আমাদের দেশে পরিবারের ভরণপোষণের দায়িত্ব
মূলত পুরুষের হলেও সংসার পরিচালনার দায়িত্ব কিন্তু নারীর। হোক সে কর্মজীবী
কিংবা গৃহিণী। পরিবারের সবার প্রয়োজন অনুযায়ী খাবার, শিক্ষা, চিকিৎসার
সুব্যবস্থা করা প্রত্যেক গৃহিণীর কর্তব্য। কিন্তু আয়ের সাথে ব্যয়ের সমন্বয়
হচ্ছে না কিছুতেই। সবকিছুর দামই লাফিয়ে বাড়ছে। কিন্তু সে তুলনায় আয়তো বাড়ছে
না। ফলে বিপাকে পড়তে হচ্ছে গৃহিণীকেই। কথা হচ্ছিল মিসেস হকের সাথে। তিনি
একটি প্রাইভেট কোম্পানিতে চাকরি করেন, চাকরি করেন তার স্বামীও। কিন্তু
হিমশিম খাচ্ছেন সংসার চালাতে। বাসাভাড়া দুটো শিশুর স্কুলের বেতন, প্রাইভেট
টিউটর ফি দেয়ার পর যে টাকা থাকে তাতে পরিবারের তিন বেলা খাবারের মেনুতে
সবার পুষ্টি চাহিদা মেটানো প্রায় অসম্ভব। মিসেস হক বলেন, এমন কোনো জিনিস
নেই যার দাম বাড়েনি। মাছ, গোশত বাদ দিলেও সবজি, ডাল সবটাই চড়া। কোনোটাই
ছোঁয়া যায় না। শিশুদের প্রতিদিন একটা ডিম দিতে পারলেও দুধ দিতে পারি না।
এভাবে কোনোমতে চলে সংসার। উত্তরার এইচএম প্লাজার ব্যবসায়ী জামান সাহেব। কথা
হয় মিসেস জামানের সাথে। তিনি তার শ্বশুর-শাশুড়ি ও এক সন্তানকে নিয়ে ঢাকার
উত্তরখান মাজারের কাছে থাকেন। নির্দিষ্ট বাজেটের টাকা দিয়ে সংসার চালাতে
তাকে বেগ পেতে হচ্ছে। মাসের ১৫ দিন যেতে না যেতেই তার বাজেটের টাকা শেষ হয়ে
যায়। তারপর ঝামেলায় পড়তে হয় তাকে। তিনি জানান আগে তার সংসার খরচের যে
বাজেট ছিল এখন তা প্রথম ১০ দিনেই শেষ হয়ে যাচ্ছে। যার ফলে অন্যান্য বাজেট
থেকে টেনে তাকে সংসার খরচ চালাতে হচ্ছে। মিসেস রহমানের একমাত্র সন্তান
প্রাইভেট ইউনিভার্সিটিতে পড়ে। স্বামী মোটামুটি ভালোই চাকরি করেন। তিনজনের
সংসার চালাতেই সমস্যায় পড়তে হচ্ছে তাকে।
জিনিসপত্রের দাম যেমন বাড়ছে তেমনি
পড়াশোনার খরচ। নামকরা একটা প্রাইভেট ভার্সিটির টিউশন ফি অনেক বেশি। সেটা
মেটানোর পর যে টাকা থাকে তা দিয়ে বাসা ভাড়া, খাওয়া-দাওয়া চালাতে খুবই
সমস্যায় পড়ছেন তিনি। আক্ষেপ করে বললেন, সংসার সন্তানকে বেশি সময় দেয়ার জন্য
নিজে চাকরি করিনি, এখন মনে হচ্ছে কিছু একটা করা দরকার ছিল। তাহলে হয়তো এত
টানাটানিতে পড়তাম না। কথা হয় উত্তরার এক গৃহিণী মুন্নীর সাথে। সে বলল, তার
স্বামী এখন বাজার করা বন্ধ করে দিয়েছেন। তার স্বামী ইদানীং বাজারের দায়িত্ব
তার হাতে দিয়ে দিয়েছেন। প্রথমে সে তার স্বামীর সাথে বাজার নিয়ে প্রায়ই
তর্ক করত। রাগারাগির কোনো একপর্যায়ে তার স্বামী তাকে বাজারের দায়িত্ব দেয়।
এখন সে বুঝতে পারছে বাজারের আসল চেহারা আসলে কী। সে বলল, আগে মাঝে মধ্যে
বাজার করতে স্বামীর কাছ থেকে টাকা রাখলে তা দিয়ে বাজার করে বেশ টাকা জমানো
যেত। আর এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি টাকা রেখেও জমানোর কথা ভুলে গিয়ে শুধু
বাজারের হিসাব কষতেই মাথাব্যথা শুরু হয়ে যায়। তার মতে বাজারে এখন যা ধরি
তারই দাম বেশি। দ্রব্যমূল্য এখন সাধারণ মানুষের চিন্তা, চেতনা,
ধ্যান-ধারণার অনেক ঊর্ধ্বে। মানুষ এখন আর হিসাব করে টাকা নিয়ে বাজারে যেতে
পারছে না, কারণ গতকালের দ্রব্যমূল্যের সাথে আজকের মূল্যের কোনো মিল নেই।
চাল, ডাল, চিনি, লবণ, শাক-সবজি, মাছ, গোশত ও নিত্যপ্রয়োজনীয় কাঁচাবাজারের
দাম এত বেড়েছে যা বাজার করতে না গেলে বোঝা যাচ্ছে না। স্বল্প আয় থেকে শুরু
করে মধ্য ও উচ্চবিত্তরাও শঙ্কিত দ্রব্যমূল্য নিয়ে। নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের
সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে বাড়িভাড়া, যানবাহনের ভাড়া, স্কুলের বেতন,
বিদ্যুতের দাম। কিন্তু আয় তো বাড়ছে না। তাই নির্ধারিত আয়ের পরিবারগুলোর
সমস্যা বাড়ছেই।

No comments:
Post a Comment