Wednesday, August 31, 2016

থাকব কোথায় কে দেবে ঠাঁই...

মেধাবীরা স্বপ্ন দেখে ভালো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে লেখাপড়া করার। এসএসসি, এইচএসসি নিজ নিজ জেলা শহরে দিলেও গ্র্যাজুয়েশন, মাস্টার্স করতে চায় দেশের নামকরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে। সরকারি-বেসরকারি সব ধরনের ভালো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ঢাকায়। এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভর্তির কোচিংয়ের মূল শাখাও ঢাকা। স্বনামধন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় ভর্তি হতে নিতে হয় ব্যাপক প্রস্তুতি। ভর্তি হতে হয় কোচিং সেন্টারেও।কিন্তু ঢাকার কোচিং সেন্টারে পড়াশুনা করতে হলে প্রথমে থাকার ব্যবস্থা করতে হয়। তাই সমস্যায় পড়তে হয় ঢাকার বাইরে অবস্থানকারী শিক্ষার্থীদের। ফলে বেশির ভাগই বঞ্চিত হচ্ছে এ সুযোগ থেকে। তারা বাধ্য হচ্ছে, নিজ নিজ জেলা বিভাগের অঞ্চলভিত্তিক কোচিং সেন্টার বা বিখ্যাত কোচিং সেন্টারগুলোর শাখাগুলোয় পড়তে। তাতে করে ভালভাবে প্রস্তুতি নিতে পারেন না তারা এর থেকে পরিত্রাণ পেতেই তারা ঢাকায় আসতে চায়। চায় মেধাবীদের সাথে সমান কাতারে দাঁড়িয়ে লড়ে যেতে।
সেই সুযোগ তারা পাচ্ছে না। এদের মুখ থেকে এক কথাই বারবার বেরিয়ে আছে। থাকব কোথায়, কে দেবে ঠাঁই। কথাগুলো বলছিলেন, স্বনামধন্য একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের কোচিং সেন্টারের শিক্ষক মাহবুবুর রহমান। ইতি হাওলাদার। এবার চাঁখার কলেজ থেকে এইচএসসি পরীক্ষা দিয়েছে। ইতির ইচ্ছে, প্রাচ্যের অক্সফোর্ড খ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করার। এর জন্য তার প্রথম চাওয়া ছিল ঢাকায় কোনো আত্মীয়ের বাসায় থেকে, স্বনামধন্য কোচিং সেন্টারের মূল শাখায় পড়া। কিন্তু সে ইচ্ছা তার পূরণ হয়নি। ঢাকার যান্ত্রিকতার মতো কাছের আত্মীয়রা কখন যে যান্ত্রিক হয়ে গেছে, ইতি তা বুঝে উঠতে পারেনি। যখন ইতি বুঝতে পারল পছন্দনীয় আত্মীয় বাড়িতে তার ঠাঁই নেই, তখন তাৎক্ষণিকভাবে ভেঙেও পড়েছিল। পরে তার অদম্য ইচ্ছাশক্তি তাকে বিকল্প পথ খুঁজে দিতে বাধ্য করে। সে তার পছন্দনীয় একটি কোচিং সেন্টারের বরিশাল শাখায় ভর্তি হয়। যদিও তার বাড়ি থেকে এ কোচিং সেন্টারের আসা-যাওয়ায় দুই ঘণ্টা লাগে। সারা দিনের আসা-যাওয়া, পড়াশোনার ক্লান্তি শেষে সন্ধ্যা হতে না হতেই তার চোখে ঘুম নেমে আসে। মনঃপূত প্রস্তুতি নিতে পারছে না জেনেও মনের মধ্যে একধরনের ভয়ও কাজ করে। পারব কী, স্বপ্নের বিশ্ববিদ্যালয়ে পা রাখতে। এর পরও ইতি ভোর হতে না হতেই উঠে পড়ে বাস্তবে স্বপ্নের পথে হাঁটার জন্য। আত্মীয়দের বাসায় ঠাঁই না পেলেও বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে ঠাঁই পাওয়ার আশা করেন ইতি হাওলাদার। সানজিদা আক্তার রুমা। এবার সাভারের জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রাঙ্গণে অবস্থিত কলেজ থেকে এইচএসসি পরীক্ষা দিয়েছে। সে জানায়, তার পরীক্ষা ভালো হয়েছে। কিন্তু সাভারের ইপিজেডের একটি পোশাক প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানে তার মা কাজ করেন। মায়ের আয়ে অসুস্থ বাবাসহ তিন ভাইবোনকে নিয়ে পাঁচজনের সংসার কোনোমতে চলছে। সেও ন্যূনতম শ্রমের বিনিময় এলাকার কিছু ছাত্রছাত্রী পড়ায়; যা দিয়ে পড়ালেখার খরচ চালিয়ে যাচ্ছে সে। সানজিদা আরো জানায়, ইচ্ছা ছিল পরীক্ষা শেষ হওয়ামাত্রই ঢাকায় খালার বাসায় যাবে। তার নির্ধারিত কোচিং সেন্টারের মূল শাখায়, প্রতিভাবান শিক্ষক ও ছাত্রছাত্রীদের সংস্পর্শ পাবে। সহজেই পারবে নিজের ভুলত্রুটি সংশোধন করে সামনের সারিতে চলে আসতে।
সে আশা তার আশাই রয়ে গেল। খালার বাসায় জায়গা না হওয়ায় সাভারেই একটি কোচিং সেন্টারে ভর্তি হয়। এখানেও পড়াশোনা ভালো। তবে আশানুরূপ নয়। এ জন্য তাকে আলাদাভাবে ভর্তির গাইডগুলো কিনে পড়তে হচ্ছে। ভর্তির প্রস্তুতিস্বরূপ তেমন কোনো প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় অংশ নিতে পারছে না বলে সব সময় থাকতে হচ্ছে চিন্তার মধ্যে। যদি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে না পারে, তাহলে তার পড়ালেখাই থেমে যাবে। দরিদ্র মা বেসরকারি কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াতে পারবেন না। বিষয়টি সব সময় মাথায় ঘুরপাক খায় বলেও জানান সানজিদা আক্তার রুমা। নেহারিকা সরকার। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের শেষ বর্ষের ছাত্রী। নেহারিকা বলেন, আমিও এ দেশের প্রত্যন্ত একটি গ্রামে জন্মেছি। যে গ্রামে এখন পর্যন্ত বিদ্যুৎ ঘরে ঘরে পৌঁছায়নি। নেই ডিশ লাইন, ইন্টারনেটের সুব্যবস্থা। কলেজে পড়তে আমাকে রোজ পাঁচ মাইল পথ পাড়ি দিতে হতো। বৃষ্টির দিনে ট্রলার ছিল একমাত্র ভরসা। শুষ্ক মওসুমে কিছু পথ হেঁটে কিছু পথ ভ্যান-রিকশায় যেতে হতো কলেজে। খুব ইচ্ছে ছিল, এইচএসসি পরীক্ষা দিয়েই ঢাকায় আত্মীয়ের বাসায় উঠব। কিন্তু সেই ইচ্ছে অঙ্কুরেই বিনষ্ট হলো। পত্রপাঠ আমাকে বিদায় হতে হলো। আমাদের জেলা শহরেও তখন কোনো কোচিং সেন্টারের শাখা প্রতিষ্ঠিত হয়নি। তাই বাধ্য হই ঘরে বসে ভর্তি কোচিংয়ের গাইড বই নির্ভর হতে এবং পরীক্ষার আগে এলাকার এক বড় বোনের আবাসিক হলে উঠি। তার সাথে সিট শেয়ার করি। অবশেষে ভর্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হই। আর এ অভিজ্ঞতা আমাকে বুঝিয়ে দিয়েছে। দৃঢ়প্রতিজ্ঞা আর ইচ্ছাশক্তি থাকলে সবই সম্ভব।

No comments:

Post a Comment