Saturday, June 18, 2016

যানজটে সুখবর নেই ফ্র্যাঞ্চাইজ পদ্ধতি চালুর চিন্তা

জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে জ্যামিতিক হারে বাড়ছে যানবাহনের সংখ্যা। ফলে বাড়ছে জানজট। গত ছয় বছরে দেশে যানবাহনের সংখ্যা বেড়েছে দেড়গুণেরও বেশি। বিশষেজ্ঞরা বলছেন লাগামহীন যানবাহনের সংখ্যা উদ্বেগজনক। নির্মিত হয়েছে নতুন নতুন ফ্লাইওভার। কিন্তু জানজট নিয়ন্ত্রণ হয়নি। ফলে বিপর্যস্ত ঢাকার জনজীবন। চলমান ব্যবস্থায় আপাতত যানজট নিরসনের উপায় দেখছেন না সংশ্লিষ্টরা। ঢাকার যানজটের একটি বড় কারণ গণপরিবহনে বিশৃঙ্খলা। এতে শৃঙ্খলা ফিরাতে নতুন পদ্ধতি চালুর চিন্তা করছে বিআরটিএ। এটি করা গেলে একই রুটে চলমান বিভিন্ন কোম্পানির গাড়ির মধ্যে সমন্বয় করা হবে। ফ্র্যাঞ্চাইজিং পদ্ধতিতে চলবে বাস। এতে একই রুটে চলা বাস চলবে একটির পর একটি। পরের বাস আগে যাওয়ার প্রতিযোগিতা করতে পারবে না। যাত্রীরাও যে কোন বাসে উঠে নির্ধারিত গন্তব্যে যেতে পারবেন। এতে গণ পরিবহনে শৃঙ্খলা ফিরবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা। গবেষণায় দেখা গেছে, জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার যেখানে ১ দশমিক ৩৭ শতাংশ, সেখানে যানবাহন বৃদ্ধির হার ১২ দশমিক ৩০ শতাংশ। বিআরটিএর যানবাহন রিপোর্টে দেখা যায়, সারা দেশে ২০১০ সালে সব ধরনের যানবাহনের সংখ্যা ছিল ১৪৯৮২৪৪। ২০১১ সালে এর সঙ্গে যোগ হয় ১৮৫৩৮৬টি। ২০১২ সালে ১৬০৭০৫টি। ২০১৩ সালে ১৩৭১০৯ টি। ২০১৪ সালে ১৬০৬৩৯টি। ২০১৫ সালে ৩২১২১৫টি ও ২০১৬ সালের মে পর্যন্ত বেড়েছে ১৩৫৬৭৩টি। বর্তমানে সারা দেশে যানবাহনের সংখ্যা ২৫৯৮৯৭১টি। শতকরা হিসাবে, ২০১০ সাল থেকে ২০১১ সালে যানবাহন বৃদ্ধি পায় ১২ দশমিক ৩ শতাংশ। ২০১০ সাল থেকে ২০১৬ সালের মে মাস পর্যন্ত যানবাহন বৃদ্ধি পায় ৫৯ দশমিক ৮১ শতাংশ। বিআরটিএ’র হিসাব বলছে, শুধু রাজধানী ঢাকায় ২০১০ সালে সব ধরনের যানবাহনের সংখ্যা ছিল ৫৯৩০৭৭টি। ২০১১ সালে যোগ হয় ৭২৯৪৭টি। ২০১২ সালে ৫৯৫৭৩টি, ২০১৩ সালে ৫৪৪৯২টি, ২০১৪ সালে ৭৩০৫১টি, ২০১৫ সালে ৯৫৭৪৩টি, ২০১৬ সালের মে পর্যন্ত যোগ হয়েছে ৪২৬০৭টি। বিআরটিএ’র হিসাবে বর্তমানে ঢাকায় যানবাহনের সংখ্যা ৯৯১৪৯০। লাগামহীনভাবে যানবাহনের বৃদ্ধির এই হার সৃষ্টি করছে তীব্র যানজটের। নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনাবিদরা বলছেন, এটা অবশ্যই উদ্বেগজনক। এখনই যানবাহন বৃদ্ধির হার নিয়ন্ত্রণ না করতে পারলে অদূরভবিষ্যতে যানজট নিয়ে বড় ধরনের সমস্যায় পড়তে হবে সরকারকে। কারণ যাতায়াত ব্যবস্থার বেহাল কাঠামোর কারণে সরকারের সদিচ্ছা ও বিশ্বাসযোগ্যতা হারাচ্ছে। তারা বলছেন, একাধিক ফ্লাইওভারের উদ্বোধন হলেও নতুন ব্যক্তিগত গাড়ির চাপে ভেঙে পড়ছে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা। রাজধানীসহ দেশের গুরুত্বপূর্ণ সড়কের যানজটের এমন পরিস্থিতিতে সময় ব্যবস্থাপনায় হিমশিম খাচ্ছে লাখ লাখ কর্মব্যস্ত মানুষ। নষ্ট হচ্ছে লাখ লাখ কর্মঘণ্টা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এমনিতেই বাংলাদেশে রাস্তার ধারণ ক্ষমতার চেয়ে অনেকগুণ বেশি গাড়ি। অন্যান্য দেশে গন্তব্যস্থলে পৌঁছানোর অনেকগুলো বিকল্প রাস্তা থাকে। আমাদের দেশে তা নেই। সিঙ্গাপুরে নতুন গাড়ি কিনতে দেয়া হয়না। পক্ষান্তরে আমাদের দেশে প্রতিদিন রাস্তায় নামে প্রায় ২০০ নতুন গাড়ি। আবার এসব গাড়ি চলাচলের জন্য শহরে ফ্লাইওভারও তৈরি করা হচ্ছে। এ বিষয়ে নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক ড. সরওয়ার জাহান মানবজমিনকে বলেন, যানবাহন যে হারে বাড়ছে এটা বাংলাদেশের জন্য উদ্বেগজনক। অন্যান্য দেশে প্রত্যেকের গাড়ি আছে। কিন্তু আমাদের দেশে সবার গাড়ি নেই। তারপরও আমাদের দেশে তাদের চেয়ে বেশি যানজট হয়। উন্নত দেশে শুধু অফিসে যাওয়া ও আসার সময় জ্যাম লাগে। কিন্তু আমাদের দেশে সব সময়ই জ্যাম লেগে থাকে। তিনি বলেন, আমাদের দেশে যাকে ইচ্ছা তাকেই গাড়ি কিনতে দেয়া হয়। যানজট কমাতে হলে অবশ্যই এগুলো বন্ধ করতে হবে। যে রাস্তা আছে এর ব্যবহার করে মানুষকে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় নেয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। গণপরিবহনের সংখ্যা বাড়াতে হবে। প্রাইভেট কার নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। অটোরিকশা বাড়াতে হবে। মেট্রো রেল বাড়াতে হবে। তা নাহলে যানজট কোনোভাবেই নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না। বিআরটিএর যুগ্ম-সচিব মো. শওকত আলী বলেন, আমাদের সিস্টেমে অনেক দুর্বলতা রয়েছে। গাড়ি বেশি এটা কোন বিষয় না। তবে যে রাস্তা আছে তার সদ্বব্যহার করতে হবে। উন্নত দেশে একই রাস্তায় সব ধরনের গাড়ি চলতে পারে না। আমাদের দেশে পারে। তাই শহরের যানজটের কথা মাথায় রেখে গাড়ির সংখ্যা নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি একই রাস্তায় বিভিন্ন ধরনের গাড়ি চলাচলে নিয়ন্ত্রনের কথা ভাবা হচ্ছে। এছাড়া ঢাকায় একই রুটে যতগুলো কোম্পানির গাড়ি চলে সবাইকে এক করে ফ্র্যাঞ্চাইজ ব্যবস্থা চালুর চিন্তা হচ্ছে। তাহলে একই রুটে যতগুলো গাড়ি চলে তার কেউ কারো আগে উঠতে পারবেনা। যেমন, স্ট্যান্ডে আগে এসেছে বিহঙ্গ, তারপর শিখর। এক্ষেত্রে শিখর বিহঙ্গকে অতিক্রম করে সামনে যেতে পারবে না। সিরিয়াল অনুযায়ী একটার পর একটা যাবে। যাত্রীরা সবধরনের গাড়ি থেকে একই সেবা পাবে। তিনি বলেন, এই প্রস্তাব ইতিমধ্যে সুপারিশ আকারে পাঠানো হয়েছে। পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে প্রয়োগের কথা ভাবা হচ্ছে।

No comments:

Post a Comment