবেন। প্রসঙ্গত, ২০১৪ সালের একটি অভ্যুত্থানের পর থেকে সামরিক সরকার ক্ষমতায় রয়েছে থাইল্যান্ডের। পুলিশ বলেছে, ফ্রা ধাম্মাজায়োকে গ্রেপ্তারের একটি অভিযান অনুসারীদের বাধার দরুন স্থগিত হয়ে যায়। মঠের একজন মুখপাত্র বলেছেন, পুলিশের সঙ্গে সহযোগিতা করছেন ভিক্ষুরা। কিন্তু কিছু অনুসারী এ অবস্থা সৃষ্টি করেছে। তাদেরকে বাধা দিয়েও থামানো যায়নি। কিন্তু পুলিশের স্পেশাল ইনভেস্টিগেশন ডিপার্টমেন্টের উপ-প্রধান সুরিয়া সিংঘাকমল বলেছেন, ‘আমাদের অভিযান শেষ হয়নি। গ্রেপ্তার পরোয়ানা এখনও বহাল রয়েছে। তাই অভিযান আবারও চালানোর ক্ষমতা আমাদের রয়েছে। আমাদের হাতে থাকা তথ্যানুযায়ী, তিনি (অধ্যক্ষ) এখনও মঠের ভেতরে রয়েছেন।’ অধ্যক্ষের একজন নারী সমর্থক (৫৮) বার্তাসংস্থা রয়টার্সকে বলেন, ‘তাকে গ্রেপ্তার করাটা অনভিপ্রেত। এমন তো নয় যে, তিনি কাউকে খুন করেছেন।’ প্রসঙ্গত, থাইল্যান্ডের সেক্যুলার কর্তৃপক্ষ ও বৌদ্ধ নেতাদের মধ্যে বিরোধের সর্বশেষ উদাহরণ এ অভিযান। কয়েকদিন আগেই বিতর্কিত টাইগার টেম্পলে অভিযান চালিয়ে কর্তৃপক্ষ ব্যাঘ্র শাবক ও চামড়া উদ্ধার করেছে। অভিযোগ ছিল, এ মন্দির থেকে বাঘের চামড়া ও দাঁতসহ মূল্যবান অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ পাচার হয়।মবিশ্লেষকরা বলছেন, বৌদ্ধ ভিক্ষুবিরোধী হিসেবে নিজেদের পরিচিত করতে চায় না পুলিশ। তাই জোর করে মঠে প্রবেশ করতে চায়নি তারা। কেননা, থাইল্যান্ডের ধর্মপ্রাণ বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা  এসব মঠকে শ্রদ্ধার চোখে দেখেন। পুলিশ বলছে, ভিক্ষুদের দুপুরের খাবার তখনও শেষ না হওয়ায়, অভিযান স্থগিত করেছে তারা। ভিক্ষুরা গোটা দিনে ওই একবারই খাবার খান। বিবিসির জোনাথান হেড বলেন, ১৯৭০ সালে প্রতিষ্ঠিত এ মন্দিরটির সঙ্গে থাইল্যান্ডের আর দশটা সাধারণ মন্দিরের তফাৎ রয়েছে। ক্যারিসম্যাটিক কাল্টের কোনো চরিত্রের সঙ্গে মানানসই এ মন্দির। অদ্ভুত দেখতে মন্দিরের চেদির ভেতর গণধ্যান আয়োজিত হয় এখানে। পাশাপাশি, এখানে মাত্রাতিরিক্ত ‘আনুগত্য’ দেখাতে অনুসারীদের উৎসাহিত করা হয়। এ মন্দিরটি থাইল্যান্ডে বিতর্কিত। এর অন্যতম কারণ, এর বৃহদাকার ও বিপুল পরিমাণ অনুসারীর বিষয়টি। পাশাপাশি, এ মন্দির প্রচলিত বৌদ্ধ চর্চাকে অস্বাভাবিক পন্থায় ব্যাখ্যা করে থাকে। থাইল্যান্ডের মতো দ্রুত পরিবর্তনশীল সমাজে এ মন্দির অনেকের কাছেই আকর্ষণীয় মনে হয়েছে। ধন্যাঢ্য ব্যক্তিরা রাজধানীর বুকে অবস্থিত এ মন্দিরে নিয়মিত মোটা অঙ্কের চাঁদা দেন। সমালোচকদের অভিযোগ, প্রচলিত বৌদ্ধ শিক্ষা বিকৃত করে উপস্থাপন করা হয় এ মন্দির। স্থানীয় মন্দির থেকে অনুসারী বাগিয়ে নেয়ার অভিযোগও রয়েছে এর বিরুদ্ধে। ধাম্মাকায়া আরেকটি কারণেও বিতর্কিত। অভিযোগ রয়েছে, এ মন্দিরের কর্তৃপক্ষের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে নির্বাসিত সাবেক প্রধানমন্ত্রী থাকসিন সিনাওয়াত্রা ও তার সমর্থক বলে পরিচিত রেড শার্ট মুভমেন্টের। প্রসঙ্গত, গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত থাকসিন থাইল্যান্ডে জনপ্রিয়। কিন্তু তাকে ক্ষমতাচ্যুত করেছে রাজপরিবার ও অভিজাত শ্রেণির ঘনিষ্ঠ সামরিক বাহিনী। তার ছোট বোন পরে নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে প্রধানমন্ত্রী হন। তাকেও ক্ষমতাচ্যুত করে এখন পর্যন্ত ক্ষমতায় রয়েছে সামরিক বাহিনী।  তবে ধাম্মাকায়ার অনুসারীরা থাকসিনের সঙ্গে সম্পর্ক থাকার বিষয়টি অস্বীকার করেন। তাদের বক্তব্য, এ মন্দির সব ধরনের ও মতের থাই নাগরিকদের ধারণ করে। কিন্তু থাইল্যান্ডের বিদ্যমান মেরুকৃত রাজনৈতিক পরিবেশে এ ধরনের ক্ষমতাবান ধর্মীয় গোত্র ক্ষমতাসীনদের নজরে পড়বে, এটাই বরং অনিবার্য। থাকসিনের বিরোধী ব্যক্তি ও দল থেকে ক্রমেই জোরদার দাবি উঠছে মঠাধ্যক্ষের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার। কিন্তু সামরিক সরকার এ বিষয়টিও মাথায় রাখছে যে, অধ্যক্ষকে গ্রেপ্তার করা হলে, মঠের বিপুল পরিমাণ অনুসারীদের ক্ষোভ জনবিক্ষোভে রূপ নিতে পারে।

No comments:

Post a Comment