ধরলেই বলে ছাত্রলীগের কথা। নিজেকেও পরিচয় দেয় ছাত্রলীগ কর্মী হিসেবে। সিলেটের টিলাগড় গ্রুপের কর্মী বলেও জানায়। কিন্তু রাজনৈতিক মাঠে তাকে কখনোই দেখা যায়নি। নেশা করতে নগরীর টিলাগড়ে যায়। ওখানে বসেই বখাটেদের সঙ্গে আড্ডা মারে। আর এভাবেই সে নিজেকে পরিচয় দেয় ছাত্রলীগের একজন কর্মী হিসেবে। কিন্তু ছাত্রলীগ নামের আড়ালে সিলেটে ছিনতাই সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছে সিলেটের ‘ছিনতাইকারী জিয়া’। রয়েছে তার নিজস্ব ঝাপটাপার্টিও। এই জিয়াকে গতকাল গ্রেপ্তার করেছে সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশ। তবে তাকে গ্রেপ্তারের প্রক্রিয়া অতটা সহজ ছিল না। একটি ছিনতাইয়ের ঘটনায় গেলো ১৫ দিন ধরে তার পেছনে সোর্স নিয়োগ করা হয়। কিন্তু সিলেটের কোর্ট পয়েন্ট কিংবা বন্দরবাজার এলাকায় জিয়া আসেনি। এক-দুবার এলেও সবার চোখ ফাঁকি দিয়ে বেরিয়ে যায় সহজেই। জিয়ার পুরো নাম জিয়াউদ্দিন (২৫)। বয়স ২৬ অথবা ২৭ বছর। পিতা আলাউদ্দিন। তার বাড়ি সিলেটের জৈন্তাপুর উপজেলার মাউতহাটি গ্রামে। কিন্তু এলাকায় বাস করে না জিয়া। ইউনিয়ন নির্বাচনের সময় জিয়া বাড়িতে গিয়েছিল। কিছুদিন অবস্থানের পর সে পুনরায় ফিরে আসে সিলেট শহরে। নগরীর শিবগঞ্জ-মিরাবাজার এলাকায় সে বসবাস করে। ২৪ চন্দনিটুলা বাসায় সে দীর্ঘদিন ধরে বসবাস করছে বলে পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে জানায়। জিয়া গ্রেপ্তারের পর গতকাল খবর নিয়ে জানা গেছে, জিয়ার নিজস্ব বাহিনী রয়েছে। সে মেজরটিলা থেকে বন্দরবাজার এলাকা নিয়ন্ত্রণ করে। শাহপরাণ মাজার এলাকায়ও রয়েছে জিয়ার গ্রুপের কর্মীরা। গত ২৭শে মে সিলেটে সস্ত্রীক বেড়াতে এসেছিলেন ঢাকার এক সিনিয়র সাংবাদিক। দুপুরে তারা শাহপরাণ (রহ.) মাজার জিয়ারতের পর কোর্ট পয়েন্টে আসেন। সেখান থেকে সিএনজি অটোরিকশাযোগে তিনি তালতলা যাচ্ছিলেন। এ সময় ঝাপটাপার্টির সদস্যরা ওই সাংবাদিকদের স্ত্রীর ভ্যানেটিব্যাগ ছিনিয়ে নিয়ে চলে যায়। ভ্যাগে নতুন মডেলের আইফোন, নগদ ১০ হাজার টাকা ও ক্রেডিট কার্ড ছিল। এ ঘটনার পরপরই পুলিশ সোর্স নিয়োগ করে ঘটনার সঙ্গে জড়িত জিয়া ও সুমনের নাম পেয়ে যায়। কিন্তু জিয়া ও সুমনকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। অবশেষে গতকাল বিকালে পুলিশ ব্যারিকেড দিয়ে বন্দরবাজার এলাকা থেকে জিয়াকে গ্রেপ্তার করে। সিলেটের কোতোয়ালি থানার এসআই ফয়েজ আহমদ জানিয়েছেন, জিয়া হচ্ছে সিন্ডিকেটের মূল হোতা। সে ছিনতাইকারী ও ঝাপটাপার্টির নেতৃত্ব দেয়। তাকে অনেক দিন ধরে খোঁজা হচ্ছিল। পাওয়া যায়নি। গতকাল তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তিনি বলেন, জিয়ার সহযোগীদের এখন খুঁজছে পুলিশ। জিয়ার দলের শুধু সে একাই নয় রয়েছে সুমন নামে আরও কয়েক ছিনতাইকারী। এছাড়া শামীমাবাদের শোয়েব, শাহী ঈদগাহের ডাব্লিউ, রতনসহ কয়েকজন দুর্ধর্ষ ছিনতাইকারী রয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, বন্দরবাজার এলাকার ছিনতাইকারীদের একটি অংশ নিয়ন্ত্রণ করে জিয়া ও সুমন। তারা মাঠে থেকেই ছিনতাইয়ের ‘গ্যাং’ নিয়ন্ত্রণ করে। পাশাপাশি বন্দরবাজার, কোর্টপয়েন্ট, সুবহানীঘাটে রয়েছে ঝাপটাপার্টি। এই ঝাপটাপার্টির কর্মীদেরও নিয়ন্ত্রণ করে জিয়া। গেলো কয়েক দিন ধরে সিলেটের মীরাবাজার এলাকা ছিনতাইকারীদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়। প্রতিদিন মীরাবাজার পয়েন্ট ও বিভিন্ন গলিপথে ছিনতাই হতো। আর এই ছিনতাইয়ের নেতৃত্বে ছিল জিয়া ও সুমন। তাদের গ্রুপের কর্মীরা ছিনতাই করে বেড়াতো। পুলিশ মীরাবাজার ও শিবগঞ্জ এলাকায় টহল জোরদার করায় জিয়া ও তার গ্রুপের কর্মীরা বন্দরবাজারমুখী হয়। জিয়ার সহযোগী সুমনের বাড়ি সুনাগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলায় ইসলামপুরে। কোর্ট পয়েন্টে সাংবাদিকদের মোবাইল ও টাকা ছিনতাইয়ের পরপরই জিয়ার সঙ্গে সুমনও পাড়ি দেয় নিজ নিজ এলাকায়। এরপর থেকে সুমনকে আর ওই এলাকায় দেখা যাচ্ছে না। তবে, সুমন ও ডব্লিউ নামের আরও দুই ছিনতাইকারী সম্প্রতি সময়ে সিলেট শহরে এসেছে বলে জানিয়েছে জিয়া। তাদের গ্রেপ্তারে পুলিশ চেষ্টা চালিয়েছে। শামীমাবাদ এলাকার শোয়েবও রয়েছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। পুলিশ জানিয়েছে, জিয়ার নেতৃত্বে যে ছিনতাইকারী ও ঝাপটাপার্টির গ্রুপটি গড়ে উঠেছে। সে আগে ছিল ছিঁচকে ছিনতাইকারী গ্রুপ। তাদের দলে অনেক সদস্যই উঠতি বয়সী। এ কারণে তাদের চিহ্নিত করার সম্ভব হচ্ছে না। এর বাইরে তারা ছাত্রলীগ ও ছাত্রদলের গ্রুপ অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে বসে আড্ডা দেয়, নেশা করে। অনেক সময় তারা রাজনৈতিক পরিচয় দিয়ে পার পেয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। কখনো কখনো পুলিশের মাঠ পর্যায়ের নেতাদের কাছে ছাত্রলীগ পরিচয় দিয়েই তারা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড চালায়। গতকাল জিয়াকে গ্রেপ্তারের সময়ও সে নিজেকে রাজনৈতিক কর্মী বলে পরিচয় দিয়েছিল। কিন্তু পুলিশ তাকে ছাড়েনি। সিলেটের বন্দরবাজার ফাঁড়িতে নিয়ে আসার পর সে ছিনতাইকারী বলে পরিচয় দেয়। এদিকে, জিয়াউদ্দিনের মোবাইল ফোনে পুলিশের বড় কর্তাদের নাম ও মোবাইল নম্বর রয়েছে। কোনো কোনো পুলিশ কর্মকর্তার ব্যক্তিগত মোবাইল নম্বর ছিল। তার মোবাইল ফোনে শাহপরাণ থানার এসি ও ওসির নম্বর ছিল। জিজ্ঞেস করা হলে জিয়া নিজেও জানায়, ‘এসি ও ওসি স্যার আমাকে চেনেন।’ কোতোয়ালি থানা পুলিশ জানিয়েছে, জিয়া ও তার সহযোগীরা নিজেদের রক্ষা করতে রাজনৈতিক দলের পরিচয় দেয়। নিজেদের রক্ষা করতে তারা পুলিশের বড় কর্তাদের নাম ও নম্বর মোবাইল ফোনে রাখে।
Monday, June 20, 2016
Subscribe to:
Post Comments (Atom)

No comments:
Post a Comment